kalerkantho

শুক্রবার । ৩ বৈশাখ ১৪২৮। ১৬ এপ্রিল ২০২১। ৩ রমজান ১৪৪২

একুশের কবিতা

মোস্তফা তারিকুল আহসান

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



একুশের কবিতা

সাত দশক পরে বাংলাদেশের কবিতায় ভাষা আন্দোলন বা একুশের প্রভাব কতটুকু বা সেই প্রভাব কতটুকু কবিতায় নান্দনিক হয়ে উঠেছে, সেটা ভাবার সময় এসেছে। বায়ান্ন সালে মাতৃভাষা রক্ষা করার জন্য বাঙালি যে নজিরবিহীন আন্দোলন করেছিল তার সঙ্গে আবেগই শুধু যুক্ত ছিল না, বরং বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের অন্যতম একটি পর্যায় আমরা অতিক্রম করতে পেরেছিলাম এর মাধ্যমে। ভাষা আন্দোলনে বাংলাদেশের সব প্রান্তের মানুষ সংযুক্ত হয়েছিল, ইতিহাস লেখকরা সে রকম তথ্য আমাদের দিয়েছেন। যদিও ভাষাভিত্তিক এই জাতীয় সত্তা অর্জনকে আমরা ধরে রাখতে পারিনি সব সময়; নানা প্রতিবন্ধকতা ও রাষ্ট্রীয় আগ্রাসন ও অনিয়ম যুক্ত হয়ে আমাদের মূল চেতনাকে বিপর্যস্ত করেছে কখনো। কখনো আমরা আবার জেগে উঠতে চেষ্টা করেছি নতুন স্বপ্ন নিয়ে, নতুন আকাঙ্ক্ষার স্বপ্ন নিয়ে। আমাদের সাহিত্যে ভাষা আন্দোলন ও এর সমসাময়িক রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ অন্যতম প্রেরণার উৎস হয়েছিল বরাবর। আমাদের সাহিত্য মূলত আমাদের প্রবহমান সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনাচরণের নির্যাস নিয়ে রচিত হয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয় আমাদের পরিশীলিত মনন ও সৃজনশীলতার ঐতিহ্য। আর এ কারণে আমাদের গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটক বা মননশীল সাহিত্য আমাদের গড় মনন ও সত্তা গঠন করতে সহায়তা করেছে। প্রতিক্রিয়াশীল স্রোতোধারা বা বিপরীতধর্মী রাষ্ট্রীয় শাসনের কারণে আমরা যে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছি সেটাও আমরা কাটিয়ে উঠেছি; সম্পূর্ণভাবে না হলেও বেশ সফল আমরা হয়েছি বলা যায়। তবে বাঙালির চিরায়ত বোধ, বিশ্বাস, সংস্কার ও বুদ্ধিমত্তার সমবায়ে গড়ে ওঠা শক্তির জন্য আমরা টিকে আছি বলা যায়।

বাঙালি জাতিসত্তা ও বাংলা ভাষার বিপক্ষে যারা সরাসারি অংশগ্রহণ করেছিল বা সরকারি সহায়তা পেয়েছিল তারা (প্রতিক্রিয়াশীল চেতনায় পুষ্ট লেখকরা) উল্লেখযোগ্য কিছু সৃষ্টি করতে পারেনি; সেটা আমাদের জন্য সৌভাগ্যের বটে। তবু মূল স্রোতোধারায় ভেসে আমরা যে সাহিত্য, বিশেষ করে কবিতা রচনা করেছি তার গৌরব কতটুকু? তার মধ্যে ধ্রুপদি ভঙ্গির সাহিত্য আমরা কেমন পেয়েছি? কত ভাগ সাহিত্য নান্দনিক পরিচর্যায় সিক্ত? কবিতার বিস্তৃত ভুবনে একুশের অবস্থান কতটুকু? আমরা বাংলা ভাষার মৌলিক সুষমা, কাঠামো, বাক্য বা শব্দবোধকে অন্বিত করে কতটুকু আমাদের কবিতায় গ্রথিত করতে পেরেছি, যেখানে একুশের চেতনার অর্থ হলো ভাষার শক্তি সম্ভাবনাকে গভীর অর্থে জীবনের জন্য বিবেচনায় নেওয়া। বাংলাদেশের কবিতায় বিশেষভাবে বর্তমান প্রজন্ম ভাষার সংগ্রামময় ইতিহাস কিভাবে গ্রহণ করছে সেটা সাহিত্যবিবেচনার সূত্র হতে পারে এই কারণে যে আমরা আমাদের শিকড়কে ভুলে যেতে পারি না। তবু লক্ষ করা যায় যে একুশের চেতনায় দীপ্ত হয়ে কবিতার চরণ লেখা হচ্ছে না, বরং আমাদের ভাষাকে যথেচ্ছা, অশুদ্ধ ব্যবহার করে আমরা নতুনত্বের দাবি করছি। এটা যে ভুল এবং একটি জাতির জন্য ক্ষতিকারক, সেটা আমরা অচিরেই বুঝতে পারব। ভাষা আন্দোলন বা একুশের চেতনাকে ধারণ করার অর্থ শুধু এই নয় যে শুধু এই বিষয় নিয়ে কবিতা লিখতে হবে; বরং একুশের শক্তি হলো শুদ্ধ সাবলীল মৌলিকভাবে বাংলা ভাষাকে ব্যঞ্জনাসমৃদ্ধ করে তোলা, লেখাকে মৌলিক, স্বাধীন ও জাতীয় করে তোলা।

একুশের সংকলন থেকে শুরু করে কবি সুফিয়া কামাল, মাহবুবুল আলম চৌধুরী, শামসুর রাহমান, আহমদ রফিক, আলাউদ্দীন আল আজাদ, হাসান হাফিজুর রহমান, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, সৈয়দ শামসুল হক, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, আল মাহমুদ, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, ওমর আলী, শহীদ কাদরী, আবদুল মান্নান সৈয়দ, মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, মুহম্মদ নূরুল হুদা   প্রমুখ প্রবীণ কবি একুশের তাৎপর্য নিয়ে, ভাষার সঙ্গে আমাদের আত্মিক-মানবিক-সাংস্কৃতিক সম্পর্ক নিয়ে কবিতা লিখেছেন। দীর্ঘ একটি তালিকা আমাদের সঞ্চয়ে রয়েছে, যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রচুর লেখা হয়েছে। প্রতিবার একুশ এলে আমরা অজস্র কবিতা প্রকাশিত হতে দেখি সাময়িকীতে, একুশে বইমেলায় হাজারের অধিক কবিতার বই প্রকাশিত হতে দেখি। এ সবই যে একুশের ফসল, সেটা সবাই জানেন ও মানেন। বাংলা ভাষার এই বিজয় না হলে এবং তারই আলোকে জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বাঙালি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে না পড়লে আমাদের সাহিত্য, আমাদের কবিতা কোন পথে যেত তা অনুমান করা যায় না। এই মহা অর্জনকে আমরা কিভাবে গ্রহণ করেছি বা এর তাৎপর্যকে আমাদের অধীরতার সঙ্গে কিভাবে যুক্ত করতে পেরেছি তা লক্ষ করার বিষয়। আমরা কবিতা বা অন্য শাখায় একটা মহাদীপ্ত আহ্বানের জন্য অপেক্ষায় ছিলাম; একুশ আমাদের ভেতরে সাড়া ফেলেছিল, আমাদের রুদ্ধ চেতনায় নতুন প্রভাত উঁকি দিয়েছিল, আমরা বিহ্বল ও আপ্লুত হয়েছিলাম। নতুন এক চেতনার মাধ্যমে আমাদের নিজেদের জানার সুযোগ হয়েছিল : এক ভাষিক শক্তি, যা মাতৃভাষার গর্ভ থেকে উৎসারিত তা আমাদের চেতনাকে প্রগলভ করে তুলেছিল। ফরাসি বিপ্লবের চেয়ে আমাদের প্রেরণা অধিক ছিল বলে আমাদের মনে হয়। এই চেতনার বীজ যেভাবে বাহিত হলো সাহিত্য বা শিল্পের মাধ্যমে, তার সবটা হয়তো মানের দিক দিয়ে উত্তীর্ণ নয়। প্রাথমিকভাবে উত্তেজনাকে প্রশমিত করার সুযোগ সব সময় থাকে না। আমাদের কবিদেরও ছিল না। মাহবুবুল আলম চৌধুরীর সেই সাড়া-জাগানো কবিতায়ও আবেগের বাড়াবাড়ি রয়েছে। কারণ কবিকে তাঁর নান্দনিক পথের রেখা মেনে চলতে হয়, স্লোগান বা বিবৃতি আমাদের জাগিয়ে তুলতে পারে, তবে কবিতার কাজ অন্যভাবে জাগানো। কবিতার নান্দনিক দ্যোতনা কবিরা সব সময় ধরে রাখতে না পারলেও অনেক কবির ক্ষেত্রে আমরা উত্তীর্ণ চরণ পেয়েছি। আমরা একুশের কবিতার জন্য আমাদের প্রধান ও প্রবীণ কবিদের কাছে ঋণী। পঞ্চাশ দশক থেকে ষাট এবং সত্তর দশকে এ দেশে একুশ নিয়ে বেশ মানসম্পন্ন কবিতা লেখা হয়েছে। ব্যতিক্রমকে বাদ দিয়েই এই ধারণার পক্ষে দাঁড়াতে হবে। এরপর আমরা কবিতায় ঋদ্ধ ধারা দেখতে পেলেও একুশের কবিতা অনুপস্থিত বলা যায়। এর নেপথ্যে কারণ যে নেই তা নয়। প্রথমত, অভিজ্ঞতাহীনতা ও দ্বিতীয়ত, এই বিষয়ে কবিতা না লেখার অভিপ্রায়। একুশে ফেব্রুয়ারি যেসব ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হয় সেখানেও একুশে ফেব্রুয়ারি বা ভাষা আন্দোলন বিষয়ে কবিতা খুঁজে পাওয়া যায় না। আশি-নব্বই বা পরে কবিরা এ বিষয়ে কবিতা বা গান লিখছেন না বললেই চলে। হতে পারে আমরা গর্বিত এমনকি একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর গভীরভাবে আলোড়িত হলেও আমরা এ বিষয়ে নতুন কবিতা পাইনি। এর একটা কারণ হতে পারে যে বিষয়টি নতুন কবিদের আর তাড়িত করে না বা উদ্দেশ্যমূলকতা কবিতার জন্য ক্ষতিকর জেনে তারা তা নিয়ে আর কবিতা লিখছেন না বা এমনও হতে পারে যে আগে রচিত কবিতাগুলোর চেয়ে ভালো বা তার সমতুল্য কবিতা তারা লিখতে পারছেন না। আবার এটা ভেবে আমরা সন্তুষ্ট হতে পারি যে সব লেখাই আসলে ভাষা আন্দোলনের ফসল, যা আগেই উল্লিখিত হয়েছে।

একটি জাতির সাহিত্য তার জাতীয় জীবনের প্রধান অনুষঙ্গের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে, যা তাকে অনুপ্রেরণা জোগায় ফল্গুধারার মতো। অনিঃশেষ সে চেতনা। তাকে আমরা বিস্তার করে দিতে থাকি সব স্রোতোধারার সঙ্গে বিশেষত শিল্প বা সাহিত্যে। বাঙালির জন্য আত্মশ্লাঘার একুশের সংগ্রাম; এমন একটি জাতীয় ঘটনা, যা আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন থেকে চিন্ময় অনুভূতিতে মিশে আছে। এই অনুভূতি যুগপত্ভাবে ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক। আমরা হয়তো মহাকাব্যের মতো এক আখ্যান রচনা করতে পারতাম এজাতীয় সংগ্রামের গল্প থেকে। আমরা আবেগকে ইতিহাস আর জাতীয় জীবনের তাৎপর্যের সঙ্গে মিলিয়ে একে আরো সংহতরূপে নির্মাণ করতে পারতাম; সে সুযোগ আমাদের ছিল। আমাদের উপন্যাস, গল্প, নাটকেও ভাষাসংগ্রামের সংযুক্তি রয়েছে। বিষয়টি শুধু আবেগের নয়, জাতীয় চেতনার, সাংস্কৃতিক ঐক্যের এবং সামগ্রিক জীবনাচরণের সঙ্গে সংযুক্ত। সেখানে কবিতাকে ব্যক্তিগত অনুষঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করা শক্ত কাজ বলে মনে হয়। তবু আমরা বেশ মানসম্পন্ন অনেক কবিতা পেয়েছি। নতুন প্রজন্মের কাছেও বার্তা রয়েছে, তবে তাঁরা চেতনার সঙ্গে বিষয়টি যুক্ত করতে চান না বোধ হয়। এটাও ঠিক যে একুশের চেতনা এত তাড়াতাড়ি ম্লান হতে পারে না, বরং বহুকাল পরেও তা দ্যুতিমান থাকে। জাতির ইতিহাস, গৌরবগাথা আমাদের মিথের মতো প্রেরণা দেয়। একুশও আমাদের সেই প্রেরণা দিতে থাকবে, যদি তাকে আমরা সঠিক তাৎপর্যসহ উপলব্ধি করতে পারি।

মন্তব্য