kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

লেখার ইশকুল

শিল্পীর কাজ প্রশ্ন করে যাওয়া, উত্তর দেওয়া নয়—আন্তন চেখভ

১৫ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



শিল্পীর কাজ প্রশ্ন করে যাওয়া, উত্তর দেওয়া নয়—আন্তন চেখভ

রুশ কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার আন্তন চেখভের জন্ম ১৮৬০ সালে। ছোটগল্পের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ লেখকদের অন্যতম মনে করা হয় তাঁকে। আধুনিক নাটকের পথিকৃৎ হিসেবে ইবসেন, স্ট্রিনবার্গ প্রমুখের সমপর্যায়ে অবস্থান চেখভের। লেখকজীবনের প্রায় পুরো সময়ই তিনি চিকিৎসক হিসেবেও সক্রিয় ছিলেন। দুটি ভিন্ন কাজের সঙ্গে জড়িত থাকা নিয়ে রসিকতা করে বলেন, ‘চিকিৎসাপেশা আমার বৈধ স্ত্রী এবং সাহিত্য আমার গোপন প্রেমিকা।’ 

চেখভের বাবা পাভেল চেখভ মুদি দোকান চালাতেন। তিনি ছিলেন গোঁড়া খ্রিস্টধার্মিক। তিনি সন্তানদের শারীরিক শাস্তি দিতেও দ্বিধা করতেন না। কোনো কোনো সমালোচক মনে করেন, তাঁর বাবার আদলে চেখভের গল্পের অনেক চরিত্র তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে চেখভের মা ইয়েভগেনিয়া চমৎকার গল্প বলতে পারতেন। চেখভের নানা কাপড়ের ব্যবসায়ী ছিলেন। চেখভের মা ছোটবেলায় তাঁর সঙ্গে রাশিয়ার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতেন। সন্তানদের কাছে সেসব ভ্রমণের অভিজ্ঞতার কথা গল্পের মতো করে বলতেন চেখভের মা। তাঁদের ওপর মা-বাবার প্রভাব সম্পর্কে চেখভ বলেন, ‘বাবার কাছ থেকে আমরা মেধা পেয়েছি, মায়ের কাছ থেকে পেয়েছি আত্মার শক্তি।’

১৮৭৯ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়া শুরু করেন চেখভ। তবে নিজের পড়ার খরচ এবং পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার জন্য রাশিয়ার সমসাময়িক জীবন নিয়ে নিয়মিত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হাস্যরসাত্মক কাহিনি লেখা শুরু করেন। এগুলো অবশ্য তিনি আন্তশা চেখন্তে ছদ্মনামে লিখতেন। এসব ব্যঙ্গ রচনার মাধ্যমে তিনি জনপ্রিয়তাও অর্জন করেন। প্রথম দিকে অর্থ উপার্জনের জন্য গল্প লিখলেও ক্রমান্বয়ে তাঁর শৈল্পিক চাহিদা বাড়তে থাকলে গল্পের মধ্যে নতুনত্ব যোগ করতে থাকেন। তাঁর এই প্রয়াসে আধুনিক ছোটগল্পের উৎকর্ষ লাভ হয়। গল্পের মধ্যে জটিলতা আনার কারণে তিনি পাঠকের কাছে মোটেও কৈফিয়ত দেননি, বরং মনে করেছেন, শিল্পীর কাজ প্রশ্ন করে যাওয়া—উত্তর দেওয়া নয়। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে সিরিয়াস লেখার মাধ্যমে পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন চেখভ। সে সময় তাঁর গল্প ‘শিকারি’ পড়ে তখনকার দিনের প্রখ্যাত লেখক দিমিত্রি গ্রিগরোভিচ মুগ্ধ হন এবং চেখভের মেধার প্রশংসা করেন। তিনি মনে করেন, তাঁর মেধা চেখভকে নতুন প্রজন্মের লেখকদের সামনের দিকে স্থান দিয়েছে। তিনি চেখভকে কম লিখতে বলেন এবং শৈল্পিক গুণের দিকে বেশি নজর দেওয়ার পরামর্শ দেন।

১৮৯৫ সালে লেখেন নাটক ‘সিগাল’, ১৮৯৭ সালে লেখেন ‘আঙ্কল ভানিয়া’, ১৯০০ সালে ‘তিন বোন’,  ১৯০৩ সালে লেখেন ‘চেরি বাগান’। তাঁর এ নাটকগুলো মঞ্চে জীবনের বাস্তব উপাদান ব্যবহারের উদাহরণ হয়ে আছে। মানুষ হিসেবে নিজেদের মূল্যায়ন করার সুযোগ তৈরি করে দেয় দর্শকদের। ১৯৮১ সালে মার্কিন নাট্যকার টেনেসি উইলিয়ামস চেখভের ‘সিগাল’-এর নাট্যরূপ দেন। উইলিয়াম বয়েড বলেন, চেখভের ছোটগল্প তাঁর সেরা অর্জন। অন্যদিকে ছোটগল্পকার রেমন্ড কারভার মনে করেন, চেখভ সেরা ছোটগল্প লেখকদের সেরা। মারা যাওয়ার কয়েক মাস আগে চেখভ ইভান বুনিনকে বলেন, তিনি মনে করেন, পাঠকরা তাঁর লেখা বড়জোর সাত বছর পড়বেন। বুনিন জিজ্ঞেস করেন, ‘সাত বছর কেন?’ চেখভ বলেন, ‘আচ্ছা ঠিক আছে, সাড়ে সাত বছর। সে-ও তো কম নয়। কারণ আমি আর ছয় বছর বাঁচতে পারি। ’

১৯০৪ সালের ১৫ জুলাই চেখভ মারা যান।

              ► দুলাল আল মনসুর

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা