kalerkantho

বুধবার । ১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ এপ্রিল ২০২১। ১ রমজান ১৪৪২

কেমন আছেন কবি হেলাল হাফিজ

মাহমুদ শাওন

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কেমন আছেন কবি হেলাল হাফিজ

ভালো নেই কবি হেলাল হাফিজ। মনের বয়স না বাড়লেও কবির শারীরিক বয়স বেড়েছে। বেড়েছে অসুস্থতাও। মাঝেমধ্যে কোনো কারণ ছাড়াই ফোন দিই কবি হেলাল হাফিজকে। ২০১২ সালে কালের কণ্ঠের শিলালিপির জন্য হেলাল ভাইয়ের একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। খুব আলোচিত হয়েছিল। এর পর থেকে তাঁর সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক। গত ২২ ফেব্রুয়ারি তাঁকে ফোন দিয়েছিলাম। খুব বেশি কথা হলো না। শরীরের খোঁজ নিতেই জানালেন, ‘চোখের অসুখ তো আছেই,  ডায়াবেটিস, প্রেসারটাও বেশ ভোগাচ্ছে।’

২০২০ সাল পৃথিবীর জন্য এক অতিমারির বছর। করোনা মহামারি বদলে দিয়েছে অনেক কিছুই। চির বোহেমিয়ান কবিকেও ঘরবন্দি করেছে করোনা। একটা সময় ছিল, যখন জাতীয় প্রেস ক্লাবেই ছিল কবি হেলাল হাফিজের পৃথিবী। সেটাই ছিল কবির সার্বক্ষণিক ঠিকানা। ঘরহীন, সংসারহীন মানুষটির ডেরা ছিল রাজধানীর একটি আবাসিক হোটেল। বছরজুড়ে সেখানেই থাকতেন কবি। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়েই উঠেছেন ইস্কাটনে বড় ভাইয়ের বাসায়। গত বছরের মার্চ মাস থেকে এখন পর্যন্ত সেখানেই আছেন হেলাল ভাই। কথা প্রসঙ্গে তিনি আগে একবার আমাকে বলেছিলেন, ‘কখনোই কারো বোঝা হতে চাই না।’ সেই মানুষটি ১১ মাস ধরে বড় ভাইয়ের বাসায় অবস্থান করছেন! কিছুটা বিস্ময়কর। কবির কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে বলেন, ‘একদিকে করোনা পরিস্থিতি, অন্যদিকে আমার শারীরিক অবস্থা দেখে তারা কিছুতেই আমাকে ছাড়তে চান না।’ পরিবার বলতে যা বোঝায়, সেই মমতা ও বাঁধনে তিনি বাঁধা পড়েছেন বলে জানান কবি হেলাল হাফিজ।

নতুন কিছু কি লিখতে পারছেন? আমার এমন প্রশ্নে কবি বলেন, ‘না। লেখার মতো অবস্থায় নেই।’ কবির প্রথম বই ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ প্রকাশের পর এর পাঠকপ্রিয়তা একটি ইতিহাস। পাঠকপ্রিয়তার দিক থেকে বাংলা ভাষায় এর ধারেকাছেও কোনো কবিতার বই নেই। ৫৬টি কবিতা নিয়ে ১৯৮৬ সালে প্রকাশ পায় ‘যে জলে আগুন জ্বলে’। এরপর ৩৫ বছর ধরে ক্রমাগত মুদ্রণ চলছে এর। এই একটি বই কবি হেলাল হাফিজকে যতটা দিয়েছে, কেড়েও নিয়েছে অনেকটা। কারণ বইটির জনপ্রিয়তা দেখে ২৫ বছর তিনি নিজের আর কোনো কবিতার বই প্রকাশ করার সাহস করেননি! কেন? এই প্রশ্নের উত্তরও আমাকে দিয়েছিলেন কবি এভাবে, “এই তুমুল জনপ্রিয়তা আমার মধ্যে এক ধরনের ভীতি তৈরি করেছে। আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছি। এরপরে আমি আর কী লিখব? আমি যে নতুন করে লিখব, আমার লেখা যদি মানুষ পছন্দ না করে! আমার কবিতা যদি ‘যে জলে আগুন জ্বলে’র কবিতার কাছাকাছি না যেতে পারে! আমার কবিতা যদি মানুষ না পড়তে চায়। এই এক অদ্ভুত আতঙ্ক আমার মধ্যে তৈরি হলো এবং দিনে দিনে নিজেকে গুটিয়ে নিলাম। বহু চেষ্টা করেছি এই ভীতি কাটিয়ে ওঠার জন্য। কোনো লেখকেরই সব লেখা সমান হয় না। তা যত বড় লেখকই হন। কবি তো বটেই, কোনো লেখাই উপন্যাস বলো, ছোটগল্প বলো, প্রবন্ধ বলো —এক লেখকের সব লেখাই তো এক মানের হয় না। কোনো লেখা একটু বেশি ভালো হয়, একটা মধ্যম মানের হয়। কিন্তু এই ভীতি আমার কাটল না। বরং যত দিন যেতে লাগল, ততই আমার বইটির জনপ্রিয়তা চলল বেড়ে।” আড়াই দশক লেগেছে কবির এই ভীতি কাটতে। পরে ‘যে জলে আগুন জ্বলে’র ৫৬টি কবিতার সঙ্গে আরো ১৫টি নতুন কবিতা নিয়ে ২০১২ সালে প্রকাশ পায় ‘কবিতা ৭১’ নামের একটি বই। আর সবশেষ ২০১৯ সালে প্রকাশিত হয়েছে ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’ কাব্যগ্রন্থটি।

১৯৪৮ সালের অক্টোবরে জন্মগ্রহণ করেন কবি হেলাল হাফিজ। নেত্রকোনায় তাঁর জন্ম। মাত্র তিন বছর বয়সে মাকে হারান। মাতৃহীনতার বেদনা বুকে নিয়েই তিনি কবি হয়েছেন। বড় বিচিত্র জীবন তিনি কাটিয়েছেন। বিচিত্র সব পেশায় নিজেকে জড়িয়েছেন। সেসবই একেকটি গল্প। তিনি আমাদের কিংবদন্তি। এখন ৭৩ বছরের চির তরুণ কবি হেলাল হাফিজ।  মানুষের মুখে মুখে ফেরা অসংখ্য পঙিক্তর জনক কবি হেলাল হাফিজ। দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুন হেলাল ভাই। মানুষের মাঝে আরো অনেক দিন বাঁচতে হবে। আরো অসংখ্য প্রেমিক, প্রতিবাদী যুবক আর নিযুত জীবন আপনার কবিতা পড়ে ঋদ্ধ হবে। আপনার কবিতার ভাষায় আশ্রয় পেয়ে ধন্য হবে প্রেম, প্রকৃতি ও প্রতিবাদ।

মন্তব্য