kalerkantho

রবিবার । ১ কার্তিক ১৪২৮। ১৭ অক্টোবর ২০২১। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

আমার বাবা মুর্তজা বশীর

মুনিজা বশীর   

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



আমার বাবা মুর্তজা বশীর

‘দাঁড়ান, সাক্ষাৎকারের সময় সকাল ১০টা থেকে ১১টা, বিকেল ৪টা থেকে ৫টা’—লেখাটা পড়লে মনে হবে কোনো ডাক্তারের চেম্বারে রোগী দেখার সময়সূচি। আসলে তা না, আমাদের চট্টেশ্বরী রোডের এনেসেল ম্যানশনের ফ্ল্যাট নং ৫-এ আব্বুর রুমের দরজায় এই কথাটিই লেখা ছিল। আমাদের ছেলেবেলা কেটেছে চট্টেশ্বরী রোডের এনেসেল ম্যানশনে। বিশাল ড্রইং-ডাইনিংয়ের এক পাশে ছিল আব্বুর স্টুডিও। ছোট, বড়, মাঝারি নানা সাইজের ক্যানভাস আর রংতুলিতে ঠাসা ছিল স্টুডিওটা।

আব্বু সারা বছর ছবি আঁকতেন না। যখন শুরু করতেন একনাগাড়ে এঁকেই যেতেন। আব্বু ছবি এঁকে প্রথমে আম্মুকে দেখাতেন, আম্মুর মতামত নিতেন। আম্মুর পেইন্টিংয়ের ওপর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। কিন্তু অনেক সময় দেখা গেছে, আব্বু আঁকা ছবির রং কম্বিনেশন কিংবা প্যাটার্ন বদলে ফেলেছেন শুধু আম্মুর পছন্দকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে।

ছেলেবেলায় প্রচণ্ড ব্যক্তিত্বসম্পন্ন আব্বুকে আমার মাঝে মাঝে দুর্বোধ্য মনে হতো। আব্বু আমাদের তিন ভাই-বোনকে কখনো শাসন করেননি। তিনি নিজেও স্বাধীনচেতা ছিলেন, আমাদেরও স্বাধীনচেতা করে গড়ে তুলেছেন। বলতেন, মাথা নত করলে আল্লাহর কাছে করো, মানুষের কাছে নয়।

আব্বুর চারপাশে একটা অদৃশ্য বলয় ছিল। সহজে কেউ ওই বলয় ভেদ করে তাঁর কাছাকাছি যেতে পারত না। একবার যদি কেউ ওই বলয়টা ভেদ করে তাঁর কাছে যেতে পারত, তাহলে দেখত কঠিন বলয়ের ভেতর একেবারেই একটা অন্য মানুষ, অনেক বেশি বন্ধুবৎসল। প্রচণ্ড ব্যক্তিত্ব নিয়ে চলতেন। তাঁর মধ্যে এক ধরনের সম্মোহনী শক্তি ছিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তিনি বলে যেতেন আর অন্যরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনত।

তিনি গতানুগতিক বাঙালি বাবাদের মতো ছিলেন না। ইউরোপে পড়ালেখার সুবাদে মন-মানসিকতায় ছিল পাশ্চাত্যের প্রভাব। সময়ানুবর্তিতা, নিয়মানুবর্তিতা ও কাজের প্রতি নিষ্ঠা আমার মধ্যে যা আছে, সবটুকুই বাবার অবদান।

জীবনের দীর্ঘ সময় আব্বু চট্টগ্রামে ছিলেন। মনে আছে, যখন স্কুলের ফাইনাল পরীক্ষার পর ঢাকায় যেতাম, তখন আব্বু সঙ্গে থাকলে বাস বা ট্রেন স্টেশনে নির্ধারিত সময়ের দুই ঘণ্টা আগে গিয়ে বসে থাকতে হতো। এ নিয়ে আম্মু অনেক রাগারাগিও করতেন। কিন্তু আব্বুর এক কথা। বন্ধু-বান্ধবের সংখ্যা আমার হাতে গোনা। তাদের বাসায় বেড়াতে গেলে আব্বু বারবার বলে দিতেন সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বাড়ি ফিরবে। ৬টা বাজার এক মিনিট দেরি হলে আব্বু মনে মনে ক্ষুব্ধ হতেন, মুখে কিছু বলতেন না।

আমরা তিন ভাই-বোন সব সময় আব্বুর পছন্দটাকে প্রাধান্য দিয়েছি। খুব শখ ছিল ফাইন আর্টস পড়ব, ছবিও মোটামুটি ভালোই আঁকতাম। চুরি করে আব্বুর ক্যানভাসে অনেক ছবি এঁকেছি। কিন্তু আব্বু বললেন, ‘বিবিএ পড়।’ বললেন, ‘আর্টিস্টের জীবন অনেক কষ্টের, অনেক struggle করতে হয়। আমি পিতা হয়ে সন্তানের কষ্ট সহ্য করতে পারব না।’ ব্যস, আর্টিস্ট হওয়ার স্বপ্নটা স্বপ্নই রয়ে গেল। আমি ব্যাংকার হয়ে গেলাম।

আব্বু ছিলেন একজন প্রেমময় স্বামী আর দায়িত্বশীল পিতা। সন্তানদের ব্যাপারে আব্বুকে কখনো দেখিনি কারো ব্যাপারে পক্ষপাতিত্ব করেছেন। তিন সন্তানকে সমান চোখে দেখেছেন। যখনই কোনো ছবি বিক্রি হতো আব্বু বিক্রির টাকার কিছু অংশ আমাদের তিন ভাই-বোন এবং সেই সঙ্গে আম্মুকে সমান ভাগ করে দিতেন। কোনো সিরিজ যখন আঁকতেন, সেখান থেকেও  তিন ভাই-বোনকে পছন্দ করে ছবি বেছে নিতে বলতেন। আমি চট্টগ্রামে থাকি। ঢাকায় গেলে বলতেন, ‘যুথী, তুই এখান থেকে যেটা ভালো লাগে বেছে নে। যুঁই আর যামীকেও দিয়েছি।’

এই হলেন ‘শিল্পী মুর্তজা বশীর’—আমাদের পিতা। তিনি ছিলেন স্পষ্টভাষী। অপ্রিয় সত্য কথাটা বলতেও কখনো ইতস্তত করতে দেখিনি। সেটা যেই হোক, পছন্দ হয়নি—বলে ফেলবেন।

আব্বু আমাকে শিখিয়েছেন কাজের প্রতি একাগ্রতা, সততা ও নিষ্ঠা। প্রচণ্ড নীতিবান ছিলেন। অনৈতিক কোনো ব্যাপারে কখনো আপস করেননি। আমাদের আব্বু শিখিয়েছেন সত্ভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে, এক আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে মাথা নত না করতে। তিনি বলতেন, ‘তোমার যা কিছু চাওয়ার আল্লাহর কাছে চাও, তিনিই পারেন তোমাকে সব কিছু দিতে।’

আব্বু যথেষ্ট পরিমাণে ফ্যাশনসচেতন ছিলেন। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শার্টের ডিজাইন, প্যান্টের ডিজাইনে পরিবর্তন এনেছেন। বয়স যাই হোক না কেন, মনটা ছিল রঙিন,  চিরযুবা। খুব কালারফুল পোশাক পছন্দ করতেন। আমি যখনই দেশের বাইরে ব্যাংকক বা মালয়েশিয়া গেছি, আমাকে সে দেশের রংচঙে লুঙ্গি নিয়ে আসতে বলতেন, সেগুলো দিয়ে শার্ট বানিয়ে পরতেন। আমাদের পোশাকের ডিজাইনও করেছেন অনেক সময়।

আব্বু নিজেকে গুটিয়ে রাখতেন। আনুষ্ঠানিকতা এড়িয়ে চলতেন। তিনি ছিলেন আমাদের বন্ধুর মতো। পরিবারকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। আত্মকেন্দ্রিক, প্রচারবিমুখ আব্বু সব সময় পরিবারকে সময় দিয়েছেন। আব্বুর শখের কমতি ছিল না। বিখ্যাত ব্যক্তিদের অটোগ্রাফ, পুরনো মুদ্রা, কারেন্সি নোট, স্ট্যাম্প, দিয়াশলাইয়ের বাক্সের দুর্লভ কালেকশন আছে আব্বুর। পরিচিতজনরা দেশের বাইরে গেলেই বলতেন সেই দেশের মুদ্রা, কারেন্সি নোট আনার জন্য। আব্বুর দেখাদেখি আমার মধ্যেও অটোগ্রাফ কালেকশনের প্রবণতা দেখা দেয়, দিয়াশলাইয়ের কাঠি জমানোর নেশাও পেয়ে বসে। আব্বু আমাকে দেশ-বিদেশের বরেণ্য শিল্পী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের অটোগ্রাফ এনে দিয়েছেন। অটোগ্রাফ বুকগুলো আমার কাছে অমূল্য সম্পদ।

আব্বুর বাগানের শখ ছিল। যখন চিটাগংয়ে ছিলেন, তখন আমি আর আব্বু খুব ভোরে চলে যেতাম বৈশাখী মেলায়। ওখান থেকে গাছ, টব, পাতাবাহার, ফুলগাছ কিনতাম। গাছের পরিচর্যা আব্বু নিজেই করতেন। ঢাকার বাসায়ও আব্বু বেডরুম লাগোয়া বারান্দায় পাতাবাহার রেখেছিলেন। প্রতিদিন সকালে উনি কিছুক্ষণের জন্য কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়া বারান্দায় বসতেন।

আম্মুকে কখনো দেখিনি আব্বুর কাপড়ের আলমারি কিংবা বইপত্র গুছিয়ে দিতে, আব্বু পছন্দ করতেন না। নিজের সব কিছু তিনি নিজেই গোছাতেন। দিদির ম্যাট্রিক পরীক্ষার সময় আম্মু আফিবুর (আব্বুর চাচাতো ভাইয়ের মেয়ে) সঙ্গে কলকাতায় এক সপ্তাহের জন্য বেড়াতে গেলেন। আব্বু তিন বছরের যামীকে কোলে করে ফিডিং বোতলে দুধ বানিয়ে আমাকে সঙ্গে নিয়ে দিদির জন্য খাবার নিয়ে যেতেন। আমাদের তিন ভাই-বোনের জন্মদিন, জামাতা, পুত্রবধূ, নাতিদের জন্মদিন, আমাদের বিয়েবার্ষিকী, ঈদ—সব কিছুতে আব্বু সবাইকে দুই হাজার টাকা করে দিতেন। ফেসবুকে সুন্দর করে শুভেচ্ছা জানাতেন। যখন ফেসবুক ছিল না তখন কার্ড দিয়ে শুভেচ্ছা জানাতেন।

ঢাকায় যাওয়ার এক সপ্তাহ আগে থেকে বলা শুরু করতাম—আব্বু, আমি আসছি, কোনো কাজ হাতে রাখবেন না। আমার সঙ্গে ঘুরতে যেতে হবে। যখন ঢাকায় যেতাম, আব্বু মোটামুটি নিজেকে ফ্রি রাখতেন। ঢাকায় গেলে আমার শুধু দুটি কাজ ছিল। এক. ঘুমানো আর দুই. আব্বুকে নিয়ে বেড়ানো। আম্মু খুব একটা বের হতেন না। আম্মু মাঝে মাঝে বলতেন, তুই কি ঢাকায় ঘুমাতে আসিস? চিটাগংয়ে কি কিছু পাওয়া যায় না? সারা দিন শুধু মার্কেটে থাকিস। আমি আব্বুকে নিয়ে গাউছিয়া, ঢাকা নিউ মার্কেট, বসুন্ধরা সিটি, গুলশান মার্কেট ঘুরতে যেতাম। আব্বুও খুব স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমার সঙ্গে ঘুরে বেড়াতেন।

আব্বু সব সময় ঈদের শপিংয়ে আমাদের সঙ্গে নিয়ে যেতেন। নিজে পছন্দ করে আমাদের ঈদের পোশাক, জুতা কিনে দিতেন। আম্মুকে কখনো দেখিনি একা একা শপিংয়ে যেতে, সব সময় আব্বুর সঙ্গেই যেতেন। আব্বুর পছন্দটাকেই প্রাধান্য দিতেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেটাই করে গেছেন। আম্মুকে মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করতাম, আব্বুর সব কিছুই কি আপনার ভালো লাগে? আপনার নিজের কোনো পছন্দ নেই?

আম্মু মারা যাওয়ার পরও অনেক দিন আব্বু আম্মুর প্রিয় ম্যাগাজিন ‘বেগম’ নিয়মিত নিতেন। আব্বুকে যদি বলতাম, আব্বু কেন নিচ্ছেন শুধু শুধু? বলতেন ‘থাক, নেই না, যে কয়দিন পারি, তোর আম্মু পড়ত।’ ২০১৪ সাল থেকে শুরু করে ২০১৭ সাল পর্যন্ত আমার অসুস্থ আম্মুকে ক্লান্তিহীনভাবে সেবা করে গেছেন। আম্মু হসপিটালে ভর্তি হলে আব্বু সারা দিন হসপিটালে বসে থাকতেন। নিজে অসুস্থ ছিলেন, ২৪ ঘণ্টা তাঁকে কৃত্রিম উপায়ে অক্সিজেন নিয়ে চলতে হতো। কিন্তু তবু বসে থাকতেন। আম্মুর মৃত্যুর পর প্রতি শুক্রবার কবর জিয়ারত করতে বনানী কবরস্থানে যেতেন। কিন্তু ২০২০ সালে করোনার জন্য যেতে পারতেন না বলে আক্ষেপের শেষ ছিল না। আব্বুর পাখি খুব পছন্দ ছিল। এনেসেল ম্যানশনের বাসায় আব্বু টিয়া পাখি, ময়না পাখি, কবুতর পালতেন। আব্বু বলতেন, আমি মানুষ হয়ে না জন্মে পাখি হয়ে জন্মালে ভালো হতো। বলতেন, ‘আমি উড়তে চাই, কিন্তু আমার ডানা নেই।’ আমার পাখি হতে চাওয়া আব্বু, জন্মদিনের দুই দিন আগে ১৫ আগস্ট ২০২০ তারিখে সত্যি সত্যি উড়ে চলে গেলেন। আমাকে এখন আর কেউ বলার নেই ‘কবে ঢাকায় আসবি?’ তোর ব্যাংকের ছুটি কবে? শুক্রবার গিয়ে শনিবার চিটাগংয়ে ফেরত আসা কিংবা রবিবার এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি অফিস করা... এগুলো এখন আর হয় না। কখনো কখনো মনে হয় দূর আকাশের তারা হয়ে আব্বু তাকিয়ে আছেন, দেখছেন আর মিটমিট করে হেসে বলছেন, ভালো থাকিস।



সাতদিনের সেরা