kalerkantho

রবিবার । ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৫ ডিসেম্বর ২০২১। ২৯ রবিউস সানি ১৪৪৩

বই আলোচনা

জীবনানন্দ দাশের কবিতার নতুন বই

জীবনানন্দ দাশের কবিতা নিয়ে প্রায় ৩০ বছর ধরে গবেষণা করছেন ফয়জুল লতিফ চৌধুরী। তাঁর সম্পাদনায় সম্প্রতি বেরিয়েছে কবি জীবনানন্দ দাশের অগ্রন্থিত কবিতার বই ‘সূর্য-অসূর্যলোক’। এ ছাড়া ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যের মূল পরিকল্পিত পাণ্ডুলিপি ‘বাংলার ত্রস্ত নীলিমা’। বই দুটি নিয়ে আমাদের এ সপ্তাহের আয়োজন। লিখেছেন কবি হানযালা হান

৬ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জীবনানন্দ দাশের কবিতার নতুন বই

সূর্য-অসূর্যলোক

বিস্ময় ও রহস্য—কবিতায় এই দুইয়ের জটিল মিশ্রণ ঘটিয়েছেন জীবনানন্দ দাশ। জীবনের পরতে পরতেও কি কবি কম বিস্ময় ও রহস্য রেখে গেছেন? না। কবিতার চেয়ে যেন আরো বেশি পরাবাস্তব জীবন। কেমন সেটা? জীবিতকালে মাত্র ১৬১টি কবিতা ছয়টি গ্রন্থে ছেপেছিলেন। মৃত্যুর পর তাঁর লেখার ঘরে কয়েকটি ট্রাংক পাওয়া যায়। এর মধ্য থেকে কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে কবিতার ৪৮টি খাতা জমা আছে। এসব খাতা থেকে একে একে ছাপা হয়েছে ‘রূপসী বাংলা’, ‘বেলা অবেলা কালবেলা’, ‘সুদর্শনা’, ‘আলোপৃথিবী’ ও ‘হে প্রেম তোমাকে ভেবে ভেবে’ কাব্যগ্রন্থ। এখনো সহস্রাধিক কবিতা অগ্রন্থিত রয়ে গেছে। এরই মধ্য থেকে ফয়জুল লতিফ চৌধুরীর সম্পাদনায় বেরিয়েছে ‘সূর্য-অসূর্যলোক’। এতে রয়েছে বাছাই করা ১১৭টি কবিতা।

এই সব কবিতা কেমন? ভূমিকায় ফয়জুল লতিফ চৌধুরী আমাদের জানাচ্ছেন, জীবনানন্দের আড়াই হাজার কবিতা গঠন করেছে একটি অখণ্ড কাব্যভুবন, যা আকাশের সুসংস্থিত নক্ষত্রমণ্ডলীর মতো পরস্পর সুসামঞ্জস্য চিত্রকল্পের প্রেক্ষাপটে ধারণ করেছে সাযুজ্যময় আবেগ ও উপলব্ধির চেতনাপ্রবাহ।

এই আবেগ ও চেতনাপ্রবাহের ছাপ রয়েছে সংকলনটির প্রতিটি কবিতায়। ৬৬ নম্বর কবিতাটির কথা বলা যেতে পারে, এক মেয়ের কথা লিখেছেন কবি। শরতের ভোরে তার মুখে মৃত্যুদণ্ড খেলা করে। রাতে যখন মেয়েটি ঘুমিয়েছিল, প্রত্যঙ্গ কাঁপিয়ে ‘পায়রার মতো’ অদ্ভুত উপলব্ধি হয়েছিল। ৩৮টি পঙক্তির কবিতা শেষ হয়েছে এভাবে, ‘এখানে নদীর পারে আমি এক পিপুল-বৃক্ষকে/বহু ক্ষণ স্পর্শ করে অনুভব করি। সেই অনুভূতি/ঘরে তুলে নিয়ে যাই। সকলের তরে নয়। হয়ত নরক নাই/তবুও স্বর্গে শোধিত হব প্রত্যেকেই আমাদের নিজেদের দ্বার দিয়ে।’

এই হচ্ছে জীবনানন্দ দাশের কবিতা, পড়লেই এতে জীবনানন্দনীয় স্বাতন্ত্র্য লক্ষ করা যায়। এ কারণে হয়তো তাঁর মৃত্যুর পর ‘শনিবারের চিঠিতে’ ছাপা হয়েছিল, ‘...তাঁকে কবিদের কবি বলা অন্যায় হবে না। এমনকি কবিদের মধ্যেও সকলের পক্ষে জীবনানন্দের কবিতার রস সম্পূর্ণ উপভোগ করা হয়তো সম্ভব হয় নি।’ এটি তরুণ ও যেকোনো বয়সী কবি-লেখকদের জন্য অবশ্য পাঠ্য একটি বই হিসেবে স্থান করে নেবে বলে মনে করছি।

সূর্য-অসূর্যলোক : জীবনানন্দ দাশ। ভূমিকা ও সম্পাদনা : ফয়জুল লতিফ চৌধুরী। প্রচ্ছদ পরিকল্পনা : সজীব ওয়ার্সী। প্রকাশক : সূচীপত্র, ফেব্রুয়ারি ২০২১। মূল্য : ৫০০ টাকা।

 

বাংলার ত্রস্ত নীলিমা

১৯৩৪। স্থান বরিশাল। জীবনানন্দ দাশ বিয়ে করে বরিশালে অবস্থান করছেন। কোনো চাকরি নেই। আবার বলা যায়, বেকারত্বের গ্লানিও নেই। এই দিনগুলোতে তিনি লেখেন ৭৩টি কবিতা। নাম দেন ‘বাংলার ত্রস্ত নীলিমা’। এর আগে জীবনানন্দ দাশের একটি কবিতার বই বের হয়েছে। এরপর তিনি বেঁচে ছিলেন ২০ বছর। পাঁচটি কবিতার বইও বের করেছেন। কিন্তু বা. ত্র. নী. বই আকারে প্রকাশের উদ্যোগ নেননি।

সেই যে শুরুতে বলেছি, কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে কবিতার ৪৮টি খাতা জমা আছে। এর মধ্যে ৬ নম্বর খাতা ছিল এটি। শুরুতে লেখা ছিল, ‘কবিতা, শ্রী জীবনানন্দ দাশ, মার্চ ১৯৩৪’।

১৯৫৭ সাল। জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুর পর তাঁর ভাই অশোকানন্দ দাশের ভূমিকায় এই বই বের হয়। সিগনেট প্রেসের মালিক দিলীপকুমার তথা ডি কে গুপ্ত বইয়ের নাম পাল্টে দেন ‘রূপসী বাংলা’। তাঁর যুক্তি, বা. ত্র. নী. নামটি খুব ভারী এবং কবিতাগুলোর সহজ ছন্দের সঙ্গে কেমন যেন বেমানান। কবিতাগুলো বাছাই করেন কবি ও গবেষক ভূমেন্দ্র গুহ এবং জীবনানন্দের বোন সুচরিতা দাশ। পাণ্ডুলিপিতে থাকা ৭৩টি কবিতার মধ্যে ৬২টি তাঁরা নেন। এ বিষয়ে ভূমেন্দ্র গুহ লিখেছেন, ‘... খাতার শেষের দিকের যে কবিতাগুলির চেহারা সনেট-জাতীয় নয়, সেগুলি আর কপি করলুম না, আলাদা করে রাখলুম অন্য কোনও ভাবে গ্রন্থিত হবে ভেবে।’

এদিকে জীবিতকালে জীবনানন্দ দাশ তরুণ কবি প্রভাকর সেনকে বা. ত্র. নী.-র কবিতাগুলোর সংবাদ জানিয়ে একটি চিঠি লেখেন। সেই চিঠিটিও পরবর্তী সময়ে হারিয়ে গেছে। তবে সেই চিঠির একটি অংশ অশোকানন্দ দাশ ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন, ‘এরা প্রত্যেকে আলাদা-আলাদা স্বতন্ত্র সত্তার মতো নয় কেউ, অপরপক্ষে সার্বিক বোধে এক শরীরী, গ্রামবাংলার আলুলায়িত প্রতিবেশ-প্রসূতির মতো ব্যষ্টিগত হয়েও পরিপূরকের মতো পরস্পরনির্ভর।’

প্রথম প্রকাশের ২৭ বছর পর ১৯৮৪ সালে দেবেশ রায়ের সম্পাদনায় ‘রূপসী বাংলা’র পাণ্ডুলিপি ও পাঠান্তর সংস্করণ বের হয়। এর ৩৪ বছর পর ২০১৮ সালে বের হয় ফয়জুল লতিফ চৌধুরীর সম্পাদনায় মূলানুগ ও অবিকৃত সংস্করণ। এরও তিন বছর পর অর্থাৎ পাণ্ডুলিপি তৈরির ৮৭ বছর পর বের হলো ‘বাংলার ত্রস্ত নীলিমা’। ভূমিকায় সম্পাদক লিখেছেন, ‘এ গ্রন্থ কেবল কবি পরিকল্পিত কাব্যের প্রকাশ নয়; ডান পাশের পৃষ্ঠায় পাণ্ডুলিপি-চিত্র সংস্থাপন করার কারণে এ গ্রন্থ বিশেষ কৌতূহলময় আবেদন সৃষ্টি করবে।’ এর ফলে জীবনানন্দ দাশের হাতের লেখার সঙ্গে পাঠক পরিচিত হওয়ার দুর্লভ সুযোগ পাবেন। এই দুটি গ্রন্থ পাঠের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য আমরা সম্পাদককে সাধুবাদ জানাই।

বাংলার ত্রস্ত নীলিমা : জীবনানন্দ দাশ; সম্পাদনা : ফয়জুল লতিফ চৌধুরী। প্রচ্ছদ : সেলিম আহমেদ। প্রকাশক : পাঠক সমাবেশ, মার্চ ২০২১। মূল্য : ৬৯৫ টাকা।



সাতদিনের সেরা