kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

♦ ধারাবাহিক লেখা ৮
♦ কবিতার অন্বেষণ, কবিতার কৌশল

ছন্দ ঠিক আছে কি না বলে দেবে কান

কামাল চৌধুরী

২২ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ছন্দ ঠিক আছে কি না বলে দেবে কান

মাত্রা

কবিতায় মাত্রা গণনা বোঝার জন্য মুক্তাক্ষর ও বদ্ধাক্ষরের হিসাব সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। প্রবোধচন্দ্র সেন বলেছেন, ‘যার দ্বারা কোনো কিছু পরিমাপ করা যায়, তাকে আমরা মাত্রা বলে থাকি’—ছন্দরীতিতে মাত্রাভেদ হয়—এ জন্য সিলেবলের সঙ্গে মাত্রার হিসাবটাও বোঝা প্রয়োজন। কবিতার পঙক্তির মধ্যে যে ধ্বনিপ্রবাহ থাকে, তার ক্ষুদ্রতম অংশ মাত্রা। [৬]

তিন রকম ছন্দেই মুক্তাক্ষরকে এক মাত্রা ধরা হয়। বদ্ধাক্ষর নিয়েই যত গোল বাধে। ছন্দের পার্থক্য ঘটে বদ্ধাক্ষরে। মাত্রা গণনার ক্ষেত্রে পার্থক্য হচ্ছে, অক্ষরবৃত্তে বদ্ধাক্ষরকে এক মাত্রার মূল্য দেওয়া হয়, মাত্রাবৃত্তে বদ্ধাক্ষর দুই মাত্রা, কিন্তু স্বরবৃত্তে বদ্ধাক্ষরকে এক মাত্রা ধরা হয়। যেমন—বন্ধন (বন+ধন) শব্দটি অক্ষরবৃত্তে তিন মাত্রা, মাত্রাবৃত্তে চার মাত্রা, কিন্তু স্বরবৃত্তে তিন মাত্রা।

আগেই বলেছি, অক্ষরবৃত্ত ছন্দে মুক্তাক্ষর এক মাত্রার মর্যাদা পায়। শব্দের প্রথমে ও মধ্যখানে যদি বদ্ধাক্ষর থাকে তাকেও এক মাত্রা ধরা হয়। যেমন—রক্ষপুরে (রক+খ+পু+রে); অরিন্দম (অ+রিন+দম) ইত্যাদি। এখানে রক্ষপুরে শব্দে শুরুতে বদ্ধাক্ষর, তাই শব্দটি চার মাত্রা। অরিন্দম শব্দে মাঝে ও শেষে বদ্ধাক্ষর থাকায় মধ্যস্থিত বদ্ধাক্ষরকে এক মাত্রা ও শব্দের শেষে দুই মাত্রা ধরতে হবে। আমার (আ+মার), সিংহল (সিং+হল), স্তবক (স্ত+বক)—এসব শব্দের শেষে বদ্ধাক্ষর আছে বিধায় দুই মাত্রা হিসাব করতে হবে। তবে হাওয়া, যাওয়া—এসব শব্দের শেষে ‘ওয়া’তে অক্ষরের সংখ্যা দুটি হলেও মাত্রার হিসাবে অক্ষরবৃত্ত ছন্দে দুই মাত্রার। আবার আমারই, তোমারই, কেবলই—এগুলো মূলত ধ্বনি অনুযায়ী আমারি, তোমারি, কেবলি, সেহেতু তিন মাত্রা। ‘তুমি কি কেবল-ই স্মৃতি, শুধু এক উপলক্ষ, কবি’—তুমি শুধু’ পঁচিশে বৈশাখ ‘কবিতায় বিষ্ণু দে ‘কেবল-ই’ এভাবে লিখে তিন মাত্রা বিবেচনা করেছেন।

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর মতে, অক্ষরবৃত্ত ছন্দে উচ্চারণকে সংকুচিত করে মাত্রার যোগফলে গোল না ঘটিয়ে শব্দের ওজন বাড়িয়ে নেওয়ার যে সুবিধা পাওয়া যায়, সেটা মাত্রাবৃত্তে মেলে না। মাত্রাবৃত্তে বদ্ধাক্ষরগুলোকে দুই মাত্রা ধরা হয়, অর্থাৎ প্রতিটি বর্ণ বা অক্ষরকে এক মাত্রা হিসাবে ধরা হয়। যেমন—রক্ষপুরে, অরিন্দম মাত্রাবৃত্তে পাঁচ মাত্রা। তবে হাওয়া, যাওয়া, নাওয়া—এসব শব্দের শেষে ‘ওয়া’তে অক্ষরের সংখ্যা দুটি হলেও মাত্রার হিসাবে অক্ষরবৃত্তের মতো মাত্রাবৃত্তেও দুই মাত্রার শব্দ ধরা হয়।

স্বরবৃত্ত ছন্দে মুক্তাক্ষর ও বদ্ধাক্ষর এক মাত্রা—যুক্তবর্ণও তাই। এসব মাত্রা বিশ্লেষণ নিয়ে ছান্দসিকের আলোচনা আছে অনেক। আরো গভীরে জানার প্রয়োজন হলে সহায়ক গ্রন্থ পড়া যেতে পারে।

এ তো হলো বিভিন্ন ছন্দে ব্যবহৃত মাত্রার হিসাবের গাণিতিক পদ্ধতি, তবে ছন্দ বোঝার জন্য অক্ষর বা মাত্রার এই হিসাবই সব কিছু নয়। এ ক্ষেত্রে ধ্বনির গুরুত্ব সমধিক। এতে কানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে শব্দের উচ্চারণ ও ছন্দের তাল—এ দুটির মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। কেউ কেউ একটু বাড়িয়ে বলেন যে কাব্যের বিচার অঙ্কের বিচার নয়। কবিতা বিশ্লেষণে জ্যামিতিক পরিমিতি অপ্রয়োজনীয়—নতুন লেখককে বিভ্রান্ত করার জন্য এসব কথা যথেষ্ট। এসব পড়ে নতুন কবি আর ছন্দ সম্পর্কে জানতে চাইবেন না। এ কথা মনে রাখতে হবে যে ভবন যত সুন্দর হোক নির্মাণ কিংবা স্থাপত্যশৈলীতে—এর ভিত্তি যদি সুদৃঢ় না হয়, তাহলে একদিন ধসে পড়বে। সে জন্য গাণিতিক বা জ্যামিতিক পরিমিতিকে ব্যবহার করে বা সমন্বয়ের মাধ্যমে কবিকে অগ্রসর হতে হবে।

ছন্দ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা কিংবা তাত্ত্বিক কোনো ব্যাখ্যা উপস্থাপন আমার উদ্দেশ্য নয়। ছন্দ সম্পর্কে সাধারণ ধারণা সৃষ্টির জন্য নিচে তিন প্রকার ছন্দের কিছু উদাহরণ দেওয়া হলো :

অক্ষরবৃত্ত ছন্দ

রবীন্দ্রনাথ একে সাধু ছন্দ, কখনো বলেছেন পয়ারজাতীয়। অক্ষরবৃত্ত ছন্দ ও প্রাচীন পয়ারের মধ্যে সাযুজ্য আছে। তবে প্রাচীন পয়ার বা মহাপয়ার শুধু অক্ষরবৃত্তে সীমাবদ্ধ ছিল না, অন্য ছন্দেও পয়ারের চর্চা হয়েছে। প্রবোধচন্দ্র সেন একে যৌগিক ছন্দও বলেছেন। এসব নামকরণের পেছনের ব্যাখ্যায় যাব না। প্রাচীন বাংলা কবিতা প্রধানত এই ছন্দে রচিত। এর মধ্যযুগীয় নাম পয়ার। অক্ষরবৃত্ত সম্পর্কে বলা হয় এটি চার মাত্রার ছন্দ। কখনো চৌদ্দ মাত্রায়, কখনো তারও বেশি মাত্রায় বিন্যস্ত করা যায়। এ ছন্দরীতির মাত্রা, পর্ব ইত্যাদি নিয়ে নানা ব্যাখ্যা থাকলেও সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের পরামর্শ—‘বিজোড় বিজোড় গাথ জোড়ে গাথ জোড়’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শব্দের শুরুতে যদি তিন মাত্রা থাকে তাহলে পরে তিন মাত্রা থাকাটা শ্রেয়। তাতে কাঠামো হতে পারে ৩+৩+২+৩+৩ = ৮+৬ = ১৪ মাত্রা। এই ৮+৬-এর হিসাবকে নিচের নিয়মেও সাজানো যায় :

অথবা ২+২+২+২+৩+৩ = ১৪ মাত্রা

অথবা ৪+৪+২+২+২ = ১৪ মাত্রা

অথবা ৪+২+২+৪+২ = ১৪ মাত্রা

অথবা ৪+৪+৩+৩ = ১৪ মাত্রা

 এভাবে পঙক্তিতে পঙক্তিতে শব্দের সংখ্যা বাড়তে পারে। তবে তা সমমাত্রিক বা সমপার্বিক না হলে সেটি মুক্তকে রূপ নেবে। যেমন—৪+৪+৪+৩+৩ =১৮ মাত্রা। জীবনানন্দ দাশ ‘বনলতা সেন কবিতায়’ পঙক্তিতে ২৬ মাত্রা পর্যন্ত ব্যবহার করেছেন। তবে পঙক্তি বা লাইন দীর্ঘ হলে পর্ব ভাঙার বিষয়টিও বোঝা দরকার। এ নিয়ে আমরা পরে আলোচনা করব। উদাহরণ :

১৪ মাত্রা অক্ষরবৃত্ত

‘এতক্ষণে’- অরিন্দম (৮)/কহিলা বিষাদে, (৬) = ১৪

“জানিনু কেমনে আসি (৮)/লক্ষণ পশিল (৬) = ১৪

রক্ষপুরে! হায়, তাত (৮)/উচিত কি তব (৬) = ১৪

এ কাজ, নিকষা সতী (৮)/তোমার জননী! (৬)” = ১৪

[মাইকেল মধুসূদন দত্ত/ মেঘনাদবধ কাব্য]

দুয়ারে প্রস্তুত গাড়ি; (৮)/বেলা দ্বিপ্রহর; (৬)

হেমন্তের রৌদ্র ক্রমে; (৮)/হতেছে প্রখর; (৬)।

জনশূন্য পল্লিপথে; (৮)/ধূলি উড়ে যায়; (৬)

মধ্যাহ্ন-বাতাসে; স্নিগ্ধ; (৮)/অশ্বত্থের ছায়; (৬)

ক্লান্ত বৃদ্ধা ভিখারিনী; (৮)/জীর্ণ বস্ত্র পাতি; (৬)

ঘুমায়ে পড়েছে; যেন; (৮)/রৌদ্রময়ী রাতি; (৬)

ঝাঁ ঝাঁ করে চারিদিকে; (৮)/নিস্তব্ধ নিঝুম—; (৬)

শুধু মোর ঘরে; (৬) বিশ্রামের  ঘুম; (৬)।

[যেতে নাহি দেব/রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর]

 হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে (৮)/করেছ মহান! (৬)

তুমি মোরে দানিয়াছ (৮)/খ্রিস্টের সম্মান (৬)

কণ্টক-মুকুট শোভা। (৮)/দিয়াছ, তাপস, (৬)

অসঙ্কোচ প্রকাশের (৮)/দুরন্ত সাহস; (৬)

উদ্ধত উলঙ্গ দৃষ্টি; (৮)/বাণী ক্ষুরধার, (৬)

বীণা মোর শাপে তব (৮)/লহ তরবার (৬)

[দারিদ্র্য/কাজী নজরুল ইসলাম]

►চলবে



সাতদিনের সেরা