kalerkantho

শুক্রবার । ১৪ কার্তিক ১৪২৭। ৩০ অক্টোবর ২০২০। ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

ভীষণ বেদনার রক্তচোখ

সুদীপ্ত সালাম   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ভীষণ বেদনার রক্তচোখ

অঙ্কন : মাসুম

মোজাম্মেল হকের বয়স বাষট্টি। অবসরে যাওয়ার আগে চাকরি করেছেন গণপূর্তে। মালিবাগ বাজার রোডের এই পাঁচতলা ভবনের মালিক তিনি। দোতলার পুরো ইউনিটে থাকেন তিনি, তাঁর স্ত্রী আছিয়া হক ও গৃহপরিচারিকা জয়গুন। আর আছে শাহালম। বাড়ি পাহারা দেওয়া থেকে শুরু করে বাজার করা—সব ধরনের কাজ করে শাহালম। থাকে নিচতলার একটি ঘরে।

হক দম্পতির এক ছেলে এক মেয়ে। মেয়ে স্বামী-সন্তানদের নিয়ে থাকেন জার্মানির কোলনে। ছেলে ছোট। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছেন। এই দ্বিতীয় তলা ছাড়া বাকি ফ্ল্যাটগুলো ভাড়া দেওয়া।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ইউরোপে হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে। কানাডার অবস্থাও খারাপ। ছেলে-মেয়ে, জামাতা ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে প্রতিনিয়ত দুশ্চিন্তায় থাকেন মোজাম্মেল হক এবং তাঁর স্ত্রী। বাংলাদেশও ভালো নেই। চারদিকে থমথমে অবস্থা।   রাস্তাঘাটে মানুষ নেই, যানবাহন চলছে না, দোকানপাট বন্ধ।

মিসেস হক শয্যাশায়ী। ডায়াবেটিস, শ্বাসকষ্টসহ নানা অসুখে ভুগছেন তিনি। সারা দিন স্ত্রীকেই সময় দেন মোজাম্মেল সাহেব। খাওয়ানো, গোসল করানো, সময়মতো ওষুধ দেওয়া—এসব তিনিই করেন। জয়গুনও মাঝে মাঝে সাহায্য করে। তবে মিসেস হকের দেখভাল একা করতেই মোজাম্মেল সাহেব এক ধরনের তৃপ্তি পান।

তাঁর মনটা অস্থির হয়ে আছে। সারা রাত বিছানায় ছটফট করেছেন। ঘুম আসেনি। তারপর একসময় আজানের ধ্বনি ভেসে এলো। পানির মোটর ছাড়া হয়নি। শাহালম বোধ হয় মসজিদে গেছে। তাই চাবি নিয়ে নিজেই সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে গেলেন।

মোটর ছাড়ার পর মোজাম্মেল সাহেবের মনে হলো, নামাজ পড়তে গিয়ে শাহালম ভুলে গেট খোলা রেখে যায়নি তো? গ্যারেজের বাতিটা জ্বালালেন। তারপর গেটের কাছে গিয়ে দেখলেন, গেট বন্ধ। ফিরতে যাবেন এমন সময় তাঁর চোখ পড়ল দুটি জ্বলজ্বলে চোখের ওপর। মোজাম্মেল সাহেব ঘাবড়ে গেলেন, আতঙ্কে ‘আল্লাহ!’ শব্দ উচ্চারণ করে তিনি কয়েক হাত দূরে ছিটকে পড়লেন। প্রায় চিৎকার করলেন, ‘কে! কে ওখানে!’ কয়েক হাত দূর থেকেও ওই জ্বলজ্বলে চোখ দুটি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন। ইস্পাতের অ্যাঙ্গল পরপর জোড়া দিয়ে তৈরি করা গেটের চিরল ফাঁক দিয়ে তাঁর দিকেই নিবদ্ধ লাল চোখ দুটি।

গেটের ওপাশ থেকে এক পুরুষের চাপা কণ্ঠস্বর ভেসে আসে—

‘স্যার, তিন দিন ধইরা না খাওয়া। কয়ডা ভাত দিবেন?

মোজাম্মেল সাহেব একটু অবাক হন, ‘ভোরবেলা ভিক্ষুক?’

—এত সকালে কেন?

—স্যার, সারা রাইত বাড়ি বাড়ি গেছি। কেউ গেট খোলে না।

মোজাম্মেল সাহেব এবার বুঝতে পারেন কেন এই লোকের চোখ লাল। তিনি শাহালমের ফেরার অপেক্ষা করবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন। লোকটিকে জিজ্ঞাসা করলেন, কী কাজ করো?

—স্যার, মালিবাগ বাজারে ভ্যানে কইরা সবজি বেচতাম। এখন বেচি না। বাজার বন্ধ। পুলিশও বইতে দেয় না। পনেরো-ষোলো দিন ধইরা এই অবস্থা।

    —থাকো কোথায়?

—স্যার, আমার পরিবার, এক মাইয়া, এক ছেলে নিয়ে থাকি মগবাজার বস্তিতে।

মোজাম্মেল সাহেব এবার লক্ষ করলেন, ইস্পাতের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আছে শিশুদের নরম নরম আঙুল। তার মানে লোকটি একা নয়।

—গ্রামের বাড়ি কোথায়?

—জাজিরা, শরীয়তপুর।

—বাড়ি চলে গেলে না কেন?

—স্যার কই যামু? ওইহানে ভিডাও নাই। সব নদীর পেডে।

শাহালম ফেরে। বাড়িতে ঢুকে ভেতর থেকে গেট বন্ধ করে দেয়। মোজাম্মেল হক শাহালমকে বললেন, ‘ওদের বাড়ির ভেতরে নিয়ে আয় তো শাহালম।’ শাহলাম দ্বিধায় পড়ে। সে একবার ভাবে, খালুকে বলে, ‘বাসায় ঢোকানোর কাম নাই।’ কী মনে করে যেন তার আর এ কথা বলা হয় না। সে গেট খুলে বাইরের মানুষগুলোকে ডাকে।

প্রথমে ঢোকে রক্তচোখা লোকটি, তার পরনে একটি বোতাম ছাড়া ময়লা পাঞ্জাবি আর লুঙ্গি। তার পিছু পিছু ঢুকল বাচ্চা দুটি। ছেলেটির বয়স পাঁচের মতো। গায়ে একটা ময়লা গেঞ্জি ও হাফ প্যান্ট। পা খালি। মেয়েটির বয়স আট হবে। পরনে একটি ময়লা ফ্রক। তার পায়েও জুতা নেই। দুই ভাই-বোনের গায়ের রং ধুলো-ময়লায় মলিন। অনিদ্রায় শিশু দুটির চোখও লাল হয়ে আছে। তারা তাদের বাবার আড়ালে দাঁড়িয়ে মোজাম্মেল সাহেবকে দেখছে। শেষে বাড়িতে ঢুকল লোকটির স্ত্রী। বউটিকে দেখে মোজাম্মেল সাহেব বুঝলেন, এটি একটি হিন্দু পরিবার। বউটির হাতে শাঁখা, মাথায় সিঁদুর। মুখ ঢাকতে মলিন শাড়ির আঁচলের কোনাটি দাঁত দিয়ে চেপে রেখেছে। এদের চোখে-মুখে শুধু ক্ষুধা নয়—অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভয়ের ছাপও স্পষ্ট।

মোজাম্মেল সাহেব পরম স্নেহে শিশু দুটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। তারপর শাহালমকে ‘ওদের ওপরে নিয়ে আয়’ বলে দোতলার দিকে উঠতে লাগলেন। শাহালম বাধ্য হয়েই পরিবারটিকে সঙ্গে নিয়ে মোজাম্মেল সাহেবকে অনুসরণ করল।

জয়গুন এসে বলল, ‘খালু, রান্না বসাই। তয় কী রান্না করুম?’ মোজাম্মেল সাহেব বললেন, ‘শাহালমকে দিয়ে স্টোররুম থেকে বড় পাতিলগুলো বের করা। আর বাড়িতে যা আছে তাই রান্না কর। সবচেয়ে ভালো হয়—খিচুড়ি কর।’ জয়গুন তার খালুর কথা বুঝতে পারে না। সে বলেই ফেলে, ‘খালু, বড় পাতিল ক্যান?’ মোজাম্মেল সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। বুকের ছটফটানিটা এখন আর নেই। তিনি জয়গুনকে বললেন, ‘শুধু ওরা খাবে না। আজ থেকে আমার বাড়িতে যারা ভাত চাইতে আসবে তারা কেউ খালি হাতে ফিরে যাবে না। সবার জন্য খাবার তৈরি রাখবি।’

তারপর শাহালমকে ডেকে বললেন, ‘শোন, কেউ যদি সাহায্য চাইতে আসে, খাবার চায়—কাউকে খালি হাতে বিদায় দিবি না। খাবার না থাকলে অন্তত চাল-ডাল দিয়ে দিবি।’ তিনি একটানা নির্দেশনা দিয়ে যান, ‘বাজার ফুরিয়ে গেলে, সুপারশপ খোলা আছে, গিয়ে নিয়ে আসবি। তার পরও যেন মানুষ আমার বাড়ির গেট থেকে খালি হাতে, খালি পেটে ফিরে না যায়।’ শাহালম বলে, ‘জি খালুজান।’

মন্তব্য