kalerkantho

সোমবার । ৯ কার্তিক ১৪২৮। ২৫ অক্টোবর ২০২১। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

সৈয়দ শামসুল হকের কবিতায় বঙ্গবন্ধু

তুহিন ওয়াদুদ

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সৈয়দ শামসুল হকের কবিতায় বঙ্গবন্ধু

ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

সৈয়দ শামসুল হকের কবিতা বিষয়বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর কবিতার বৈচিত্র্যপূর্ণ উপজীব্যের মধ্যে অন্যতম। কবির ভাবলোকে স্থায়ী আসন ছিল বঙ্গবন্ধুর। ফলে তাঁর অসংখ্য কবিতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাওয়া যায়। কখনো বিষয় হিসেবে, কখনো বিষয়ের অনুষঙ্গ হিসেবে।

প্রতিবেদন রচনা কিংবা কাহিনিকে অবিকৃত উপস্থাপন কবিতার কাজ নয়। কবিতায় ইতিহাসের ইঙ্গিত, প্রতীক, রূপক সহজ। বিষয়ের বিস্তৃতির পরিবর্তে কবিতায় বিষয়গত রঙের ব্যঞ্জনা অধিক প্রস্ফুটিত। সৈয়দ শামসুল হকের কবিতায় তাই কবিতার আঙ্গিকে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি মেলে। কখনো বিষয়ের ভেতরে বঙ্গবন্ধুর প্রতীকী উপস্থিতি, কখনো ইঙ্গিতধর্মিতায়। ইঙ্গিত-রূপক-প্রতীক-আভাস-এর বাইরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অনেকবার কবিতার বিষয় হয়ে উঠেছেন। সৈয়দ শামসুল হকের কবিতা নিরবচ্ছিন্ন পাঠ করতে থাকলে বঙ্গবন্ধুর স্বতন্ত্র উপস্থিতি সহজেই উপলব্ধি করা যায়। কবি বঙ্গবন্ধুকে একক চরিত্র হিসেবে যতবার কবিতায় গ্রথিত করেছেন, আর কোনো চরিত্রকে এককভাবে এতবার গ্রথিত করেননি। ইতিহাসের অনেক চরিত্র তাঁর কবিতায় স্থান লাভ করেছে। শাস্ত্রীয় গ্রন্থেরও অনেক চরিত্রকে তাঁর কবিতায় পাই। তবে তা কোনো অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তুলনীয় নয়। কখনো এমন হয়নি যে ইতিহাসের অন্য চরিত্রকে কবিতায় রূপ দেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুকে কবিতায় তুলে ধরেছেন। বরং বঙ্গবন্ধুকে কবিতায় দৃশ্যমান করার জন্য অনেক চরিত্রকে তুলে ধরেছেন। বারো ভুঁইয়া, ঈশা খাঁ, রামপাল, গোপাল, হুসেন শাহ, নূরলদীন, যশোরাজ খাঁ, আব্বাসউদ্দীন, বায়েজিদ বোস্তামি, হযরত মুসা, চাঁদ সওদাগর, সনকা, লখিন্দরসহ অনেক চরিত্র তাঁর কবিতায় প্রাণ লাভ করলেও বঙ্গবন্ধু শীর্ষে। কারণ তিনি বঙ্গবন্ধুকে প্রেরণাদায়ী জ্ঞান করেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চেয়ে বাঙালির ইতিহাসে আর কোনো মহান নেতা নেই। ইতিহাসে তাঁর চেয়ে উজ্জ্বলতর কোনো চরিত্র নেই। দেশের কথা বলতে গেলে বঙ্গবন্ধু তাই অনিবার্যভাবে উঠে এসেছে। বাঙালির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঘটনা মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের চেয়ে ইতিহাসে আর কোনো প্রভাবক ঘটনা নেই। সেই মুক্তিযুদ্ধের কথা কবিতায় আনয়ন করতে হলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেখানেও শির উঁচু করে থাকেন। এই মহান ব্যক্তিত্বের করুণ পরিণতি ইতিহাসের সর্বাধিক নগ্ন-ঘৃণ্য ঘটনা। যার সাংগঠনিক নেতৃত্ব একটি দেশ এনে দিয়েছিল, তাঁকেই যখন স্বাধীন দেশের মাটিতে রক্তাক্ত করা হয়, নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়—তখন দেশবোধসম্পন্ন মানুষের পাথরশোকে নিমজ্জিত হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকে না। ফলে ইতিহাস আশ্রিত, দেশবোধনির্ভর চেতনাসমৃদ্ধ কবির সৃষ্টিতে অবলীলায় অবিরল ঝরনাধারার মতো উঠে আসেন বঙ্গবন্ধু।

সৈয়দ শামসুল হকের জনপ্রিয় এবং বহুলপঠিত একটি কবিতা থেকে বঙ্গবন্ধুপ্রীতির প্রথম দৃষ্টান্ত দেওয়া যেতে পারে। এ কবিতার নাম ‘আমার পরিচয়’। কবিতাটিতে কবি নিজের পরিচয় দিয়েছেন জাতিগত পরিচয়। ইতিহাসের পারম্পর্য এখানে বিধৃত। ইতিহাসের দীর্ঘ বয়ান শেষে কবি এখানে বঙ্গবন্ধুর কথা লিখেছেন। বাঙালির সমৃদ্ধ ইতিহাসের বর্ণনায় কবি তিতুমীর, হাজী শরীয়ত উল্লাহ, ক্ষুদিরাম, সূর্য সেন, জয়নুল, অবনঠাকুরের কথা বলেছেন। ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতাঞ্জলি, কাজী নজরুল ইসলামের অগ্নিবীণার কথা বলেছেন। সেই ইতিহাস কবি কিছুতেই ভুল যেতে পারেন না। এর কারণ হিসেবে তিনি লিখেছেন—

এই ইতিহাস ভুলে যাবো আজ, আমি কি তেমন সন্তান?/যখন আমার জনকের নাম শেখ মুজিবুর রহমান,/তাঁরই ইতিহাস প্রেরণায় আমি বাংলা পথ চলি—/চোখে নীলাকাশ, বুকে বিশ্বাস পায়ে উর্বর পলি। ‘আমি সাক্ষী’ শীর্ষক কবিতায় ও কবির অভিন্ন চিন্তার প্রতিচ্ছবি লক্ষ করা যায়। বঙ্গবন্ধুর প্রেরণায় পথচলার কথা এ কবিতাতেও বিধৃত। এ কবিতায় কবি লিখেছেন—‘তবুও পথিক আমি, কবি আমি,/সৃষ্টিশীল এখনো আমি,/এখনো যে অগ্রসর হয়েই চলেছি,/নবান্নর ঘ্রাণডাক বাঙালির প্রাঙ্গণের দিকে,/সে কেবল তাঁরই প্রেরণায়—।

‘মুজিবের শাদা পায়রাটি’ শীর্ষক কবিতায় কবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্থান-কাল নিরপেক্ষ করে উপস্থাপন করেছেন। পৃথিবীর বুকে যেকোনো স্থানে স্বাধীনতার কথা বলার মধ্যে কবি নিজেদের খুঁজে পান। নিজেদের মুক্তি এবং স্বাধীনতাকেই দেখেন। মুজিবকে ধারণ করেই লেখকের শক্তিমান হয়ে ওঠার ইঙ্গিত এখানে লক্ষণীয়। কবির ভাষায়—‘মুজিবের চাদর আমরা গায়ে নেব জড়িয়ে,/উত্তাপে বিশাল হয়ে উঠবো, স্বপ্নের ভূমিতে সুস্থির।/আমাদের হাতে থাকবে মানুষেরই হাতের গ্রন্থন—/করতল ও হাতের মুদ্রা থেকে বেরিয়ে আসবে/সেই শাদা শাদা পায়রাটি আবার,/মুজিবের হাত থেকে/একদিন যে উড়েছিলো বাংলার আকাশে/এবং অনূদিত হয়েছিল অক্ষর দুটি শব্দে/মুক্তির সংগ্রাম ও স্বাধীনতা।’

‘মুজিবের রক্তাক্ত বাংলায়’ শীর্ষক কবিতার শেষ চরণে মুজিবের কথা উঠে এসেছে। সম্পূর্ণ কবিতায় তিনি নিজেকে বিভিন্ন সময়ের মধ্যে গেঁথে দিয়েছেন। দেশের কথা বলার লক্ষ্যেই কবিতার পঙক্তিগুলো সাজিয়েছেন। কবিতার শেষ চরণে এসে তিনি কবিতাটিকে মুড়িয়ে দিয়েছেন এমনভাবে যেন সর্বত্রই তখন মুজিবের উপস্থিতি জ্বলজ্বল করতে থাকে। কবিতার শেষাংশের পাঠ পুনর্ভাবনার জন্ম দেয়। কবিতাটির সামষ্টিক অর্থবিন্যাসে মুজিব অবিচ্ছেদ্য হয়ে ওঠেন। কবি লিখেছেন—‘তাঁর পদচিহ্ন থেকে জাত আমি,/গরীবুল্লাহ, আবদুল হাকিম/বসে আছি/নিহত পয়ার কোলে মুজিবের রক্তাক্ত বাংলায়। কবিতার সৌষ্ঠব অবিকৃত রেখে কবিতায় বঙ্গবন্ধুকে রূপ দিয়েছেন সৈয়দ শামসুল হক। কবিতার শিরোনামের মধ্যেই মুজিবের ঘোষণা আছে। কবিতার ভেতরে তার সন্ধান পেতে পাঠ করতে হয় শেষ চরণাবধি।

সৈয়দ শামসুল হক যখন বাংলাদেশকে বিপথগামী হতে দেখেছেন তখন বাংলাদেশকে তার নিজস্ব গতিসৌন্দর্যে প্রত্যাবর্তন করার আহবান জানিয়েছেন। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে সামরিক বাহিনীর বুলেটে ক্ষতবিক্ষত ছিল বাংলাদেশ। বিপন্ন ছিল গণতন্ত্র। স্বাধীনতার অর্থও মুহ্যমান হয়েছিল। এমন সময়ে কবিতাশিল্পের মাধ্যমে কবি বাংলাদেশকে ফিরে আসার আহবান জানিয়েছিলেন। সেই আহবান গভীর আবেগের, অন্তহীন ভালোবাসার। সেখানে তিনি বঙ্গবন্ধুর কথা বলেছেন। কবির ভাষায়—ফিরে এসো, বাংলাদেশ,/ফিরে এসো লৌহিত্য নদের কিনারে,/ফিরে এসো মানুষের মিছিলে আবার,/ফিরে এসো যোদ্ধার পেশীতে তুমি,/ফিরে এসো মুজিবের কণ্ঠস্বরে,/ফিরে এসো রবীন্দ্রনাথের গানে,/নজরুলের আগুনে আবার,/ফিরে এসো বাংলাদেশ, আমার মিনতি,/ফিরে এসো লৌহিত্য নদের কিনারে।’

টুঙ্গিপাড়ায় বসে সৈয়দ শামসুল হক লিখেছেন ‘বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে’ কবিতাটি। ‘যেন পথই টেনে নিয়ে এলো এই পল্লীটিতে’ লেখার মধ্য দিয়ে কবি বঙ্গবন্ধুর প্রতি নিজের অকৃত্রিম অন্তর্গত টানের কথাই উচ্চারণ করেছেন। কবিতায় কবি বঙ্গবন্ধুকে উপজীব্য করেছেন। দূরবর্তী ইঙ্গিতধর্মিতার পরিবর্তে এখানে কবি বিষয়ঘনিষ্ঠ হয়েছেন। কবিতার পরতে পরতে পতপত করে উড়ছে বঙ্গবন্ধু। ১৯৯৪ সালেও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সরব হওয়ার মতো উপযুক্ত পরিবেশ প্রস্তুত হয়নি। যারা বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলেছে, বঙ্গবন্ধুর প্রদর্শিত পথকে বন্ধুর করে তুলেছে ‘বিষ্ঠায় পতিত হবে অচিরে তারাই’ বলে মন্তব্য করেছেন কবি। ভবিতব্য সম্পর্কে কবিতার বাণীবিন্যাস তার যথার্থই ছিল। সময় তার সাক্ষী।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা বাঙালি জাতির চূড়ান্ত অবক্ষয়ের দৃষ্টান্ত। একটি দেশের আক্ষরিক অর্থেই যিনি স্থপতি, তাঁকেই নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তাঁর এই হত্যাকাণ্ড জনমনে গভীর ছাপ ফেলে গেছে। বঙ্গবন্ধুপ্রেমী কবি-সাহিত্যিকরা কেউই এই বিষয় নিয়ে লেখার মাধ্যমে প্রতিবাদ জানাতে ভোলেননি। সৈয়দ শামসুল হক অসংখ্য কবিতায় সে কথা লিখেছেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। কবি এই সময় সম্পর্কে মূল্যায়ন করেছেন ‘দাঁতালের ছাল’। ‘আমি সাক্ষী’ কবিতাটি সৈয়দ শামসুল হক বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু নিয়ে লিখেছেন। কবির ভাষায়—‘আমি সাক্ষী। লিখে রেখো এ আমার নাম।/তেরোশ’ বিরাশি সন। মেঘার্ত শ্রাবণ। শেষ রাত।/অকস্মাৎ! —বৃষ্টি নয়, ঘটে গেলো রাষ্ট্রস্বপ্ন থেকে রক্তপাত। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের মতো ব্যাপ্ত ছিল যাঁর বুক/বিদ্ধ হলো উত্তপ্ত বুলেটে।/দেহ শুধু দেহ নয়—ইতিহাস, মূল্যবোধ, শ্রেয়—/ভেসে গেলো বাংলাদেশ রক্তের প্লাবনে—/অন্তিম শয়ানে। এ কবিতায় হাজার বছরের পথ ধরে বয়ে আসা সময়ের বুকে বঙ্গবন্ধু কিভাবে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন তারও বয়ান আছে।

মুজিবের প্রতি সৈয়দ শামসুল হকের বিশেষ উপলব্ধি ছিল। আর এই উপলব্ধি মূলত দেশবোধজাত। আর তারই ছায়া-প্রতিচ্ছায়া বারবার পড়েছে কবিতার আঙিনায়। কবির ভাবলোকে যেসব অনুষঙ্গ প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে সেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অন্যতম। কবির সুদীর্ঘ কাব্যবলয়ে বঙ্গবন্ধু যতবার যতভাবে এসেছেন, তা বৃহৎ পরিসরে গবেষণার দাবি রাখে। নিশ্চয়ই সেই গবেষণা আগামীতে হবে। কবিকে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম দেখতে চাইলে এসব অনুষঙ্গের বিশ্লেষণ জরুরি। কবির পঞ্চম প্রয়াণবার্ষিকী স্মরণে কবিকে পাঠকের পক্ষে বিনীত স্মরণ।



সাতদিনের সেরা