kalerkantho

বুধবার । ৬ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৪ জমাদিউস সানি ১৪৪১

এখানে থেমো না

উপন্যাসের ছলে ইতিহাসের রেখাচিত্র

মাসউদ আহমাদ
আনিসুল হক, এখানে থেমো না; প্রকাশক : প্রথমা প্রকাশন। প্রচ্ছদ : সব্যসাচী হাজরা, দাম : ৫২০ টাকা

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



উপন্যাসের ছলে ইতিহাসের রেখাচিত্র

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সময় পর্ব নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ এবং ইতিহাস বদলে দেওয়া অধ্যায়। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বপ্ন ও ফায়সালা এক রকম ১৯৪৭ সালেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল। পরে ধাপে ধাপে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালুকণার মতো স্বাধীনতা অর্জনের ভাবনা, পরিকল্পনা, সাহস এবং ব্যাপক আন্দোলনের ধারাবাহিকতা একীভূত হয়ে তৈরি হয়েছে। এই সময় পর্বে অংশ নিয়ে জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন স্বাধীনতাকামী বাংলাদেশের অকুতোভয় মানুষেরা। আর এর নেতৃত্ব দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সাতচল্লিশ থেকে একাত্তর সময়টি কেমন ছিল এবং কিভাবে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ হয়ে উঠল—সেসব ঘটনা ও রক্তের ইতিহাসের ছায়া অবলম্বনে উপন্যাস লিখে চলেছেন কবি ও কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক। তাঁর সেই প্রচেষ্টার নবতর সংযোজন এই উপন্যাস ‘এখানে থেমো না’।

‘এখানে থেমো না’ উপন্যাসটি আনিসুল হকের পঞ্চম প্রয়াস, যা তিনি উল্লিখিত সময় পর্ব নিয়ে লিখে চলেছেন। আগের পর্বগুলো ছিল যথাক্রমে—‘যারা ভোর এনেছিল’, ‘ঊষার দুয়ারে’, ‘আলো-আঁধারের যাত্রী’ এবং ‘এই পথে আলো জ্বেলে’। এখানে যে কথাটি জোর দিয়ে বলার, ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সময় পর্বের ঘটনা, দুর্ঘটনা আর অশ্রু ও রক্তের ইতিহাস নিয়ে অসংখ্য বই লেখা হয়েছে। তাহলে কেন ফেলে আসা ইতিহাস নিয়ে লেখা আনিসের বানানো এই উপন্যাসধারা পড়ব? পড়ব এ কারণে যে ইতিহাসকে কিভাবে মানুষের কাছে মনোগ্রাহী ভাষা-ভঙ্গিতে উপস্থাপন করা যায়, এমন সহজ ও লাবণ্যময় ভাষায় ইতিহাসের বর্ণনা আর ব্যক্তিগর্বকে চিত্রণ করা যায়, এখানে তা মনোরমভাবে প্রতিভাত হয়েছে। একবার উপন্যাসটি পড়তে ধরলে শেষ না করে উপায় থাকে না। এখানেই এ উপন্যাসমালার শক্তি ও সৌন্দর্য।

সৌন্দর্যটি কী রকম—যেকোনো সাধারণ পাঠক ও খুঁতখুঁতে সমালোচক উপন্যাসটির প্রথম পৃষ্ঠাটি পড়ে উঠলে তার যথার্থ উত্তর পেয়ে যাবেন বলে মনে করি।

ফাল্গুন মাসের এক শেষরাতের অনুপম বর্ণনা দিয়ে উপন্যাস শুরু হয়। শেষরাতে নদী, আকাশের তারা ও প্রভাত এবং মানুষ কিভাবে প্রকৃতির চিরন্তন নিয়মে জেগে ওঠে এবং বিকশিত হয়ে চলে, তার চিত্র এঁকে উপন্যাস শুরু করেছেন আনিসুল হক। আর সেই সময় বঙ্গবন্ধু কী করছেন, কী ভাবছেন? উপন্যাসের শুরুতে নদীর বিবরণটা বড় আকারে এসেছে। একই সঙ্গে শৈশবে নদীর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর যে সম্পর্ক ও বেড়ে ওঠা, সেসবও প্রামাণ্য ভঙ্গিতে তুলে এনেছেন ঔপন্যাসিক। কিন্তু এমন হৃদয়গ্রাহী ভঙ্গিতে সেসব লেখা হয়েছে। পড়তে পড়তে মন দ্রবীভূত হয়ে চলে। কোনো ইতিহাস অবলম্বনে লেখা উপন্যাস পড়ছি তখন সেটা আর মনে থাকে না। মনে হতে থাকে, যেন সদ্য ঘটে যাওয়া ঘটনা ও প্রকৃতির ছায়ামায়া বিষয় করে লেখক তাঁর উপন্যাসখানি বিস্তৃত করে চলেছেন।

আনিসুল হকের উপন্যাস ‘এখানে থেমো না’ পর্বে ধরা আছে ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পর্যন্ত সময় পর্বের ঘটনাপ্রবাহ। তখন আইয়ুব খান বিদায় নিয়েছেন। পাকিস্তানের নতুন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। ছয় দফার ভিত্তিতে নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো রচনার কাজ এগিয়ে চলেছে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে। একাত্তরের তীব্র ও অসহনীয় সময় ঘনিয়ে আসছে। বঙ্গবন্ধু তাঁর যোগ্য সঙ্গীদের নিয়ে কিভাবে দেশ স্বাধীনের পথে এগিয়ে চলেছেন, তারই নিপুণ আখ্যান এখানে বিধৃত হয়েছে। ঝরঝরে লাবণ্যময় ভাষায় লেখা উপন্যাসটি পড়তে পড়তে চোখ ভিজে আসে, মন আলোকিত হয়ে ওঠে। এখানেই এ উপন্যাসের শিল্পসুষমা ধরা পড়ে। আমরা উপন্যাসটির বহুল পাঠ ও প্রচার আশা করি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা