kalerkantho

রবিবার । ২২ চৈত্র ১৪২৬। ৫ এপ্রিল ২০২০। ১০ শাবান ১৪৪১

৬৯

ধারাবাহিক উপন্যাস । মৎস্যগন্ধ

হরিশংকর জলদাস

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ধারাবাহিক উপন্যাস । মৎস্যগন্ধ

তিন কুমার—ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু ও বিদুর।

রাষ্ট্রকে আঁকড়ে থাকে যে সে-ই ধৃতরাষ্ট্র। সত্যবতীর  প্রথম পৌত্র। চক্ষু ছাড়া সর্বাঙ্গসুন্দর। সিংহের মতো বলশালী। জন্মান্ধ তবে লোভী। স্বার্থ ছাড়া অন্য কিছু বোঝে না। মানবতা, ভ্রাতৃপ্রেম তার কাছে অবহেলিত।

পাণ্ডু—অম্বালিকাপুত্র। শ্বেতীরোগগ্রস্ত। ধৃতরাষ্ট্রের মতো সবলদেহী নয়। ধৃতরাষ্ট্রের  মতো অহংকারী নয় সে। নম্র। ভ্রাতৃপ্রেমী।

বিদুর—দাসীপুত্র। কিন্তু রাজপ্রাসাদে গৃহীত, সম্মানিত। ব্রাহ্মণ পিতা ও  শূদ্রামাতার গর্ভজাত। বিদুর ধার্মিক, সত্যনিষ্ঠ এবং জ্ঞানবান।

ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু, বিদুর—একই পিতার ঔরসজাত। মা আলাদা আলাদা—অম্বিকা, অম্বালিকা এবং কুন্তলা।

সত্যবতীর প্রথম প্রথম অস্বস্তি লাগত। তিনজনের সঙ্গে যে তিন-তিনটি ঘটনা জড়িত—অন্ধত্ব, রোগগ্রস্ততা এবং ছলনার ইতিহাস। অন্য দুজনকে না হয় মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু বিদুরের জন্ম হলো কেন? ওর জন্মের সঙ্গে যে প্রতারণা জড়িয়ে আছে। এই প্রতারণার জন্য অবশ্য বিদুর দায়ী নয়, শূদ্রাদাসী কুন্তলাও দায়ী নয়। কিন্তু অম্বিকা কি তার দায় এড়াতে পারবে? ও তো বিদ্রোহ করেছে। সত্যবতীকে অগ্রাহ্য করার বিদ্রোহ। এই শঠতার মধ্য দিয়ে অম্বিকা তাঁকে জানিয়ে দিয়েছে—আপনার শাসন আমি মানতে রাজি নই। আপনি কে আমাকে বাধ্য করার? তা-ও তো ভালো কোনো কাজে নয়। ভাশুরের সঙ্গে সঙ্গমের। যা অন্যায়। সমাজবহির্ভূত সেই অন্যায় কর্মটি করিয়েছেন মা আমাকে দিয়ে। একবার মেনে নিয়েছি, দ্বিতীয়বার মানিনি। উপেক্ষা করেছি। জানিয়ে দিয়েছি এই রাজপ্রাসাদে আপনার ক্ষমতার দিন শেষ। কদিন পর আমার পুত্র ধৃতরাষ্ট্র রাজা হবে। আমি হব রাজমাতা।

এ রকম করে ভেবে গেলেন সত্যবতী। ভাবতে ভাবতে মন শান্ত হয়ে এলো। তিনি ধৃতরাষ্ট্রের ঔদ্ধত্য লক্ষ করেন। পাণ্ডুর অবসাদ তাঁর চোখ এড়ায় না। বিদুরের বুদ্ধি, শান্ত স্বভাব তিনি খেয়াল করেন। কী আশ্চর্য, তিনজনের মধ্যে বিদুরকেই বেশি করে ভালোবাসতে শুরু করেন সত্যবতী।

বৃদ্ধা পিতামহী ভীষ্মকে ডেকে বলেন, ‘তিন রাজকুমারের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করা দরকার পুত্র।’

‘ঠিকই বলেছ মা। ওরা তো শিশুকাল অতিক্রম করেছে। এদের এখন শাস্ত্রজ্ঞান অর্জন করা দরকার।’

‘শুধু শাস্ত্রজ্ঞান কেন বাছা? অস্ত্রবিদ্যা শেখাবে না?’

‘তা তো অবশ্যই শিখবে মা। রাজপুত্র হয়ে ধনুর্বিদ না হলে চলে? আমি অতি শিগগির ওদের গুরুগৃহে পাঠানোর ব্যবস্থা করছি।’

‘আর একটি কথা, পাণ্ডু হস্তিনাপুরের রাজা হবে।’

‘ধৃতরাষ্ট্র নয় কেন? বিদুরই বা কী দোষ করল!’

 ‘ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ। অন্ধের শাসন কেউ মেনে নেবে না। না প্রজারা, না অমাত্যরা।’

‘আর বিদুর?’

‘ও তো দাসীপুত্র। শূদ্রার পেটে জন্মানো কাউকে ক্ষত্রিয়রা কি রাজা হিসেবে মেনে নেবে?’ মায়ের কথা শুনে থতমত খেলেন ভীষ্ম। করুণ কণ্ঠে বললেন, ‘ঠি-ক আছে মা। তোমার আদেশ পালন করব।’

তিন রাজকুমারকে বিদ্বান করে তোলার ব্যাপারে ভীষ্ম মনোযোগী হলেন। এখানেই থামলেন না তিনি। তিনজনকেই অস্ত্রগুরুর গৃহে পাঠালেন। বিদুর অস্ত্রবিদ্ হওয়ার ধারেকাছে গেল না।

ভীষ্মের তত্ত্বাবধানে লালিত তিন রাজপুত্র কালক্রমে বয়ঃপ্রাপ্ত হয়ে উঠল। পরিপূর্ণ যুবক হয়ে উঠল তারা।

সত্যবতী নাতিদের বিয়ের উদ্যোগ নিলেন। প্রথমে ধৃতরাষ্ট্রের বিয়ের আয়োজন করতে বললেন ভীষ্মকে। কিন্তু অন্ধরাজপুত্রকে কে কন্যা বিয়ে দেবেন? একজন রাজি হলেন। তিনি গান্ধার রাজ সুবল। স্বেচ্ছায় রাজি হননি। জোর করে রাজি করানো হয়েছে। ক্ষুদ্ররাজ্যের রাজা সুবল। তাঁর সামরিক শক্তি নিতান্ত ক্ষীণ। এই সুযোগের ভীষ্ম সুবলকে সামরিক শক্তির ভয় দেখালেন। রাজ্য হারানোর ভয়ে রাজা কন্যা গান্ধারীকে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিলেন। গান্ধারীও প্রতিশোধ নিয়েছেন। স্বামীগৃহে পৌঁছেই চোখে বস্ত্রখণ্ড বেঁধেছে। স্বামীর অন্ধত্বকে নিজের মধ্যে প্রয়োগ করেছে। এ মস্তবড় প্রতিশোধ—পিতার প্রতি, স্বামীর প্রতি।

এরপর পাণ্ডুর বিয়ে। পাণ্ডুর বিয়ে হলো প্রথমে কুন্তিভোজের পালিত কন্যা কুন্তীর সঙ্গে। কুন্তী রাজা শূরের কন্যা। রাজা শূরের সঙ্গে কুন্তিভোজের আত্মীয়তা। রাজা কুন্তিভোজ নিঃসন্তান। রাজা শূর কুন্তিভোজকে নিজ কন্যা দান করেন। দীর্ঘদিন কুন্তীর সন্তান না হওয়ায় সত্যবতী আর ভীষ্ম মিলে পাণ্ডুকে দ্বিতীয়বার বিয়ে করাতে মনস্থ করেন। রাজা শল্যের বোন মাদ্রীকে পাণ্ডুর দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে নির্বাচন করেন।

সবার শেষে বিদুরকে বিয়ে করানো হলো। সুন্দরী সুশীলা দেবিকার সঙ্গে বিদুরের বিয়ে হলো। দেবিকাও পারসর রাজকন্যা।

অনেক ঘটনা-দ্বন্দ্বের পর পাণ্ডুকে হস্তিনাপুরের রাজা করা হলো। এ নিয়ে ভ্রাতৃবিরোধ উপস্থিত হলো। জ্যেষ্ঠ হিসেবে ধৃতরাষ্ট্রই হস্তিনাপুরের সিংহাসনের দাবিদার। এ নিয়ে দ্বন্দ্ব। কিছু অমাত্য ধৃতরাষ্ট্রের পক্ষ নিলেন। অম্বিকা এই বিরোধে ইন্দন জোগাল। ভীষ্ম আগাগোড়া সত্যবতীকে সমর্থন দিয়ে গেলেন। তাঁদের প্রচেষ্টায় রাজপ্রাসাদের কোন্দল থেমে গেল। পাণ্ডু রাজা হলো।

বছর কয়েক অতিক্রান্ত হলো। গান্ধারী সন্তানসম্ভাবনা। কুন্তী-মাদ্রীর সংবাদ নেই। 

এই সময় কুরুরাজ পাণ্ডু ঘোষণা দিল—সে মৃগয়ায় যাবে। সস্ত্রীক। কুন্তী-মাদ্রী সঙ্গে যাবে। কিন্তু কোথায় যাবে পাণ্ডু? কেন, হিমালয়ের অরণ্যভূমিতে।

হিমালয়ের পাদদেশে পৌঁছেই দুই পত্নীকে উদ্দেশ করে বলল, ‘আমি অক্ষম পুরুষ। আমি কখনো তোমাদের গর্ভে পুত্র-উৎপাদন করতে পারব না।’

দুই পত্নী সবিস্ময়ে প্রশ্ন করল, ‘পুত্র-উৎপাদন করতে পারবেন না?’

‘না। সন্তান উৎপাদনের মতো বীর্যবত্তা আমি নই।’ বলতে বলতে ভেঙে পড়ল পাণ্ডু। কুন্তী স্বামীকে ভেঙে পড়তে দিল না। স্বামীর মাথাটা নিজ কোলে টেনে নিল। বলল, ‘শান্ত হোন রাজা। ধৈর্য ধরুন।’

মাদ্রী বলল, ‘অধৈর্যে অস্থিরতা বাড়ে।’

‘কী করে ধৈর্য ধরি বলো। রাজ্যে আমাদের দুর্নাম ছড়িয়ে পড়বে। তোমরা বাঁঝা হিসেবে নিন্দিত হবে। আর আমাকে সবাই বলবে আঁটকুড়ে রাজা।’

ওদিকে পাণ্ডু সস্ত্রীক মৃগয়ায় চলে আসার পর ধৃতরাষ্ট্র হস্তিনাপুরের রাজা হলো। ভারপ্রাপ্ত নৃপতি। তারই নির্দেশনায় কুরুরাজ্য শাসিত হতে থাকল। একদিন গান্ধারী একদলা মাংসপিণ্ড প্রসব করল। সেখান থেকে দুর্যোধন, দুঃশাসন, বিকর্ণদের জন্ম। একটা কন্যাও জন্মাল ধৃতরাষ্ট্রের—দুঃশলা নাম তার।

ওদিকে রাজা পাণ্ডু কুন্তী-মাদ্রীকে কাছে ডাকল। বলল, ‘আমি তোমাদের কাছে পুত্র চাই। নিজেদের গর্ভে পুত্র উৎপাদন করো তোমরা।’

দুই রানি বলল, ‘কিভাবে! আপনি তো অক্ষম।’

‘কোনো পরপুরুষকে আহ্বান করো শয্যাসঙ্গী হতে।’

‘পরপুরুষকে আহ্বান করব।’ অবাক কুন্তী।

‘কিন্তু কী উপায়ে!’ কুন্তী জিজ্ঞেস করে।

‘দেখো এই অরণ্যে বহু অরণ্যচারী আছে। নানা জায়গা থেকে মৃগয়াতেও আসে অনেকে। তোমরা  তাদের সঙ্গে মিলিত হও। সন্তান উৎপাদন করে আমার বাসনা পূরণ করো।’

‘কিন্তু এসব হস্তিনাপুরের মানুষ মেনে নেবে কেন? মহামহী ভীষ্ম মানবেন কেন? রাজপিতামহী সত্যবতী মানবেন কেন?’ এক নিঃশ্বাসে বলে গেল মাদ্রী।

এবার রাজা পাণ্ডু ব্যাকুলতা কমালেন। শান্তস্বরে বললেন, দেখো রানিরা, এই অঞ্চলটি হস্তিনাপুর থেকে বহু দূরে অবস্থিত। ঘোর অরণ্যে ঘেরা। এখানকার ঘটনা কখনো রাজধানী পর্যন্ত পৌঁছবে না। এখানে তোমরা পুত্রবতী হলে রাজ্যবাসীর মনে কোনোভাবেই সন্দেহের উদ্রেক হবে না যে অন্য পুরুষের সঙ্গে মিলিত হয়ে তোমরা গর্ভে সন্তান ধারণ করেছ।’

‘তার পরও।’ আমতা আমতা করে বলল মাদ্রী।

রাজা পাণ্ডু বলল, ‘তোমাদের স্বাধীনতা দিলাম। তোমরা যেকোনো পুরুষের সঙ্গে মিলিত হও। আমার শুধু সন্তান চাই, পুত্রসন্তান।’

ক্ষেত্রজ পুত্র উৎপাদনের অনুমতি পেয়ে দুই রানি সন্তান উৎপাদনে মনোযোগী হলেন।

কালক্রমে কুন্তীর গর্ভে তিনটি পুত্রসন্তান জন্মাল—যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন। মাদ্রীর গর্ভে জন্মাল দুজন—নকুল ও সহদেব। ওরা বড় হতে থাকল।

একদিন পাণ্ডু অসংযমী হয়ে উঠল। তার দেহ-আকাঙ্ক্ষা প্রবল হলো। রানিদের আহ্বান জানাল। কুন্তী রাজি হলো না। কিন্তু মাদ্রী রাজার আকুলতাকে অবহেলা দেখাতে পারল না। পাণ্ডু স্ত্রীগমনে মগ্ন হলো। কিন্তু ব্যর্থ পুরুষের স্ত্রীগমন সফল হলো না। পাণ্ডুর জেদ বেড়ে গেল। রাজা বেপরোয়া হলো। সেই অবস্থায়ই মৃত্যু হলো হস্তিনাপুরের নৃপতি পাণ্ডুর।

মহারাজা পাণ্ডুর মৃতদেহ হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদে নিয়ে আসা হলো। সঙ্গে দুই স্ত্রী ও পাঁচ পুত্র। রাজার মৃত্যুতে সারা রাজ্যে হাহাকার জাগল। রাজার নিথর দেহ দেখে যেমন সবাই স্তব্ধ হলো, তেমনি দিব্যকান্তির পঞ্চপাণ্ডবকে দেখে উত্ফুল্ল হলো। আনন্দিত হলো না শুধু ধৃতরাষ্ট্র।

মাদ্রী নকুল-সহদেবকে কুন্তীর হাতে গছিয়ে দিয়ে স্বামীর সহমৃতা হলো। পাঁচটি পুত্র তখন নাবালক। পাঁচ পুত্রকে নিয়ে কুন্তী অকূলে ভাসল।

সমস্ত নগরবাসী শোকে মুহ্যমান। পাণ্ডুর প্রৌঢ়া জননী অম্বালিকা পুত্রশোকে মাটিতে গড়াগড়ি যাচ্ছে। তারই চোখের সামনে তার একমাত্র পুত্র পাণ্ডু আর পুত্রবধূ মাদ্রী আগুনে অঙ্গার হচ্ছে।

সত্যবতী পাথর হয়ে গেলেন। তিনি উদাসীন, পৌত্রের শ্মশানভূমিতে গেলেন না।

সত্যবতী  বুঝতে পারলেন—পাণ্ডুর মৃত্যুতে একটা ঝড় উঠবে এই রাজপ্রাসাদে। হস্তিনাপুরের রাজনীতি ওলটপালট হবে। কুরুরাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠবে।

পাণ্ডুর মৃত্যুর পর ধৃতরাষ্ট্র নিজেকে হস্তিনাপুরের নৃপতি হিসেবে ঘোষণা করল।

 

আগামী সংখ্যায় সমাপ্য

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা