আমার বাবার মুখে প্রথম যেদিন কণ্ঠ : এন্ড্রু কিশোর কথা ও সুর : আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ছবি : নয়নের আলো আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল বলেন, “‘নয়নের আলো’ ছবির নয়নের (জাফর ইকবাল) বাবা ছিল গায়েন। সারা দিন গান নিয়ে পড়ে থাকত। কিন্তু অভাবের সংসারে গান গেয়ে জীবন চালানো ছিল অনেক কঠিন। তিন থেকে ছয় মাস আমরা গল্পটি নিয়ে বসেছি, চিন্তা করেছি। গল্পটি বুকে ধারণ করার পর মনে হলো আমার জীবনের সঙ্গেও এর কিছুটা মিল আছে। কারণ আমার বাবা-মায়েরও সংগীতের প্রতি অনেক ভালোবাসা। গান না করলেও আমার সংগীতচর্চাকে ভালো চোখে দেখতেন, উৎসাহ দিতেন। ছেলে গান লেখে, সুর করে—এটা ছিল তাঁদের অনেক ভালো লাগার একটা বিষয়। ছবির গল্পের সঙ্গে যখন নিজের জীবনকে দেখতে পাই তখন আরো গভীরে চলে যাই। চুক্তিবদ্ধ হওয়ার সময় আমাকে বলা হয়, ‘নতুন কাউকে দিয়ে গানটি গাওয়াবে। তুমি যেহেতু নতুন, সেহেতু যত কম বাজেটে গানটি করা যায় ততই ভালো।’ কথা ও সুর করার পর একদিন এন্ড্রু কিশোরের বাসায় গিয়ে অনুরোধ করি গানটি একটু টেপ রেকর্ডারে গেয়ে দিতে। মূল রেকর্ডিংয়ের আগে শিল্পীর কণ্ঠ সবাইকে শোনানোর জন্যই এটা করা। শোনার পর প্রযোজকসহ সবাই নেগেটিভ মন্তব্য করতে থাকেন। একজন বলে ওঠেন, ‘গানের মধ্যে মুরগি ডাকে কেন? কুকুরের শব্দ কেন?’ বলি, ‘আমি তো স্টুডিওতে গানটি করিনি। ভয়েস শোনানোর জন্য একটি রুমের মধ্যে টেপ রেকর্ডারে এটা ধারণ করেছি।’ স্টুডিওতে গান রেকর্ড করার পয়সা তখন আমার ছিল না। কণ্ঠটি আবার রেকর্ড করতে বলা হয়। তখন আমার বন্ধু রিজভীর কাছে একটি আকাই টেপ রেকর্ডার ছিল। বরিশাল থেকে তাকে ঢাকায় ডেকে আনি। এরপর তার ধানমণ্ডির বাসায় দরজা-জানালা বন্ধ করে এন্ড্রু কিশোরের কণ্ঠটি আবার ধারণ করি। ক্যাসেট নিয়ে আবার যাই প্রযোজকের অফিসে। এবারও সবাই বিরূপ মন্তব্য করতে থাকেন। কেউ বলেন, ‘কাটা কাটা সুর’। কেউ বলেন, ‘গানে মাধুর্য খুঁজে পাই না।’ কেউ বলেন, ‘এটা কোনো গানের কথা হলো।’ একপর্যায়ে পরিচালক বেলাল আহমেদ বললেন, ‘একটা ছেলেকে আর কত কষ্ট দেবেন। ছয় মাস ধরে সে পরিশ্রম করছে। কত রকম পরীক্ষা দিচ্ছে। আমার কাছে তো গানটি ভালো লাগছে।’ এরপর প্রযোজকসহ অন্যরা সায় দিতে থাকেন। শ্রুতি স্টুডিওতে গানটির রেকর্ডিং হয়। এর আগের দিন রেকর্ডিংয়ে ‘আমার বুকের মধ্যেখানে’ গানটি শুনে কেঁদে ফেলেন প্রযোজক ফরিদ ভাইয়ের স্ত্রী! ফরিদ ভাই তখন বলেন, ‘বাবা গানটি রেকর্ডিংয়ের জন্য তোমার যত টাকা লাগে খরচ করো।’ ছবির মুক্তির পর এই গান তো ইতিহাস!” বাবা কণ্ঠ : জেমস কথা ও সুর : প্রিন্স মাহমুদ অ্যালবাম : হারজিৎ গত বছর একটি জাতীয় দৈনিকে গানটি তৈরির প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন প্রিন্স মাহমুদ। বলেন, “আমাদের ভাই-বোনের কাছে বাবা ছিলেন শ্রদ্ধা, ভয়, উৎসাহ, নির্দেশনা ও নির্ভরতার জায়গা। বৈষয়িক হিসাব-নিকাশ ও স্বার্থের টানাপড়েনের ঊর্ধ্বে সেই জায়গাটা। তাঁর চলে যাওয়ার পরের অনুভূতিগুলো শব্দে বসিয়ে সুরে প্রকাশ করা একরকম অসম্ভব। ‘বাবা’ গানটিতে আমাদের নিয়ে তাঁর ভাবনা ও কিছু স্মৃতি দিয়ে শুরু করি। সকালে তিনি কোরআন তেলাওয়াত করতেন, ঘুম থেকে আমাদের জাগিয়ে তুলতেন। এসবের পাশাপাশি বাসার বারান্দায় তাঁর ইজি চেয়ার, চশমা, লাঠিসহ টুকরো টুকরো ভাবনা তুলে এনেছিলাম। ‘এখনো দুচোখে বন্যা’ অ্যালবামে জেমস ভাইয়ের গাওয়া ‘মা’ গানটি সবাই পছন্দ করেছিল। পরের বছর ‘হারজিৎ’ অ্যালবামের জন্য করলাম ‘বাবা’। বাবা তোমার কথা মনে পড়ে কণ্ঠ : আইয়ুব বাচ্চু কথা ও সুর : আইয়ুব বাচ্চু অ্যালবাম : প্রেম তুমি কি আইয়ুব বাচ্চু বলেন, “গানটা যখন তৈরি করি তখন আমার বাবা খুব অসুস্থ ছিলেন। বাবাকে নিয়ে ভাবতে ভাবতেই আইডিয়াটি মাথায় আসে। এক বসাতেই পুরো গানটির কথা ও সুর হয়ে যায়। রেকর্ডিংও হয়েছে এক টেকেই। মায়েদের পাশাপাশি বাবারাও যে সন্তানদের জন্য অবদান রাখেন, সন্তানদের মানুষ করে তুলতে প্রাণপণ লড়াই করেন, সে বিষয়টি তুলে ধরতে চেয়েছি। বলা যায় গানটিতে আমি বাবাদের সাপোর্ট করেছি। প্রকাশের পর বন্ধু-পরিচিতজনদের অনেকেই গানটির প্রশংসা করেছে। আমার ধারণা, আমার বাবাও কখনো না কখনো এই গানটি শুনেছেন! গানটি আমার নিজেরই অনেক ভালো লাগার, ভালোবাসার।’ বাবা বলে ছেলে নাম করবে কণ্ঠ : আগুন কথা : মনিরুজ্জামান মনির সুর ও সংগীত : আনন্দ শ্রীবাস্তব ও মিলিন্দ শ্রীবাস্তব ছবি : কেয়ামত থেকে কেয়ামত আগুন বলেন, “আমি তখন ব্যান্ড (সাডেন) করি। একদিন আলম চাচা (আলম খান) আম্মারে ফোন করে বললেন, ‘আপনার ছেলেটারে আমাদের দিয়া দেন।’ আম্মা বলেন, ‘হ্যাঁ। আপনারই তো ছেলে। নিয়া যান।’ ছেলেকে দিয়ে কী হবে আলম? তখন তিনি বলেন, ‘প্লেব্যাক করাব।’ এরপর আমার সঙ্গে একদিন কথা হয়, ‘তুমি কি প্লেব্যাক করবা?’ শুনে তো আমার চোখেমুখে বিস্ময়! বলেন, ‘খুব ভালো একটা খবর আছে। আনন্দমেলা ফিল্মস ইন্ডিয়ান কেয়ামত থেকে কেয়ামত ছবির কপিরাইট কিনে ফেলেছে। টোটাল জিনিসটা এখন আমাদের। গান আছে চারটা। গাইবা তুমি। তোমার কো-সিঙ্গার হলো রুনা লায়লা।’ তারপর বললেন, ‘এক দিনে চারটা গানের রেকর্ডিং হবে, পারবা তো?’ আমি তখন ২১ বছরের টগবগে যুবক। রাজি হয়ে যাই। রুনা আন্টি তখন গানগুলোতে কণ্ঠ দেওয়ার আগে কনফিউজ ছিলেন। আলম চাচাকে বলেছিলেন, ‘ও ছোট মানুষ। তার ওপর ব্যান্ড মিউজিক করে। গাইতে পারবে নাকি? তখন আলম চাচা বলেছিলেন, ‘ম্যাডাম ওকে জাস্ট সুযোগটা দেন। যদি ভালো না হয় তখন ফেলে দেব।’ একদিন বিকেলে রেকর্ডিং শুরু হয়। শেষ হয় রাত সাড়ে ১০টার দিকে। এই সময়ের মধ্যেই চারটি গানে ভয়েস দিয়ে ফেলি। না বুঝেই তখন গানগুলো গেয়েছি। শ্রুতি স্টুডিওতেই রেকর্ডিং হয়। শোনার পর রুনা আন্টি আলম চাচার কাছে আমার প্রশংসা করেন। গানটির দুটি ভার্সন আছে। একটি ভার্সন আনন্দের, অন্যটি দুঃখের। ছবিতে সালমান শাহ যখন মারা যায় তখন বাজে। এটা খুব স্লো। এখন মাঝে মাঝে গানটি শুনলে বাবার কথা মনে পড়ে। মনে হয় বাবা তো ছোটবেলায় একসময় বলেছিল, ‘ছেলেটা আমার নাম রাখবে।’ জীবনের প্রথম মুক্তি পাওয়া ছবির গান তো। সব মিলিয়ে এই গানটি ভাবনাতে ফিরে আসে বারবার।” বাবা নেই কণ্ঠ : প্রদীপ সাহা সুর : রাজেশ অ্যালবাম : পাপী গানটির সুরকার রাজেশ বলেন, “২০০৬ সালের ঘটনা। তখন ‘পাপী’ অ্যালবামটির কাজ চলছিল। ওই অ্যালবামের কিছুদিন আগে আসিফ ভাইয়ের বাবা মারা গেলেন। তারও আগে ২০০০ সালে প্রদীপ দার (সাহা) বাবা মারা যান। প্রদীপ দাকে বললাম দাদা, ‘আপনার বাবা নাই। কিছুদিন আগে আসিফ ভাইয়ের বাবাও চলে গেলেন। এক কাজ করেন। বাবাকে নিয়ে একটা গান লেখেন।’ তিনি বলেন, ‘ভালো কথা বলছো তো। বাবা নিয়ে তো কখনো গানই করা হয়নি।’ তিনি রাতেই গানটির কথা চিন্তা করে রাখেন। পরদিন দুজন একসঙ্গে বসি। ৩০-৪০ মিনিটের মধ্যে গানটির কথা ও সুর হয়ে যায়। আসিফ ভাই প্রায় ২০ মিনিটের মধ্যে গানটিতে ভয়েস দেন। যেহেতু কিছুদিন আগে তাঁর বাবা মারা গিয়েছিলেন, সেহেতু গাইতে গিয়ে আবেগটা এমনিতেই চলে আসছিল। রেকর্ডিংয়ের সময় সবাই খুব ইমোশনের মধ্যে ছিলাম। গানটা করার কিছুদিন পরই আমার বাবা মারা যান। সুর করার সময় গানটির মর্মটা বুঝিনি। বাবাকে হারানোর পর গানটাকে নতুনভাবে উপলব্ধি করি।”