kalerkantho

শুক্রবার । ৩ বৈশাখ ১৪২৮। ১৬ এপ্রিল ২০২১। ৩ রমজান ১৪৪২

আমার হুলিয়া ও বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের প্রেক্ষাপটে কবিতার রচনাপট

নির্মলেন্দু গুণ

৫ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



আমার হুলিয়া ও বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের প্রেক্ষাপটে কবিতার রচনাপট

প্রখ্যাত সাংবাদিক-সাহিত্যিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী তাঁর জনপ্রিয় কলাম ‘তৃতীয় মত’-এ আমার ‘হুলিয়া’ কবিতাটি নিয়ে একটি দীর্ঘ লেখা লিখেছিলেন।

(দৈনিক পূর্বদেশ, তৃতীয় মত, ২৪ জুলাই ১৯৭০)।

বঙ্গবন্ধু কবি হিসেবে আমাকে আগে থেকেই জানতেন। তাঁকে উৎসর্গ করে আমি একটি দীর্ঘ কবিতা লিখেছিলাম। কবিতাটি দৈনিক সংবাদের সাহিত্য পাতায় ছাপা হয়েছিল ১৯৬৭ সালের ১২ নভেম্বর।

সংবাদের সাহিত্য সম্পাদক রণেশ দাশগুপ্ত তখন কারাগারে ছিলেন বলে ঔপন্যাসিক শহীদুল্লা কায়সার তখন ওই পাতাটি সম্পাদনা করতেন। তিনি পত্রিকা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি নিয়েই ওই কবিতাটি সংবাদে ছেপেছিলেন। ওটাই ছিল পূর্ব বাংলার উদীয়মান সূর্যকে নিয়ে রচিত প্রথম কবিতা। কবিতাটির নাম ‘প্রচ্ছদের জন্য’।

উৎসর্গ শেখ মুজিবুর রহমানকে। তিনি তখনো বঙ্গবন্ধু হননি। ১৯৬৯ সালে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে রেসকোর্স ময়দানের আয়োজিত ছাত্র-জনসভায় সদ্য কারামুক্ত শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু উপাধি প্রদান করা হলে কবি জসীম উদ্দীন তাঁর বিখ্যাত ‘বঙ্গবন্ধু’ কবিতাটি রচনা করেন। সম্ভবত সেটিই ছিল শেখ মুজিবকে নিয়ে লেখা দ্বিতীয় কবিতা। দেশের গ্রামাঞ্চলের লোককবিদের মধ্যে তখন শেখ মুজিবকে নিয়ে কে কী লিখেছিলেন, তা আমার সঠিক জানা নেই।

আমার কবিতাটি তাঁর কাছে পৌঁছেছিল এবং তিনি কারাগারে বসে ওই কবিতাটি পাঠ করে খুব খুশি হয়েছিলেন বলে তখনকার কারাবন্দি ছাত্রনেতা আবদুল লতিফ সিদ্দিকী এবং মার্ক্সবাদী সাহিত্যিক শ্রীরণেশ দাশগুপ্তর কাছে শুনেছি।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচন ও গোলটেবিলের চাপে হয়তো আমার কথা তিনি ভুলে গিয়েছিলেন।

‘হুলিয়া’ নিয়ে লেখা আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর কলামটি পড়ার পর আমার কথা তাঁর নতুন করে মনে পড়ে। তিনি আমার সঙ্গে হুলিয়া কবিতা নিয়ে আলাপ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। (তথ্য : আবিদুর রহমান, সম্পাদক, দ্য পিপল পত্রিকা এবং আমার কণ্ঠস্বর, পৃ. ২২৮।)

আমি তখন দ্য পিপল পত্রিকায় সাব-এডিটর পদে কর্মরত ছিলাম। আমার মনে হয়, গাফ্ফার চৌধুরীর ‘তৃতীয় মত’ পড়ার পর বঙ্গবন্ধু আমার কবিতায় তাঁকে নিয়ে উচ্চারিত সংশয় সম্পর্কে আমার ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছিলেন। স্মরণীয়—ওই দীর্ঘ কবিতার একটি চরণ ছিল—

‘শেখ মুজিব কি ভুল করছেন?’ এই সংশয়যুক্ত প্রশ্নটির ওপরই জোর দিয়েছিলেন গাফ্ফার চৌধুরী।

তিনি তাঁর লেখাটি শেষ করেছিলেন এভাবে—‘এ যেন বাংলার ক্ষুব্ধ তারুণ্যের স্বগতোক্তি। এই জবাবের চাইতে বড় সত্য এই মুহূর্তে জনচেতনায় আর কিছু নেই।’

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের সন্ধ্যায় আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে তাঁর বত্রিশ নম্বর ধানমণ্ডির বাড়িতে যাই। কিন্তু তখন বড় বেশি দেরি হয়ে গিয়েছিল। তিনি সেদিন কারো সঙ্গেই দেখা করেননি। প্রেসকেও মিট করেননি। আওয়ামী লীগের নেতাদের নিয়ে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন। আসন্ন যুদ্ধের মুখে দাঁড়িয়ে নেতাদের পালনীয় সম্পর্কে নির্দেশ দিয়েছেন।

শেখ হাসিনা তখন চলমান জনস্রোতের দিকে তাকিয়ে ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ি। ভিড়ের মধ্যেও তিনি আমাকে চিনতে পারেন এবং আমাকে বাড়ির ভেতরে যাওয়ার জন্য ডাকেন; কিন্তু আমন্ত্রণটিকে নিতান্ত সৌজন্যমূলক মনে করেই আমি আর বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করিনি। শেখ হাসিনাকে তখন আমি বঙ্গবন্ধুর আদুরে কন্যা হিসেবেই জানতাম। রাজনীতিবিদ হিসেবে নয়। বাকিটা ইতিহাস।

আজ থেকে ৫০ বছর আগে, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ মুক্তিকামী তৃতীয় বিশ্বের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (পূর্ব প্রচলিত নাম রেসকোর্স ময়দান) ১০ লক্ষাধিক মানুষের এক বিশাল জনগণসমুদ্রে দাঁড়িয়ে যে ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেছিলেন, আমার সৌভাগ্য হয়েছিল জনসভামঞ্চের খুব কাছ থেকে, সাংবাদিকদের জন্য সংরক্ষিত বেঞ্চে বসে সেই কালজয়ী ভাষণ শোনার। আমি তখন শিল্পপতি ও গীতিকার আবিদুর রহমান সম্পাদিত ইংরেজি দৈনিক দ্য পিপল পত্রিকায় কাজ করি। আমি কবি বলেই তিনি তাঁর পত্রিকায় আমাকে সাব-এডিটরের কাজ দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর অনুসারী ও স্নেহভাজন। পিপল পত্রিকা ভবন থেকে তখন একটি বাংলা সাপ্তাহিক কাগজ বেরিয়েছিল, নাম ‘গণবাংলা’। ‘গণবাংলা’র নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন সাংবাদিক ও ভাসানী ন্যাপের অন্যতম নেতা আনোয়ার জাহিদ। আমি দ্য পিপলের পাশাপাশি গণবাংলায়ও তখন লিখি। ৭ই মার্চ সিদ্ধান্ত নিলাম, আনোয়ার জাহিদ ভাইয়ের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে আমিও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যাব। ওই ভাষণটিই যে বিশ্ব-ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে মানবজাতির অনন্য দলিলরূপে গণ্য হবে, তা কে জানত?

তবে বঙ্গবন্ধু যে ওই দিন একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেবেন, তা মানুষের মুখে মুখে এবং ঢাকার আকাশে-বাতাসেও ধ্বনিত হচ্ছিল। আমাদের পত্রিকার মালিক-সম্পাদক আবিদুর রহমান সাহেব আগেই স্থির করে রেখেছিলেন, ওই ভাষণের পরপরই ভাষণের সারবস্তু নিয়ে ‘গণবাংলা’ একটি টেলিগ্রাম প্রকাশ করবে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার পর আমিও ওই টেলিগ্রামে কিছু একটা লিখব। এইমতো স্থির করেই আমরা তিল-ঠাঁই-নাই মাঠে গিয়ে উপস্থিত হই। রেসকোর্সের বিশাল ময়দানটি তখন কানায় কানায় পূর্ণ।

এত বড় একটি জনসভায় ভাষণ দেওয়ার পূর্ব অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল না। শুধু তাঁর কথাই বলি কেন? এত বড় জনসভায় ভাষণ দেওয়ার ভাগ্য বিশ্বের কোনো নেতার হয়েছে কি? আমি ভেবে পাচ্ছিলাম না, তিনি কী বলে সম্বোধন করবেন এই বিশাল জনতাকে। তিনি জনসমুদ্রের ওপর চকিতে তাঁর চোখ বুলিয়ে নিলেন। তারপর দুই হাত তুলে নমিত ভঙ্গিতে জনসমুদ্রকে শান্ত হওয়ার ইঙ্গিত করলেন। মুহূর্তে থেমে গেল সমুদ্রগর্জন। রোস্ট্রামের সামনে সাজানো মাইক্রোফোনগুলোর দিকে সামান্য ঝুঁকে তিনি শুরু করলেন তাঁর সেই ঐতিহাসিক কালজয়ী ভাষণ।

বললেন, ‘ভায়েরা আমার...’

আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো বঙ্গবন্ধুর উদাত্ত কণ্ঠের বজ্র ভাষণ শুনলাম। আমার আশপাশের রিপোর্টাররা তাঁর কথা কাগজে টুকে নিচ্ছিলেন। আমারও উচিত ছিল তাই করা। কিন্তু আমি বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে শুনতে কোথায় যেন হারিয়ে যাই। একসময় তাঁর ভাষণ শেষ হয়। লাখো মানুষের ‘জয়য়য়য়য় বাংলা’ ‘জয়য়য়য়য় বঙ্গবন্ধু’ ধ্বনি শ্রবণ করতে করতে তিনি মঞ্চ ত্যাগ করে উদ্যানের মাটিতে পা রাখেন।

আমরা গণবাংলার টেলিগ্রাম প্রকাশের লক্ষ্য সামনে নিয়ে দ্রুত সভাস্থল ত্যাগ করে পিপল অফিসে ফিরে যাই। অফিসে ফিরেই জাহিদ ভাই বললেন, যান, দ্রুত একটা রিপোর্ট লিখে ফেলুন।

কাগজ-কলম নিয়ে আমিও লিখতে বসি। কিন্তু কিছুতেই স্মরণ করতে পারি না বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে আসলে কী বলেছেন। শুধু একটি বাক্যই ঘুরে ঘুরে আমার মনে পড়তে থাকে। পিন আটকে যাওয়া ভাঙা রেকর্ডের মতো ওই বাক্যটিই আমার মনের মধ্যে ধ্বনিত হতে থাকে—

‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম

এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয়য়য়য় বাংলা।’

আমি ওই বাক্যটি দিয়েই একটি খবরের শিরোনাম তৈরি করি এবং জনসভার একটি ছোট্ট বর্ণনা লিখি।

জাহিদ ভাই আমার রিপোর্ট পড়ে হাসেন। বলেন, রিপোর্টিং কি এতই সোজা? বঙ্গবন্ধু যে চার দফা শর্ত দিয়েছেন, তা বুঝতে পারেননি? আমি মাথা নেড়ে স্বীকার করি, বলি, না। তিনি তখন হো হো করে হাসেন। বলেন, যান আপনার কবিতা নিয়ে আসেন। রিপোর্ট আপনাকে লিখতে হবে না।

অগত্যা আর কী করি। আমি একটি কবিতা লিখে গণবাংলার টেলিগ্রামে প্রকাশের জন্য জাহিদ ভাইকে দিই। রিপোর্টের বদলে গণবাংলার টেলিগ্রাম সংখ্যায় আমার ওই কবিতাটি ছাপা হয়।

(২৫শে মার্চের রাতে দ্য পিপল পত্রিকার কার্যালয়টি গানপাউডার দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। পাঁচজন শ্রমিক-কর্মচারী জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা যান। পত্রিকা অফিসটি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়। ফলে আমার ৭ই মার্চকে নিয়ে ৭ মার্চে লেখা ওই কবিতাটি চিরদিনের মতো হারিয়ে যায়।)

১০ বছর পর, ওই হারানো কবিতাটি যে একটি নতুন কবিতা হয়ে আমার মগজ থেকে মুক্তিলাভ করবে, আমি তা কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার বিষয়টিকে নিয়ে জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপি যখন ইতিহাস বিকৃত করার পথে পা রাখে—তখন ১৯৮০ সালের কোনো একদিন ইতিহাস বিকৃতির প্রতিবাদে, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ৭ই মার্চের ভাষণটিকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আমি একটি কবিতা রচনা করি। রচনান্তে কবিতাটির নাম রাখি— ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’।

এখন, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের পাশে যখন আমার এ কবিতাটিকে ক্রমে স্থান করে নিতে দেখি, তখন আমার খুবই আনন্দ হয়। আমি যখন ওই কবিতাটি লিখেছিলাম তখন আমার ধারণা ছিল, ইতিহাস বিকৃতির উত্তাল তরঙ্গে বাংলাদেশ থেকে একদিন হয়তো বা ওই ভাষণটি হারিয়ে যাবে। তখনো টিকে থাকবে আমার এ কবিতাটি। আর এ কবিতাটিই বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠোচ্চারিত বাংলাদেশের স্বাধীনতার অমর কাব্যবাণীকে বহন করে নিয়ে যাবে ভবিষ্যতের বাঙালির কাছে। যুগ থেকে যুগান্তরে। কাল থেকে কালান্তরে। তার যে প্রয়োজন হয়নি, সে আমাদের সবারই সৌভাগ্য। কবিতাটির রচনা তারিখ লিখে রাখা হয়নি। তবে মনে পড়ে, এ কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল সাপ্তাহিক সচিত্র সন্ধানী পত্রিকায় ১৯৮০ সালের স্বাধীনতা দিবস বা বিজয় দিবস বিশেষ সংখ্যায়।

মন্তব্য