kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৬ জুলাই ২০২০। ২৪ জিলকদ ১৪৪১

করোনাকালে কেমন আছে কবি-সাহিত্যিকের মন

দুলাল আল মনসুর

১৫ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১২ মিনিটে



করোনাকালে কেমন আছে কবি-সাহিত্যিকের মন

করোনাভাইরাসের মহামারির মুখে মানুষের জীবন কত অসহায় হয়ে পড়েছে তার নানা চেহারা আমরা অহরহ দেখতে পাচ্ছি সাম্প্রতিক সময়ে। শিল্প-সাহিত্যজগতের মানুষরা সাধারণ মানুষদের চেয়ে একটু বেশি সংবেদনশীল। তাঁরা চারপাশের মানুষদের অসহায় অবস্থা দেখে পীড়িত হচ্ছেন, যাঁর যাঁর অবস্থান থেকে মানুষকে সহানুভূতি জানাতে চেষ্টা করছেন, সাহস দেওয়ারও চেষ্টা করছেন। তাঁদের অনুভূতি শিলালিপির পাঠকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সামান্য চেষ্টা করা হলো এখানে।

কথাসাহিত্যিক এবং বেস্ট আমেরিকান শর্ট স্টোরিজ সিরিজের সম্পাদক হাইডি পিটলর তাঁর পরিবারের সঙ্গে ম্যাসাচুসেটসে কোয়ারেন্টিনে থাকার অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে সময়ের স্থিতিস্থাপক স্বভাবের কথা জানান লিটারারি হাবকে। তিনি মনে করেন, ‘শাটডাউনের সময় আমাদের দৈনন্দিন সময়ের ঘটনাগুলো অদৃশ্য হয়ে যায় এবং সময় একটা সমতল ও সন্ধিহীন স্বভাব ধারণ করে। সময়ের চেহারা দেওয়া এখন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখন ভবিষ্যৎ তো আকারহীন। কত দিন, কত মাস কিংবা থেকে থেকে হলেও কয় বছর এই ভাইরাস আক্রমণ করতে থাকে তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। আবার কখন আমরা নিরাপদ বোধ করব জানি না। আমরা বিরাটসংখ্যক মানুষ ভয়ের কাছে বন্দি হয়ে আছি। আমাদের জীবনের চলাচলের কমপক্ষে মায়াজালও যদি সৃষ্টি না করি তাহলে আমরা এভাবেই চলতে বাধ্য থাকব।’

মার্কিন কথাসাহিত্যিক লরেন গ্রফ নিউ ইয়র্ক রিভিউ অব বুকসে কথা বলার সময় ফ্লোরিডায় তাঁর বাড়িতে আটকে থাকার সময় ভীতির হাতে বন্দি থাকার অনুভূতি জানান। তিনি বলেন, ‘অদৃশ্য সব কিছুতেই আমার ভয় : আমার বাড়ির মধ্যে থেকেও আমি আতঙ্কিত বোধ করি যেসব দুর্ভোগ আমার চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি না সেগুলোর জন্য। অনেকের হাতের টাকা-পয়সা ফুরিয়ে আসছে, অনেকে ফুসফুসে জমা তরলের মধ্যে ডুবে যাচ্ছেন; কর্তব্য পালনের সময় স্বাস্থ্যসেবা দানকারীরা অসুস্থ হচ্ছেন; তাঁদের সবার কথা ভেবে আমার ভয় হয়। ফেডারেল সরকারকে নিয়েও আমার ভয় : শুধু সাহায্য করতে পারছে না তা নয়, বরং সাহায্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ফেডারেল সরকার। সেখানেও আমার ভয়। ঘরের বাইরে যেতে ভয়, না জানি রোগ ছড়িয়ে গেল আমার জন্যই। আমার আরো ভয়, আমার সন্তানদের জীবনে, তাদের কল্পনায়, তাদের আত্মার ওপরে না জানি কী প্রভাব ফেলছে এই অস্বাভাবিক সময়টা।’

বোস্টন থেকে প্রবন্ধকার, সাহিত্য সমালোচক, নারীবাদ গবেষক নোরা কাপলান ব্রিকার ‘দ্য পয়েন্ট’-এ কোয়ারেন্টিনের সময় বৈশ্বিক সংকোচন সম্পর্কে লেখেন, ‘একই নগরের কোনো বন্ধু আর বৈরুতে অবস্থান করা কোনো বন্ধুর অবস্থানের দূরত্ব এখন সমান। এ এক দারুণ মায়া বটে। আমরা এই মায়ার মধ্যে অবস্থান করছি—ভাবতে ভালোই লাগে।’ তিনি জানান, তাঁর জগৎ ছোট হয়ে এসেছে। তিনি এক রুমে পড়ায় মগ্ন। আরেক রুমে ল্যাপটপে কাজ করছেন তাঁর স্বামী। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ওপর জোর দিয়ে লেখা প্রবন্ধগুলো পড়তেও ভালো লাগে তাঁর। তিনি কবি এন বয়ারের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘ইতিবাচক পরিসর নিয়ে আমরা যতটা ভাবি, ঠিক ততটাই ভাবা উচিত নেতিবাচক পরিসর নিয়েও। তাহলে আমরা জানতে পারব, আমরা যা যা করি না সেগুলোর মধ্যেও মেধা আছে এবং সেগুলোও ভালোবাসায় পূর্ণ।’

ফিন্যানশিয়াল টাইমস পত্রিকার জন্য লেখা এক প্রবন্ধে ভারতীয় কথাসাহিত্যিক অরুন্ধতী রায় করোনার মহামারির প্রতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দুর্বল প্রতিক্রিয়ার সমালোচনা করেন। সেই সঙ্গে ভবিষ্যতের দিনগুলোর জন্য তাঁর আশার কথাও প্রকাশ করেন : ‘ঐতিহাসিকভাবেই মহামারি মানুষকে বাধ্য করেছে অতীতের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন করে নতুন করে জগৎ কল্পনা করতে। এই সময়ের মহামারিও ভিন্ন নয়। পুরনো জগৎ এবং নতুন জগতের মধ্যে এটা একটা প্রবেশদ্বার। আমাদের অন্ধবিশ্বাস ও ঘৃণার লাশ টেনে নিয়ে, আমাদের লোভ, আমাদের তথ্যভাণ্ডার, আমাদের মরা নদী আর আমাদের পেছনের ধোঁয়াটে আকাশ নিয়েই আমরা এই প্রবেশদ্বারের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারি। অথবা অল্প ব্যাগপত্র নিয়ে হালকা হয়ে নতুন জগতের কল্পনা করতে প্রস্তুত হয়ে এবং এই নতুন জগতের জন্য লড়াই করতে প্রস্তুত হয়ে আমরা এই প্রবেশপথের ভেতর দিয়ে হেঁটে যেতে পারি।’

মার্চের ২০ তারিখে করোনা পরিস্থিতি নিয়ে লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের পক্ষে রব ক্যাসপার কথা বলেন আমেরিকার বর্তমান পোয়েট লরিয়েট জয় হারজোর সঙ্গে। হারজো বলেন, ‘লোকজনের কাছ থেকে ফোনে খবরাখবর পাচ্ছি। আগে সবাই খুব দৌড়ের ওপর চলেছে। ইন্টারনেটের গতির সঙ্গে চলেছে জীবনের গতি। খবরে পড়ছি, ভেনিসের স্বচ্ছ পানির জলাশয়ে ডলফিন দেখা যাচ্ছে। পৃথিবীর সবখানেই পরিবেশদূষণ কমে গেছে। জীবনের অর্থ উন্মোচন করে থাকে বড় পরিসর বা প্রেক্ষাপট; সেটা মানুষের মনের চেয়ে অনেক বড়। আমরা এ রকম পরিসরের অংশবিশেষ পেয়ে থাকি পুরাণের শিকড়ে এবং পৃথিবীর বুকে জীবনের নানা রূপ থেকে পাওয়া প্রেরণায়। সে জন্যই আমরা প্রায়ই কবিতায় ফিরে আসি। মানুষের পক্ষে যে বোঝা বহন করা কঠিন, সেটা ধারণ করতে পারে কবিতা। আমাদের দুঃখ, ক্ষোভ, অনুতাপ এবং আনন্দ, উৎসব, উল্লাস—সবই ধারণ করতে ও প্রকাশ করতে পারে কবিতা। আমরা প্রত্যেকেই শব্দের কাঠামো তৈরি করতে পারি এবং আমাদের হাতে, এমনকি আমাদের হৃদয়েও সংরক্ষণ করতে পারি।

কানাডার কথাসাহিত্যিক কবি মার্গারেট অ্যাটউড জানুয়ারি থেকে মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত কলম্বিয়ার কার্তাজেনা থেকে শুরু করে নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড সফর শেষে ফিরে যান কানাডায়। তত দিনে কানাডার অবস্থা চরম আকার ধারণ করেছে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি স্বেচ্ছানিবাসে চলে যান। মার্গারেট অ্যাটউডের সঙ্গী গ্রায়েম গিবসন গত সেপ্টেম্বরে মারা যান। তখন থেকে তাঁর জীবন কঠিন হয়ে গেছে। তবে প্রচণ্ড আশাবাদী ও উদার দৃষ্টির মানুষ মার্গারেট অ্যাটউড বলেন, ‘একা থাকার কিছুটা অভ্যাস আমার হয়েছে। হ্যাঁ, একা থাকা অবশ্যই কঠিন। তবে এই গ্রহে আমি তো একা নই।’ এই মহামারির পরবর্তী অধ্যায় নিয়েও তিনি কথা বলেন, ‘এই সংকটের কি আরেকটা দিক দেখা যাবে না, যখন আমরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসব? হ্যাঁ, অবশ্যই দেখা যাবে। কিন্তু স্বাভাবিক জীবন কি আগের স্বাভাবিক জীবনের মতো হবে? না, সে রকম হবে না। আমাদের সামনে একটা বিরতি ঘোষণা করা হয়েছে; এই বিরতিতে আমাদের ভেবে দেখতে হবে, আমরা এই গ্রহে কিভাবে জীবন যাপন করছিলাম, সে জীবন যাপনের মূল্য কী, আমরা কিভাবে সব কিছু আরো ভালো অবস্থায় নিয়ে যেতে পারি, আর কেনই বা সে অবস্থায় নিতে হবে। এই খারাপ মুহৃর্তের ভালো দিকও আছে। ভালো করে খেয়াল করলে আপনারা বুঝতে পারবেন, আমরা আবার একত্র হব। আমরা এখনো একসঙ্গেই আছি, তবে একটু ভিন্নভাবে।’ তিনি আরো মনে করেন, যেকোনো খারাপ পরিস্থিতির জন্য রাজনীতির লোকেরা একে অপরকে দোষারোপ করেন। এটা মোটেও ঠিক নয়। তাঁর মতে, ‘মহামারির সময় মানুষ কাউকে দোষ দিতে চায় তার কারণ হলো, এ রকম দোষারোপ করতে পারলে আতঙ্ক কমে আসে। এভাবে যুগে যুগে কুষ্ঠরোগীদের, ইহুদিদের, জিপসিদের ওপর দোষ চাপিয়ে এসেছে।’

আমেরিকার জীবিত কথাসাহিত্যিকদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এন টাইলার; তিনি স্বভাবত নিভৃতচারী। তাঁর লেখার মধ্যেও পটভূমি হিসেবে বারবার এসেছে তাঁর জন্মস্থান। চলমান পরিস্থিতিতে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এন টাইলার বলেন, ‘দীর্ঘ সময় লোকজনের ভিড়ের মধ্যে থাকলে ক্লান্ত লাগে আমার।’ তাঁর ইচ্ছা, করোনাভাইরাস নিয়ে আপাতত তিনি লিখবেন না। তিনি বলেন, ‘আমার উপন্যাসে মানুষের যে ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে গল্প বলতে চাই, সেটা নষ্ট হয়ে যেতে পারে করোনার কথা লিখলে। আমি মনে করি, আমার সামনের উপন্যাসগুলোতে হঠাৎ করে এই ভাইরাস সম্পর্কে কথা বলতে যাওয়াটা আমার জন্য একটা হঠকারী সিদ্ধান্ত হবে। যেকোনো বিষয় পুরনো হয়ে না যাওয়া পর্যন্ত সেটা নিয়ে লেখা উচিত নয় বলেই আমার বিশ্বাস। অন্য কথায়, আমি কিন্তু ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার নিয়ে এখনো লিখিনি। খোলাখুলি বললে, এই বিষয়ে ভালো কোনো লেখাও পড়িনি আমি। তবে মনে করি, সামনের বিশ বছরের মধ্যে হয়তো তেমন কোনো লেখা লিখতে পারেন কেউ।’

ব্রিটিশ পোয়েট লরিয়েট সিমন আর্মিটেজ মনে করেন, মহামারির কবল থেকে সমাজ ধীরে ধীরে জেগে উঠবে, তবে আগের সমাজের চেয়ে এই সমাজ অনেক বেশি প্রাজ্ঞ হবে। করোনাভাইরাস ও লকডাউন সম্পর্কে তিনি সম্প্রতি ‘লকডাউন’ নামে একটি কবিতা লিখেছেন। দ্য গার্ডিয়ানকে তিনি জানান, সংকটের সময় শিল্প মাধ্যম স্বস্তি দিতে পারে; কারণ শিল্প আমাদের মধ্যে চিন্তা করার, সব কিছু মনোযোগ দিয়ে দেখার এবং ধ্যানমগ্ন হওয়ার তাগিদ তৈরি করে।’ তাঁর নতুন কবিতা ‘লকডাউন’ বর্তমান সময় থেকে সপ্তদশ শতকের ইয়ামের প্লেগ এবং কালিদাসের ‘মেঘদূত’ পর্যন্ত বিচরণ করে। ডার্বিশায়ারের গ্রাম ইয়ামে প্লেগ ছড়িয়ে পড়েছিল লন্ডন থেকে পাঠানো কাপড়ের গাঁটের সঙ্গে আসা মাছির মাধ্যমে। ওয়েস্ট ইয়র্কশায়ারে পরিবারের সঙ্গে তাঁর বাড়িতে অবস্থান করার সময় তাঁর মনে হতে থাকে, লকডাউন আরো স্পষ্ট হয়ে আসছে, সীমাবদ্ধতা আরো কড়া করে আরোপ করা হচ্ছে এবং তখনই তাঁর কাছে ইয়ামের বাস্তবতা বেশি মাত্রায় প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে বর্তমানের জন্য। বর্তমানের কোয়ারেন্টিনে থাকা মানুষদের অবস্থা, ইয়ামের মানুষদের অবস্থা আর ‘মেঘদূত’-এর নির্বাসিত যক্ষর অবস্থা এক করে দেখেন কবি সিমন আর্মিটেজ। ইয়ামের ভেতরে অবস্থান করা যুবকও দূর থেকে তার প্রেমিকার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে। শেষে তার প্রেমিকা আর আসে না। দেখা হয় না তাদের। কবি এসব বিষয়ের মধ্যে এবং বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যে খুঁজে পান ধৈর্য ধারণ করার এবং সব কিছু সহজভাবে নেওয়ার শিক্ষা। মোটের ওপর তিনি আশাবাদী।

করোনার সময় ভবিষ্যতের জন্য নতুন প্রজন্মকে প্রস্তুতি গ্রহণ করার প্রেরণা দেন বুকারজয়ী মার্কিন কথাসাহিত্যিক জর্জ সন্ডার্স। তাঁর ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে তিনি একটি চিঠি পাঠান। ‘আমরা যখন মহামারির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, আমার ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য একটি চিঠি’ শিরোনামে তাঁর পাঠানো পত্রটি এপ্রিলের ৩ তারিখে দ্য নিউ ইয়র্কার প্রকাশ করে। তাঁর চিঠির খানিকটা এখানে তুলে ধরা হলো : ‘আমার এও মনে হয়, এই সময়টাতেই পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি দরকার আমাদের চোখ-কান-মন সবই। (কমপক্ষে ১৯১৮ সালের পরে) এমনটি আর কখনো ঘটেনি। আমরা, বিশেষ করে তোমাদের প্রজন্ম, এই বিপদ সম্পর্কে সবাইকে বুঝতে সাহায্য করব, সবাই যাতে বিপদ কাটিয়ে উঠতে পারে। এখনকার মতো সময়ে ঘটনাগুলো ঘটছে প্রত্যেকের ব্যক্তিগত পর্যায়ে, সেগুলোর নতুন কোন রূপটা কল্পনা করতে পারো তোমরা? যে ই-মেইল ও টেক্সটগুলো এখন পাচ্ছ, যে চিন্তাগুলো মাথায় আসছে, জীবনের এই নতুন ও অপরিচিত যাপন পদ্ধতিতে তোমাদের হৃদয়-মন যেসব প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, সেগুলোর কি কোনো রেকর্ড সংরক্ষণ করছ তোমরা? এই কাজটা কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। এখন থেকে ৫০ বছর পর তোমরা এখন যে বয়সে আছ. সেই বয়সের মানুষরা কিন্তু বিশ্বাস করবে না এমন কিছু ঘটেছে (কিংবা ১৯৭০ সালের কোনো অস্বাভাবিক ঘটনার কথা কেউ বললে আমরা এখন যেমন বিস্ময়ে চোখ ঘোরাই, তেমন করতে পারে তারা)। এখনকার অবস্থা সম্পর্কে যা যা লিখতে পারছ, সেগুলোই ভবিষ্যতের ছেলে-মেয়েরা বিশ্বাস করবে। আর কী লিখতে পারছ, সেটাও নির্ভর করছে বর্তমানের ঘটনাগুলোর প্রতি তোমরা কেমন তীক্ষ নজর রাখছ এবং কী কী রেকর্ড সংরক্ষণ করছ তার ওপর।

আমার অনুমানে যেমনটা আসে, আমি বলতে চাইছি, পৃথিবীটা হলো একটা ঘুমন্ত বাঘের মতো এবং আমরা আমাদের জীবন চালাতে চাই এই বাঘের পিঠে বসে। নিশ্চয়ই আমরা এই বাঘের চেয়ে অনেক ক্ষুদ্র। মাঝে মাঝে এই বাঘ জেগে ওঠে। আর সেটাই হলো আতঙ্কের। মাঝে মাঝে এই বাঘ জেগে ওঠে এবং আমাদের প্রিয় মানুষদের কেউ কেউ মারা যায়। কিংবা তারা কেউ কেউ আমাদের হৃদয় ভেঙে দিয়ে যায়। কিংবা কোনো মহামারি ছড়িয়ে পড়ে। এই বাঘ যে শুধু এখন জেগে উঠেছে তা নয়, সময়ের শুরু থেকে বাঘ এ রকম করছে এবং তার এই জেগে উঠা কখনো থামবে না। বাঘের জেগে উঠা লক্ষ করার জন্য সব সময়ই লেখকরা থাকেন; তাঁরা এই বাস্তবতার ভেতর থেকে কোনো অর্থ খুঁজে বের করেন। কিংবা কমপক্ষে ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকেন। কোনো লেখক যদি এ রকম সাক্ষী হয়ে থাকেন, সেটাও জগতের জন্য ভালো, লেখকের নিজের জন্যও ভালো।

এই মারাত্মক দুঃসময়ে তোমাদের সবার জন্য শুভ কামনা জানাই। শিগগিরই কোনো এক সময় সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে। মানুষ সহজে খুশি হতে পারবে। আমি এমনই বিশ্বাস করি এবং তোমাদের প্রত্যেকের জন্য এমনটাই আশা করি। আশা করি, তোমাদের সবার সঙ্গে আবার দেখা হবে। আমরা একসঙ্গে কাজ করব।

যেকোনো সময় যেকোনো দরকারে ই-মেইল করতে মোটেও দ্বিধা বোধ কোরো না।’

তাঁদের সবার কথার সমন্বয়ে বর্তমানের জীবনটা আমাদের সামনে হাজির হচ্ছে নানা রকম মুখাবয়ব নিয়ে। আমাদের সবার আলাদা আলাদা জগৎই এখন ছোট হয়ে এসেছে প্রত্যেকের ঘরের মধ্যে। তার পরও আমরা একে অন্যের সঙ্গে নতুন এক সম্পর্কে যুক্ত হয়ে যাচ্ছি। ভয়, ক্ষোভ, কৃতজ্ঞতা, হতাশা এবং অন্য রকম এক শান্তির বার্তা পাচ্ছি আমরা। চারপাশে যা কিছু ঘটছে, সেগুলোর কঠিন শীত থেকে আমাদের মনকে উষ্ণতা দিতে পারে প্রতীক ও চিত্রকল্প। আপাতত আমরা শিল্পের জগতে প্রতীক আর চিত্রকল্পের আশ্রয় খুঁজতে থাকি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা