kalerkantho

বুধবার । ২ আষাঢ় ১৪২৮। ১৬ জুন ২০২১। ৪ জিলকদ ১৪৪২

সহকর্মীদের কথা

তিনি ছিলেন আপসহীন

১১ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



তিনি ছিলেন আপসহীন

রাইসুল ইসলাম আসাদ

গতকাল বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ৬টায় প্রয়াত হয়েছেন ওপার বাংলার বিখ্যাত পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। তাঁর সিনেমায় অভিনয় করেছেন বাংলাদেশের রাইসুল ইসলাম আসাদগুলশান আরা চম্পা। প্রয়াত পরিচালকের স্মৃতিচারণা করেছেন তাঁরা

 

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত ছিলেন একজন কবি ও শিক্ষক। তাঁর ছবিগুলোর প্রতিটির বিষয়বস্তু দেখলে বোঝা যাবে তিনি কত বড় মাপের পরিচালক ছিলেন! বুদ্ধদেবকে আমি চিনতাম বেশ আগে থেকেই। কিন্তু তিনি আমাকে চিনেছিলেন গৌতম ঘোষের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ ছবি দিয়ে। আরো বেশি চিনেছিলেন ‘পতঙ্গ’ ছবির মাধ্যমে। এই ছবির যে মেকআপম্যান (নাম মনে নেই) ছিলেন তিনিই আমার কথা বলেছিলেন বুদ্ধদেবকে। তখন ‘লাল দরজা’ ছবির প্রি-প্রডাকশনের কাজ করছিলেন তিনি। এরপর ঢাকায় এসে আমার খোঁজ নিলেন। আমি তখন হোতাপাড়ায় এ জে মিন্টুর একটি ছবির শুটিং করছি। প্রযোজক হাবীব খান আমাকে ফোন দিলেন। ‘লাল দরজা’র কথা বললেন। আমি ঢাকায় এসে বুদ্ধদেবের সঙ্গে দেখা করলাম। চরিত্র সম্পর্কে জানলাম। কিন্তু একজন ডেন্টিস্টের ড্রাইভারের চরিত্রটি আমার অতটা ভালো লাগল না। আমি ‘না’ করে দিলাম। তিনি কারণ জানতে চাইলে বললাম, একে তো কলকাতায় শুটিং, তার ওপর ড্রাইভিং—ঢাকা হলে একটা কথা ছিল, আমি তো কলকাতার রাস্তাঘাটে অভ্যস্ত নই। বুদ্ধদেব আমাকে সময় দিলেন। শেষ পর্যন্ত কলকাতায় গিয়ে ট্রেনিং নিয়ে তবে শুটিং শুরু করেছিলাম।

বুদ্ধদেব পরিচালক হিসেবে আপসহীন ছিলেন। কোনো দৃশ্যে ছাড় দিতেন না। মনে আছে, ‘লাল দরজা’র ডেন্টিস্টের চেম্বার দেখাতে হবে একটা ব্যস্ত এলাকায়। সেটা কলকাতার বড় বাজার ছাড়া সম্ভব নয়। তিনি তখন শহরের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বললেন। তাঁরা মানলেন না। কারণ বড় বাজার এলাকাটা আধাঘণ্টার জন্য আটকে রাখলে পুরো কলকাতা অচল হয়ে যাবে। বাধ্য হয়ে তিনি সেট নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিলেন। সেটও পড়ল। কিন্তু তিনি সেট দেখে হতাশ। পাণ্ডুলিপি অনুযায়ী সেট হয়নি। শেষ পর্যন্ত আবার প্রশাসনের সঙ্গে বসে অনুমতি নিয়ে তবে বড় বাজারে শুটিং করেন। আরো একটি উদাহরণ দিই, ‘উত্তরা’ ছবির শুটিং হচ্ছে পুরুলিয়া। কয়েকটি দৃশ্যের জন্য সেখান থেকে প্রায় শত কিলোমিটার দূরে যেতে হবে। সময় মাত্র এক দিন। তড়িঘড়ি করে ইউনিট রওনা হলো। অথচ মাত্র দুটি দৃশ্য বাকি থাকতে বৃষ্টি নামল। বুদ্ধদেব জানালেন, আজ নয়, পরের দিন বাকি অংশের শুটিং হবে। পরের দিন একইভাবে আমরা সেখানে পৌঁছালাম। চিত্রগ্রাহক জানালেন, তাপমাত্রা আগের দিনের চেয়ে কম। ফলে আগের দিনের ধারণকৃত দৃশ্যের সঙ্গে আজকেরটা মিলবে না। বুদ্ধদেব কোনো কিছু না ভেবেই বললেন, ‘আগের দিনের ফুটেজ বাদ, আজ আবার পুরোটা নাও।’

আমাদের মধ্যে সম্পর্কটা ছিল বন্ধুত্বের। শেষ ২০১৯ সালে কলকাতা গিয়েও টেলিফোনে তাঁর সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলেছি। তিনি অসুস্থ ছিলেন বলে বাসায় যেতে পারিনি। আর শেষ দেখাটাও হলো না। এমন গুণী পরিচালক হারানোর কষ্টটা একজন অভিনেতার কাছে পাথর সমান। আমি তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি।

 

একটি ছবিই আমার কাছে হাজার ছবির মতো

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত অনেক বড় মাপের একজন পরিচালক। আমি তাঁকে আগে থেকেই চিনতাম। একবার দিল্লি চলচ্চিত্র উৎসবে তিনি সভাপতি ছিলেন। সন্দীপ রায়ের পরিচালনায় আমার ‘টার্গেট’ ছবিটা ওই উৎসবে প্রদর্শিত হয়।  ভেবেছিলাম অনেক ছবির ভিড়ে আমাকে তিনি মনে নাও রাখতে পারেন। তবে কিছুদিনের মধ্যেই আমার সেই ধারণা বদলে গিয়েছিল। একদিন আমার বাসার ল্যান্ডফোনে একটি কল এলো। রিসিভ করতে অন্য প্রান্ত থেকে নিজের পরিচয় দিলেন বুদ্ধদেব দাদা। আমাকে দিদি সম্বোধন করে বললেন, “আমি ‘লাল দরজা’ নামে একটি ছবি করব। আপনাকে নিতে চাই। যদি আপনি রাজি হন তাহলে সংবাদ সম্মেলনে আপনার নাম জানাতে চাই।’ আমি তো অবাক—তাঁর মতো পরিচালক অডিশন না নিয়ে, কোনো রকম হোমওয়ার্ক না করিয়ে একবারে চূড়ান্ত করছেন! আগুপিছু না ভেবে বললাম, ‘দাদা, আমি রাজি।’

শুটিংয়ের নানা স্মৃতি এখনো চোখে ভাসে। একদিন গুরুত্বপূর্ণ একটি দৃশ্যের শুটিং হবে। আগে থেকে আমাকে আলাদা ঘরে রাখা হয়েছে। লাইটের কাজ চলছে, বুদ্ধদেব দাদা একমনে পাণ্ডুলিপি দেখছেন। এর মধ্যে হঠাৎ আমার পরিচিত একজন এলেন দেখা করতে। তাঁকে পেয়ে আমি হাসি-ঠাট্টায় মেতে উঠলাম। হৈ-হল্লার শব্দ পেয়ে দাদা এলেন। আমাকে অনেক বকা দিলেন। বললেন, ‘যখন গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য করবে তখন সেটার মধ্যেই ডুবে থাকবে। তোমার ধ্যান-জ্ঞান সেটা নিয়েই হবে। কেন তোমাকে আলাদা রুমে রেখেছি সেটা বোঝনি?’ দাদাকে কখনো এতটা রাগতে দেখেনি। তাঁর চাওয়া বুঝে গেলাম। এরপর যেকোনো দৃশ্য করার আগে দাদার কথা মনে রেখেছি। তাঁর শেখানো পদ্ধতি অনুসরণ করার চেষ্টা করেছি।

‘লাল দরজা’ করতে করতে আমরা খুব আপন হয়ে গিয়েছিলাম। আমার ও দাদার মেয়ে একসঙ্গে কানাডায় পড়ত। সেদিক থেকেই একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। দাদার সঙ্গে নিয়মিত ফোনে কথা বলেছি। তিনি দেখতে যেতে বলেছেন। অথচ সকাল বেলায়ই শুনলাম দুঃসংবাদ। হয়তো দাদার পরিচালনায় একটি ছবিতে কাজ করেছিলাম, কিন্তু এই একটি ছবিই আমার কাছে হাজার ছবির মতো। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি।