kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ কার্তিক ১৪২৭। ২৭ অক্টোবর ২০২০। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

ঝুপড়িওয়ালির ডাক

গৌতম রায়

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



ঝুপড়িওয়ালির ডাক

অঙ্কন : মাসুম

চটকলের বন্ধ হয়ে যাওয়া গেটটা পাশ কাটিয়ে যাওয়া মানে শ্মশানকেও পাশ কাটিয়ে যাওয়া। মৃত্যুভয়কে এড়িয়ে যাওয়া। গুডস ট্রেনের লাইনটা টপকাতে গিয়ে তেমনটাই মনে করেছিল রামশরণ। গুডস ট্রেনের এই লাইন এখন বাসরাস্তার পিচে হারিয়ে গেছে।

যখন চটকলের পেটের ভেতরে পাটের গুঁতায়, ভরা পোয়াতির মতো মালগাড়িগুলো ঢুকত সেই কালে, এই বাসরাস্তার ওপর রিকশা টানতে গেলেই রেললাইনের সেই সরলরেখার খাঁজে রিকশার চাকা পড়ত। রিকশাটার ককিয়ে ওঠা আর রামশরণদের খিস্তির তোড় চলত পাল্লা দিয়ে।

সেই গুডস ট্রেনের সিঙ্গল লাইনটা একুশের প্রজন্মের ছেলে ছোকরাদের কাছে অজানা তবু। রামশরণদের ভাষায়, ‘মিলকা সাইডিং ও কে বগল পর’ এখনো একটা চলতি লব্জই থেকে গেছে এই চটকলিয়া মফস্বলিতে। এই লব্জগুলো কোথা থেকে এসে, জায়গার স্থানমাহাত্ম্যে, একটা নতুন জোশ এনে দেয়, কে জানে! এটা নিয়ে ভাষাতাত্ত্বিকদের ভেতর গোল বাধলেও বাধতে পারে। তবে কেন মুখুজ্জেদের রাসমেলার মাঠটির ‘টিনাবাজার’ হয়ে ওঠাটাকে কেউই কখনো আটকাতে পারে না।

আসলে বাঙালিত্ব, ভাষা, ঐতিহ্য, পোশাক—এসব নিয়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সেমিনার কক্ষ যাঁরা মুখরিত করেন, তাঁরা জানেনই না বন্ধ হয়ে যাওয়া রাসমেলার পরিত্যক্ত মাঠটি কোন জাদুবলে বাঙালিত্বের সব। হাড়ের গরমকে অতিক্রম করে, অচিরেই দেহাতি, খোট্টাইয়াদের ‘টিনাবাজার’ হয়ে ওঠে।

জুটমিলের গুডস ট্রেন ঢোকার পেল্লায় দুটি লোহার দরজা ছিল। সেগুলোর বদলে এখন পেল্লায় পাঁচিল। পাঁচিলের আশপাশে একটি-দুটি ঝুপড়ি। বাইরের লোকরা ভাবে বানজারারা এসে ঘর বেঁধেছে। ভেতরের লোকরা খবর ঠিক রাখে। চুল্লুর অবাধ কারবারিরা, গোপাল ঠাকুরের শালুক ফুল চেনার মতো, সহজেই চিনে নেয় আদারবাদার থেকে জড়ো করা কাঠপাতা চিমকিতে তৈরি এই ধরনের ঝুপড়িকে।

না, এই ঝুপড়ি আজ রামশরণের গন্তব্য ছিল না। লকডাউনের বাজারে চুল্লুর জোগানদাররাও একদম হাত উপুড় করে নিয়েছে। চুল্লুর ঠেক জমার কোনো সম্ভাবনাই নেই এই আকালের বাজারে। শ্মশানের রাস্তা থেকে বাসরাস্তায় ওঠে রামশরণ। কাছের রেলস্টেশনটাই এখন তার গন্তব্য। গুডস ট্রেনের বুজিয়ে দেওয়া রেললাইন পেরোয় আনমনে। মালগাড়ি ঢোকার পেল্লাই গেটের ওপর ওঠা বাজখাঁই পাঁচিলকে পাশ কাটিয়ে চলে। এক পা, দুই পা এগোতেই একটা মিঠে মেয়েলি গলার আওয়াজ ভেসে আসে রামশরণের কানে; তমো কোনো টিকা যাউচি?

চটকলের একটা নিজস্ব চরিত্র থাকে। জাদুঘরে এই চটকল ব্যাপারটা ক্রমেই ঠাঁই করে নেওয়ার দিকে এগোলেও মহল্লায় বন্ধ চটকলের ফেঁসোর উড়ন্ত রোয়াগুলো কেমন যেন মিল চলার রমরমে দিনগুলোর একটা হালকা আভাস এখনো দিতেই থাকে। এই আভাসের একটা বড় বৈশিষ্ট্যই যেন রামশরণের কানকে একটু অন্ধকারে আলোর অধিক হাতছানি দেওয়ার চেষ্টা করল।

ভাষাবিদ হরিনাথ দে চটকলিয়া ঈমানদারির ভেতরে কয়েকটা মাস থাকলে যে নিজের বহুভাষার ওপর দখলটা প্রায় বিনা মেহনতে আত্মস্থ করে নিলেও নিতে পারতেন, তা এই রামশরণ বা রামশরণদের মতো চটকলের জলবাতাস পেটে খেয়ে, পিঠে সওয়ার মতো লোকগুলোকে দেখলেই বেশ সহজে বোঝা যায়।

এই চটকল শহরের মানুষ ভারতের প্রায় সব কটি ভাষারই একটা-আধটা শব্দ রপ্ত করে নেয় নিজের বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই। প্রতিটি ভারতীয় ভাষা, পেটের তাগিদে জড়ো হওয়া মানুষের দৌলতে কিভাবে বহুত্ববাদী হয়ে ওঠে নিজেদের কৌলীন্য ছেড়ে, এটা নিয়ে কখনো কোনো সমাজবিজ্ঞানী ভেবেচিন্তে সন্দর্ভ লেখার চেষ্টা করেছেন কি না, সেটা ভাবনার মতো স্তরে রামশরণ না থাকলেও মিঠে গলার আওয়াজে সে এইটুকু বুঝে নেয় যে কণ্ঠস্বরের উৎস কোনো মানবী। আর যা-ই হোক, তা-ই হোক, এই লকডাউন আর আকালের দিনে শ্মশান থেকে কোনো উৎকলবাসিনী প্রেতিনী এসে তাকে সোহাগ করে পথ দিয়ে কে যায় গো চলে বলবে না।

থিরথিরে আলোটা ভেসে আসছে খালটার পাশের ঝুপড়ি থেকে। আওরাতের গলাটা কি সেই দিক থেকেই এলো? একটু ঘাড় উজিয়ে দেখার চেষ্টা করে রামশরণ শব্দের উৎসটি। লকডাউনের নিস্তব্ধতায় খালের লকগেটে জলের দাবড়ানির বাইরে আর কিছু তার কানে ঢোকে না।

এই খাল বেয়ে ধলতিতার রাম মালোদের এপারের গঙ্গা আর ওপারের বুড়িগঙ্গাকে মিলিয়ে-মিশিয়ে দেওয়ার সমরেশগাথা জানার মতো সুযোগ রামশরণের হয়নি। রামশরণ, হানিফ, মার্কন্ড পাঁড়ে, রামনরেশ মাঝি, ভোলা মিঞাদের সেসব গাথার অশ্রুমালার হার গলায় কখনো দোলে না।

তবু যেন পাশের শ্মশান থেকেই শায়িত শবের ভেতর থেকে সমরেশ বসু কেমন যেন রামশরণদের ডাকতে থাকেন, ‘আয়, আয়।’ সেই ডাক ভাসে টিনাবাজার, কুলি ডিপো, লেবার লাইন হয়ে কেনা মুখুজ্জের বাড়ির সামনে, লেবার অফিসকা বগলওয়ালা ময়দান পর।

আলো, না নিশির ডাক—কাকে লক্ষ করে টিনাবাজারের দিকে এগিয়ে যায়, নিজেই ভালো করে বুঝে উঠতে পারে না রামশরণ। আসলে ছাপরা জেলার শ্রীপুর গাঁয়ের ইশারা তখন সে যেন শোনে। রহমতের আলখাল্লার মতো জামায় ভুসো কালিতে, শিশুকন্যার হাতের ছাপের মতোই সেই ডাকের উষ্ণতা জেগে ওঠে হঠাৎ রামশরণের বুকে।

রেলস্টেশনই এখন তার আস্তানা। জুটমিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে ‘ছাইড বিজেনেছ’ রিকশা চালিয়েই পেটের ভাত জোটাত রামশরণ। বউ ওর্ধু সাউয়ের ভাইপোর সঙ্গে চলে যাওয়ার পর, রামনরেশের বাড়ির ছাপরাঘরটা ছেড়ে দিয়ে রেলস্টেশনটাকেই স্থায়ী সাকিন বানিয়েছিল সে।

গত মাস তিনেকের লকডাউনের আগে থেকেই টোটো রিকশা এসে সাইকেল রিকশাকে খেয়ে ফেলেছে। তবু এই লকডাউনে টোটোওয়ালারা বেরোতেই পারে না পুলিশের জন্য। বেরোলেই টোটো ধরছে মামারা। ভেঙে দিচ্ছে গাড়ি। তাই টোটো পথে নামছেই না।

এতে রামশরণদের একটু হলেও কপাল খুলেছে। কপাল খুললেও পেট ভরছে না। একটাও হোটেল খোলা নেই। প্ল্যাটফর্মে পড়ে থাকা সিঙ্গল আদমিদের তো আর রান্নার পাট নেই। তাদের ঝুপড়ি হোটেলই ভরসা। পকেটে টাকা থাকলেও খাবার জোটাতে পারে না রামশরণ, রামশরণরা।

সব বন্ধ হলেও বন্ধ হয় না শ্মশান। স্তব্ধ হয় না গোরস্তান। শ্মশানে চা বেচে হারু পালের ছেলে বাপন। তার দোকানের পাশেই নিরালা বাবার দোকান। বন্ধ জুটমিলের শ্রমিক নিরালা। বামুন না কায়েত, নাকি ভুজার কিংবা দুসাদ—আদত খবর কেউ জানে না। গলায় পইতা পরে মিলের শিবমন্দিরে ঘোরাঘুরি করতে করতেই হয়ে গেছে নিরালা বাবা। সন্ধ্যাবেলায় ছোট পিতলের থালায় মেটে সিঁদুর আর দিয়া নিয়ে দোকানে দোকানে ‘আর্তি’ দেখিয়ে যখন সে ঘোরে, তখন কে বলবে চটকলের রমরমে বাজারে একদিন সমকামিতার জন্য এই লোকটাকেই পাবলিকের প্যাঁদানি খেতে হয়েছিল?

লকডাউনে দোকানপাট, বড়-মেজো-সেজো-ন-ছোট, কোনো রকমের হোটেল থেকে চুল্লুর ঠেক খোলা না থাকলেও শ্মশানে বাপনের বা নিরালা বাবার চায়ের দোকান বন্ধ হয় না। বাপনের বউ এই লকডাউনের বাজারে লুকিয়ে-চুপিয়ে ভাত, ডাল, চোখা রেঁধে বিক্রি করছে চড়া দামে।

চুল্লু বিক্রি করতে তোলা দিতে হতো পুলিশকে। এই লকডাউনের বাজারে বাপনদের চায়ের দোকানে, রাতে, বাড়ি থেকে রেঁধে আনা ভাত-ডাল বেচতেও পুলিশকে পয়সার বখরা দিতে হচ্ছে। তাই গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো ভাতের দামের সঙ্গে শ্মশানি জিএসটি বসিয়েই দাম হাঁকে বাপন। শ্মশানযাত্রীদের ভেতরে এখন বেশ ভালোই ব্যবসা করছে বলে বাপনের বউয়ের ঠমকটা একটু বেড়েছেই বৈকি!

সেই ঠমক দেখিয়েই যে বাপনের বউ জলের মতো ডাল আর যতটা না আলু, কুমড়া—তার থেকে বেশি সেগুলোর চোকলা মেশানো ‘তক্কারি’ খাইয়ে হরেদরে যে টাকা পনেরোর মতো বেশি নিয়ে নিল, তা বুঝেও না বোঝার মতো করেই ছিল রামশরণ। কারণ শুকনা পাউরুটি আর জল খেয়ে কত দিন সকাল-দুপুর-রাত্তির পেট ভরানো যায়?

‘শাল্লা, চাওয়ালা লোগোকে ভি বৈঠনে নেইখে দেওয়ত রেন্ডি কে বাচ্চালোক’—মনে মনে রাষ্ট্রের পবিত্র ধারক-বাহকদের উদ্দেশে যখন মধু বর্ষণ করছিল রামশরণ, তখনই সেই নারীকণ্ঠ লকডাউনি রাতের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে, বাতাসে সিগারেটের খোলে ভরা গাঁজার ধোঁয়ার মতোই ছড়িয়ে পড়ল।

এখন রামশরণের ভরা পেটে আদিম পিপাসার তাগিদ পুরে দিলেই সমরেশের ‘প্রাণ পিপাসা’ ঝাঁপার তাগিদটা আজকালকার পাঠক না-ও বুঝতে পারেন। সাহিত্য ঝেঁপে চলতেই পারে, চলে বলেই বামাল ব্যাঁড়য্যে এখন বিভূতি ব্যাঁড়জ্যে হওয়ার খোয়াব দেখে। কিন্তু জীবন কখনো ঝেঁপে চলে না। কুড়ি বছরের বিয়োগান্ত নাটকের শম্ভু মিত্তিরীয় মডুলেশনেও জীবন চলে না। কারণ বন্ধ চটকলের পিএফের টাকা কম্পানি আর ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের চক্করে ঝার হয়ে যাওয়া দেখা শ্রমিক রামশরণ, রিকশাওয়ালা রামশরণ হয়েও আজ জানে শরীরের খিদে মেটাতে গেলে মারণব্যাধিতে জীবন যেতে পারে।

বিজ্ঞান নিজেকে বেশ্যালয়ে কনডম সচেতনতায় আজও এক শ শতাংশ কায়েম করতে না পারলেও ‘করোনা’ মাল্টিন্যাশনালের তিন-চার লাখি মাস মাইনের এমডি থেকে মফস্বল শহরের লাল বাতির কণ্ঠার হাড় বেরোনো বেশ্যাকে পর্যন্ত ফিজিক্যাল ডিসট্যান্স আর সোশ্যাল ডিসট্যান্সের প্যারামাউন্টি শরবত খুব ভালোভাবেই খাইয়ে দিয়েছে।

তাই পকেটে পাত্তির গরম সত্ত্বেও নিশির ডাককে হেলায় অচ্ছেদা করার স্পর্ধা দেখিয়ে গঙ্গা আর বুড়িগঙ্গাকে জুড়ে দেওয়া খাল, যেটা এখন ‘বড়ামোহরি’ নামেই বেশি চালু, তার ওপরের পিচ রাস্তার দিকে রামশরণ পা ফেলতেই আবার ভেসে আসে উৎকল বুলি।

না। এ তো রেন্ডিওয়ালি মৌসিদের মতো লোলচে গলার দেমাকি ডাক নয়। এই ডাক যেন বিপন্নতায় বুজে আসা একজন মানুষের কান্নায় দলা পাকানো একরাশ আর্তনাদ। কাব্যিক অনুভূতি রামশরণের নেই। রামশরণদের কাব্যবোধ চটকলের উইভিং মেটিনের ধুরনিতে পোড়া মবিল দিয়ে চাক্কা জ্যাম না হওয়ার তাগিদে, সুকান্তের কবিতার ঝলসানো রুটির মতোই পূর্ণিমার চাঁদকে এনে দেয়।

তাই রেললাইন লাগোয়া পরিত্যক্ত রাসমেলার মাঠ থেকে উঠে আসা নারীকণ্ঠ, রামশরণকে যেন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগের রাতের কুন্তীর সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়।

আদিমতার তাগিদে যে রাতের পেট চিরে নারীকণ্ঠের নাদব্রহ্ম উচ্চারিত হয়নি, আমাদের মধ্যবিত্তকে তার বাখোয়াজিসুলভ বুঝনদারি দিয়ে তা বুঝতে না পারলেও মানুষের বিপন্নতার ভাষা বুঝতে অসুবিধা হয়নি রামশরণের। বড়ামোহরির আল গেঁথে, প্রহ্লাদ মাড়োয়ারির দখল করা জমির ওপর বাড়িটা এখন প্রায় খালের ওপরে ঝুলবারান্দার মতো ব্রিজ তৈরি করে দিয়েছেই বলা যায়।

সেই শান-বাঁধানো পথের ঢাল বেয়ে ঝোপঝাড়ে ছেয়ে যাওয়া টিনাবাজারের ভেতরের দিক থেকে আসা গলার আওয়াজকে আর টিমটিমে একটা আলোকে লক্ষ করে এগোতে থাকে রামশরণ। এ তো মাগ্গিগণ্ডার। বাজারেও সরকারি আলোকসঞ্চার থেকে হুকিং করে হোক কিংবা বস্তির মাতবরদের দিয়ে থুয়েই হোক, কোনো বস্তিই এখন প্রায় ইলেকট্রিক আলোর আওতার বাইরে নয়। তবে পরিত্যক্ত রাসমেলার মাঠে যেসব ঝুপড়ি আছে, বাসরাস্তার দিকের গুলোতে ইলেকট্রিসিটি থাকলেও রেললাইনের দিকের একটা-দুটাতে নেই। গরিব, গরিবতর, গরিবতম—এই সব নিয়ে বিদেশে বসে, দেশের খবরের কাগজে ভারতের দারিদ্র্য নিয়ে সন্দর্ভ লেখার জন্য এই টিনাবাজার যে আইডিয়াল ফিল্ডস্টাডির ক্ষেত্র হতে পারে, ‘পণ্ডিত’দের কাছে হয়তো সে খবরই পৌঁছেনি। পৌঁছলে হয়তো ফুড়নে খাটা ক্ষেত্র সমীক্ষকদের দৌলতে এই টিনাবাজারের গরিবস্য গরিবরা আমেরিকায় বসে ভারতের দারিদ্র্য নিয়ে গবেষণা করা লেখকদের দৌলতে খবরের কাগজের পাতায় ঠাঁই করে নিত।

বাসরাস্তা থেকে নেমে, প্রহ্লাদের খালপিয়ারি বাড়ির হাতার পাশ দিয়ে বেশ একটু গড়ান্তি ধরে একদা মাঠ, বর্তমান জঙ্গলে নেমে পড়ে রামশরণ। কেন মুখুজ্জের নাতিপুতিদের শরিকি বিবাদে কে কত বেশি ডিভিডেন্ড ঘরে তুলতে পারে তার হিসাব-নিকাশের জেরেই যে রাসমেলার মাঠের আগাছা জঙ্গলে পরিণত হয়েছে, এই খবর রামশরণের মতো মানুষের কানে পৌঁছার এলেম রাখে না। তাই আগাছা বাড়ে। আগাছা বাড়তে বাড়তে জঙ্গল হয়। আর সেই জঙ্গলের বুক চিরেই যেন মা বসুমতীর কণ্ঠের করুণ বেহাগ ভেসে ওঠে লকডাউনের রাতের সমস্ত নিস্তব্ধতাকে খান খান করে।

পথ চলতি পুরুষকে পথের পাশের নারী নিঝুম, নিরালা রাতে ডাকছে শুনলেই মধ্যবিত্ত পাঠকমন রগরগে কিছু শোনার জন্য একটু হলেও উখিয়ে থাকে। যৌনতার মাঝে শিল্প খোঁজার তাগিদে শহুরে বুদ্ধিজীবী হেঁশেলে মুখরোচক কিছু চাটের ফরমাশ করতে গিয়ে রান্নার বউয়ের বুকের কাপড়টা সরে যাওয়া দিকটার দিকেই যেন একটু বেশি নজর করছে বলে তার ধর্মপত্নীর মনে হয়।

আর ঠিক তখনই ঝুপড়ির গা ঘেঁষে, অন্ধকারে মিশে থাকা নারীটি রামশরণের হাতে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট গুঁজে দিয়ে কাতর আবেদন করে শ্মশানঘাটে বাপনের বউয়ের দোকান থেকে এক প্লেট ভাত-ডাল-সবজি এনে দিতে। মিডিল ক্লাস মেন্টালিটি কখনোই পারবে না বিনা জামিনে একটা অচেনা-অজানা লোকের হাতে একটা টাকাও তুলে দিতে। নিশীথিনীর ঘরে আর একটাও টাকা আছে কি না, যাতে সে পঞ্চাশটা টাকা একজন অপরিচিতের হাতে এই অন্ধকার, ভূতুড়ে রাতে তুলে দিতে পারে, সেটা বিচারের ভার না হয় পাঠকের ওপরেই ছেড়ে দেওয়া গেল। কারণ টাকাটা রামশরণের কাছে দেওয়ার সময় অন্ধকারে আলোর সুরে সেই মেয়েটি বলেছিল, একজনকেও সে রাত থেকে পায়নি, যাকে দিয়ে শ্মশানঘাটের দোকান থেকে খাবার আনাতে পারে।

মেয়ে হওয়ার সংস্কারে সে এই নিশুতি রাতে শ্মশানে মরদকে একা ফেলে যেতে চাইছে না। তার মরদের যে একটা নকলি পা, অর্থাৎ আমাদের শহুরে লব্জে আর্টিফিশিয়াল পা!

মন্তব্য