kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ মাঘ ১৪২৮। ২৫ জানুয়ারি ২০২২। ২১ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

পাঁচ গানের গল্প

২২ জানুয়ারি না ফেরার দেশে চলে গেছেন অনেক কালজয়ী গানের সুরকার, সংগীত পরিচালক ও গায়ক খোন্দকার নূরুল আলম। তাঁর সুর করা পাঁচটি গানের গল্প নিয়ে এ আয়োজন...

২৮ জানুয়ারি, ২০১৬ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



 পাঁচ গানের গল্প

চোখ যে মনের কথা বলে

কথা   :    গাজী মাজহারুল আনোয়ার

কণ্ঠ   :    খোন্দকার নূরুল আলম

ছবি   :    যে আগুনে পুড়ি (১৯৭০)

পরিচালক     :    আজহারুল ইসলাম 

লিপসিং      :    রাজ্জাক

গাজী মাজহারুল আনোয়ার

এক বিকেলে ফার্মগেটের একটি স্টুডিওতে গানটি লিখতে বসেছিলাম। খোন্দকার নূরুল আলম ভাই ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ছবির পরিচালক আজহার হোসেন। আগে থেকেই ‘চোখ’ শব্দটার প্রতি খোন্দকার নূরুল আলম ভাইয়ের আলাদা একটা দুর্বলতা ছিল। তিনি বলতেন, ‘চোখের ভেতরেই সমস্ত পৃথিবী দেখা যায়।

বিজ্ঞাপন

যেকোনো জিনিসকে আমরা আগে চোখ দিয়েই দেখি, তারপর মনে স্থান দিই। ’ যার ফলে ‘চোখ’ শব্দটির ব্যবহার করে তাঁর সঙ্গে বেশ কয়েকটি গান করেছি। এই গানের গল্পেও চোখের বিষয়টি ছিল। আধাঘণ্টার মধ্যে গানটি লেখা হয়ে যায়।

শুরুটা শোনার পরই মাথা নাড়িয়ে বাহবা দিলেন তিনি। এরপর লেখার পাশাপাশি চলল সুর। পুরো হওয়ার পর পরিচালক খোন্দকার ভাইকে অনুরোধ করলেন গানটি গাইতে। তিনি গাইলেন। ছবির চিত্রায়ণের সঙ্গে গানটি এমনভাবে মিশে গেছে, দেখলে অন্য রকম এক অনুভূতি হয়। পরে আরো অনেক শিল্পীই গানটি গেয়েছিলেন। তবে খান্দকার নূরুল আলম ভাইয়ের গাওয়াটাই বেশি জনপ্রিয়।

 

এক বরষার বৃষ্টিতে ভিজে

কথা   :    গাজী মাজহারুল আনোয়ার

কণ্ঠ   :    ফেরদৌসী রহমান/নিলুফার ইয়াসমীন

ছবি   :    জলছবি (১৯৭১)

পরিচালক     :    এইচ আকবর

লিপসিং      :  রোজী

ফেরদৌসী রহমান

এই গানটির প্রথম শিল্পী কিন্তু আমি। যত দূর মনে পড়ে ষাটের দশকের শুরুর দিকে বেতারের জন্য গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছিলাম। ১৯৭০ সালের দিকে একদিন খোন্দকার নূরুল আলম ভাই বললেন, গানটি তিনি ‘জলছবি’ ছবির জন্য নতুনভাবে করতে চান। ছবির গল্পের প্রয়োজনে আমার পাশাপাশি নিলুফার ইয়াসমীনের কণ্ঠেও গানটি ব্যবহৃত হবে। আমার কাছে অনুমতি চাইলেন। আমি বললাম, ‘অবশ্যই করবেন। ’ তারপর ছবিতে দুজনের কণ্ঠেই গানটি ব্যবহৃত হয়। নিলুফার ইয়াসমীনের গাওয়া গানটির সঙ্গে পর্দায় ঠোঁট মেলান রোজী। আমার গাওয়াটি ব্যবহৃত হয় ব্যাকগ্রাউন্ডে। তবে নিলুফার ইয়াসমীনের গাওয়াটাই সবাই মনে রেখেছে।

 

যদি মরণের পরে কেউ প্রশ্ন করে

কথা   :    মোহাম্মদ রফিকুজ্জামান

কণ্ঠ   :    সাবিনা ইয়াসমীন

সাবিনা ইয়াসমীন

১৯৭৯ সালের দিকে বেতারের জন্য গানটি করেছিলাম। একদিন দুপুর ১২টার দিকে মতিঝিলের এলভিস স্টুডিওতে গানটির রেকর্ডিং হয়। নূরুল আলম ভাইয়ের একটা বৈশিষ্ট্য ছিল, ভয়েস দেওয়ার সময় পছন্দ হলে তিনি কিছু বলতেন না। তবে অপছন্দ হলে ভুলটা ধরিয়ে দিতেন। এই গানটির টেক নেওয়ার সময় কিছুই বললেন না। বুঝে নিয়েছিলাম তাঁর ভালো লেগেছে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ভয়েস দেওয়া শেষ। বেতারের জনপ্রিয়তার পর টিভিতেও গানটি গাওয়া শুরু করি। রিমেক করে এই গানটি অ্যালবামেও প্রকাশ করেছি। রফিকুজ্জামান ভাই নিজের অনুভূতি থেকে গানটি লিখেছিলেন। ‘একজন মুক্তিযোদ্ধা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন, মারা যাচ্ছেন। সেই মুহৃর্তে তিনি কী ফিল করছেন। কী দেখে যাচ্ছেন’—এমন প্রেক্ষাপট নিয়েই গানটি। গানটির শেষ লাইন ‘এ দেশের প্রয়োজনে জীবন দিয়েও মরণজয়ী হাসতে শিখেছি’ আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়।

 

তুমি এমনই জাল পেতেছ সংসারে

কথা   :    মোহাম্মদ রফিকুজ্জামান

কণ্ঠ         :    সুবীর নন্দী

ছবি         :    শুভদা (১৯৮৬)

পরিচালক     :    চাষী নজরুল ইসলাম

লিপসিং :    রাজ্জাক

মোহাম্মদ রফিকুজ্জামান

রাজ্জাক গরিবের ছেলে। সে বসে জাল বুনছে। নদী থেকে পানি নিয়ে যাচ্ছিল নায়িকা। এর মধ্যে বৃষ্টি আসে। এরপর সে নায়িকাকে বলে, ভিজে যাবি না। এদিকে আয়, দাঁড়া। তারপর সে তাকে পিঁড়িতে বসায়। নায়িকা তার কাছে একটি গান শোনার অনুরোধ করে। তখন জালটা রেখে দিয়ে খোলটা হাতে নেয় সে। এই খোলটাকে প্রাধান্য দিয়েই গানটি। খোলে টোকা দিয়ে সে ধরে, ‘তুমি এমনই জাল পেতেছ সংসারে, কার বা এমন সাধ্য আছে এই মায়াজাল ছিঁড়ে যেতে পারে। ’ এই গানটি আমি তিনবার লিখেছি। প্রথম দুবার আমার নিজেরই পছন্দ হয়নি। চাষী একটা পছন্দ করেছিলেন কিন্তু আমার ভালো লাগেনি। তারপর এইটা লেখা হলে সবাই পছন্দ করেন। মতিন রহমান আমাকে বলেছিলেন, ‘এটা আপনি স্বজ্ঞানে লিখতে পারেন না। এটা আপনি কোনোভাবে প্রাপ্ত। ’ আমি বললাম যে না, ‘স্বজ্ঞানেই লেখা। ’

 

এত সুখ সইব কেমন করে

কথা   :    মোহাম্মদ রফিকুজ্জামান

কণ্ঠ   :    নিলুফার ইয়াসমীন

ছবি   :    শুভদা (১৯৮৬)

পরিচালক     :    চাষী নজরুল ইসলাম

লিপসিং      :    জিনাত

মোহাম্মদ রফিকুজ্জামান

১৯৮৫ সালের কথা। খোন্দকার নূরুল আলম ভাইয়ের ধানমণ্ডির বাড়িতে গানটি নিয়ে বসেছিলাম। সঙ্গে ছিলেন পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম ও তাঁর দুজন সহকারী। এই ছবির নায়িকা জিনাতের চরিত্রটি ভীষণ কষ্টের। রাজ্জাকের সঙ্গে সম্পর্ক। বিধবা হওয়ার কারণে সেই সম্পর্কেও অনেক বাধা। একদিন আত্মহত্যা করতে যায় জিনাত। সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে আনেন জমিদার বুলবুল আহমেদ। রূপ দেখে তাকে নিজের কাছে রেখে দেন। জমিদারের স্ত্রী ছিল না। স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে না পারলেও তাকে স্ত্রীর চেয়েও বেশি ভালোবাসতে থাকেন। হঠাৎ এত সুখ পাওয়া মেয়েটির অনুভূতি কী হতে পারে, সেটা ভাবতে গিয়েই প্রথম লাইনটি মাথায় আসে। তারপর সবাই পছন্দ করলেন। গানটি গাওয়ার কথা ছিল সাবিনা ইয়াসমীনের। গাইতে এসে গানটি শুনে তিনি বললেন, ‘এই গানটি আমি এত ভালো গাইতে পারব না। নিলুফারকে দিয়ে গাওয়ালে ভালো হবে। ’ এমন উদারতার জন্য আমরা সবাই তাঁকে ধন্যবাদ দিলাম। এরপর নিলুফার গাইতে আসেন। গানটি গাইতে অনেকবার মনিটর দিতে হয়েছে। ছবির চিত্রায়ণের সঙ্গে গানটি এমনভাবে মিলে গেল, দেখলে চোখে পানি চলে আসে!

অনুলিখন : রবিউল ইসলাম জীবন



সাতদিনের সেরা