kalerkantho

বুধবার । ১১ কার্তিক ১৪২৮। ২৭ অক্টোবর ২০২১। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

মহাদেব সাহা

বাংলা কবিতায় বাংলার স্পন্দন

এমরান কবির   

৬ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাংলা কবিতায় বাংলার স্পন্দন

‘আমি সব বিষ করেছি অমৃত’—হাতে অমৃত কুম্ভ, পান করি বিষ (২০১৬) নামের কাব্যে এ ধরনের প্রয়াস তাঁর বিশেষ সংগ্রাম ও বিনির্মাণের পথকেই ইঙ্গিত করে। মানুষ হয়তো বোঝেনি। কিংবা তিনি হয়তো নিজেও একদা বোঝেননি যে জীবনটাই হলো সবচেয়ে বড় যুদ্ধক্ষেত্র। এখানে নানা ধরনের দৃশ্য-অদৃশ্য অস্ত্র তাক করা থাকে। মূর্ত-বিমূর্ত সেসব অস্ত্র জীবনকে বারবার স্থবির করতে চায়, বাঁক ফিরিয়ে নিতে চায় অমঙ্গলের দিকে। হাতে অমৃত কুম্ভ থাকতেও পান করতে হয় বিষ। মানুষ যেন নিঃস্ব ক্রীতদাস। এ এক আশ্চর্য মর্ম, জীবনদর্শনের অন্যতর উপলব্ধি। জীবনকুহরের নিবিষ্ট পরিব্রাজক হিসেবে তাই কবির সব বিষকে অমৃতে রূপান্তরকরণের মাঝে নিহিত থাকে অদম্য সংগ্রাম।

কবি মহাদেব সাহা। বাংলা কবিতার এক উল্লেখযোগ্য স্পন্দন। শুরুটা সেই ষাটের দশকে। স্বাধীনতা-উন্মুখ একটি জাতির সংগ্রামের বিকাশকাল হিসেবে যে সময়টি বিশেষভাবে চিহ্নিত। কবি তাঁর শিল্প ভিত্তির এই কালটি যাপন করেছেন রাজধানী ঢাকা থেকে বহুদূর মফস্বল শহর বগুড়ায়।  বাংলার স্বাধীনতাসংগ্রাম যখন ধাপে ধাপে একটা পর্যায়ে উন্নীত হচ্ছে, তখন বিশ্বব্যাপী সাহিত্য আন্দোলনের নতুনতর জোয়ার বইতে শুরু করেছে। কবি মহাদেব সাহা সেই সংগ্রাম ও আন্দোলনের সারথি ছিলেন। অ্যাংরি জেনারেশন, বিট জেনারেশন, হাংরি জেনারেশনের বাতাস ও আবহ তৎকালীন পূর্ব বাংলার কয়েকটি শহরে ছড়িয়ে পড়ে। বগুড়ায় বসে তিনি ও তাঁর সতীর্থরা এর উন্মাদনায় মিলিত হন। মেতে ওঠেন শিল্প-সাধনায়। স্পর্ধিত কতিপয় তরুণ যখন নিউ ইয়র্ক শহর কবিতায়-গানে-শিল্পকলায় নতুনতর প্রতিপাদ্যে মাতিয়ে তুলছেন, প্রশ্ন তুলছেন প্রচলিত প্রকরণের দিকে কিংবা কলকাতা যখন অন্যতর শিল্প-যাতনায় উন্মুখ হয়ে নিরীক্ষা চালাচ্ছে প্রচলিত ধারণার বিপরীতে, তখন বগুড়ায়ও কতিপয় তরুণ অদ্ভুতভাবে তাড়িত হচ্ছেন শিল্পসাধনায়। এরই ফলে যথাযথ তারুণ্যের স্পর্ধা, প্রতিবাদ, নিরীক্ষা এবং প্রচলিত ধারণার ভিত নাড়িয়ে দিয়ে মহাদেব সাহা ও ফারুক সিদ্দিকীর যৌথ সম্পাদনায় বের হয়ে যায় ছোটকাগজ বিপ্রতীক। মফস্বল থেকে বের হওয়া সেই কাগজকেই বাংলাদেশের প্রথম মফস্বলীয়তা-মুক্ত কাগজ হিসেবে গণ্য করা হয়।

ষাটের দশকের শেষদিকে বগুড়া পর্বের ইতি ঘটে তাঁর জীবনে। এরপর কথাসাহিত্যিক জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের হাত ধরে তিনি প্রবেশ করেন সাংবাদিকতায়। তৎকালীন সাপ্তাহিক পূর্বদেশ পত্রিকায় যোগদানের মাধ্যমে শুরু হয় তাঁর কর্মজীবন। তারপর আর ছোটকাগজ সম্পাদনার দিকে যাননি। বিভিন্ন পত্রিকায় কর্মরত থাকার পর সর্বশেষ ইত্তেফাক থেকে অবসরগ্রহণ করেন। তারপর কানাডায় স্বেচ্ছানির্বাসন পর্বের পর তিনি এখন তাঁর জল কাদার দেশ, প্রিয় ভূমিতে অবস্থান করছেন।

কবিতা, প্রবন্ধ, আত্মজীবনী, শিশুসাহিত্য এবং সংকলন মিলিয়ে শতাধিক গ্রন্থের জনক তিনি। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘এই ঘর এই সন্ন্যাস’ বের হয়েছে ১৯৭২ সালে। তারপর একে একে বের হতে থাকে অন্য কাব্যগ্রন্থগুলো। উল্লেখযোগ্য ‘মানব মানব এসেছি কাছে’ (১৯৭৩), ‘চাই বিষ অমরতা’ (১৯৭৫), ‘কী সুন্দর অন্ধ’ (১৯৭৮), ‘তোমার পায়ের শব্দ’ (১৯৮২), ‘লাজুক লিরিক’ (১৯৮৪), ‘মানুষ বড়ো ক্রন্দন জানে না’ (১৯৮৯), ‘অস্তমিত কালের গৌরব’ (১৯৯২), ‘যদুবংশ ধ্বংসের আগে’ (১৯৯৪), ‘বিষাদ ছুঁয়েছে আজ, মন ভালো নেই’ (১৯৯৬), ‘তোমার জন্য অন্তমিল’ (১৯৯৬), ‘ভুলি নাই তোমাকে রুমাল’ (১৯৯৬), ‘কে তুমি বিষণ্নফুল’ (১৯৯৯), ‘অপরূপ অনুজ্জ্বল’ (১৯৯৯), ‘কেন মোহে কেনবা বিরহে’ (২০০০), ‘অন্ধের আঙুলে এতো যাদু’ (২০০৯)। প্রবন্ধগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘গরিমাহীন গদ্য’ (২০০৯), ‘আনন্দের মৃত্যু নাই’ (২০১১), ‘ভাবনার ভিন্নতা’ (২০১১), ‘কবির দেশ ও অন্যান্য ভাবনা’ (২০১১)।

‘আমি কি কিছুর মতো? কারো মতো? কোনো/সদৃশ বস্তুর মতো?—যে/আমাকে মেলাবে,/সোনালী ঝর্ণার সাথে, সবুজ বৃক্ষের সাথে,/নদী ও তারার সাথে?/আমি কি কিছুর মতো? শিশু ও শিল্পের মতো? রদাঁর মূর্তির মতো?/হয়তোবা পাখি, হয়তোবা ফুল, হয়তো সে দরবেশ/আমি এ কিসের মতো?—যে/ আমাকে মেলাবে.../... আমাকে যা ভাবো, ধরো নদী, ধরো স্থল, ধরো অগ্নি,/আমি বস্তুত স্বভাব।’ ‘স্বভাব’-নামীয় কবিতায় কবি মহাদেব সাহা এভাবেই জীবনের বহুমাত্রিক মর্মের ভেতরে নিয়ে যান। সদৃশ বস্তুর সঙ্গে তিনি তুলনা, প্রতিতুলনাও করতে থাকেন—নিজেকে, প্রকৃতিকে, স্বভাবকে। মূর্তের মধ্যে মেলাতে চান বিমূর্ত অনুভব। শেষে বলেন, ‘আমি মূলত স্বভাব।’ নিজের মূর্ততার সঙ্গে, এ দেশের অবিচ্ছেদ্য উপাদান—সোনালি ঝরনা, সবুজ বৃক্ষ, নদী, পাখি, ফুল, টিয়ার চোখ, নদীর শব্দ, পাতার শিশির, মেঘ, ভাঁটফুল প্রভৃতির সঙ্গে তুলনা ও সামঞ্জস্য খুঁজে খুঁজে তিনি লীন করে দিচ্ছেন বিমূর্ত রূপ ‘স্বভাব’-এর সঙ্গে। এভাবে নিজেকে এ দেশের জল, হাওয়া, প্রকৃতির সঙ্গে মিলমিশ করে দেওয়ার উদাহরণ খুব বেশি নেই।

এ দেশ আর এ দেশের মানুষ তাঁকে বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত করেছেন। বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮৩), আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৫), বগুড়া লেখকচক্র পুরস্কার (১৯৯৭), খালেকদাদ চৌধুরী পুরস্কার (২০০২), জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার (২০০৮), স্বাধীনতা পুরস্কার (২০২১)।

স্বনামধন্য এই কবি জন্মেছেন ১৯৪৪ সালের ৫ আগস্ট। জন্মদিনে তাঁকে প্রণতি জানাই।



সাতদিনের সেরা