kalerkantho

রবিবার। ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৬ মে ২০২১। ০৩ শাওয়াল ১৪৪২

সহকর্মীদের কথা

মিষ্টি মেয়ের প্রস্থান

করোনাভাইরাসের কাছে হেরে গেলেন বাংলা চলচ্চিত্রের ‘মিষ্টি মেয়ে’ খ্যাত সারাহ বেগম কবরী। গতকাল প্রথম প্রহরে চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। কিংবদন্তি এই অভিনেত্রীর স্মরণে পূর্ণপৃষ্ঠার এই আয়োজন

১৮ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মিষ্টি মেয়ের প্রস্থান

মিষ্টি হাসিটাই ছিল তাঁর তলোয়ার

মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা

নায়ক হিসেবে আমার প্রথম ছবি ‘মাসুদ রানা’। নতুন নায়ক তার ওপর প্রযোজক ও পরিচালক, যদিও আমার প্রথম প্রযোজিত ছবি ‘ওরা ১১ জন’ সফল। পরিচালক ও নায়ক হিসেবে কেমন করব, সেটা নিয়ে অনেকের মাথাব্যথা শুরু হয়ে গেল। তখনকার ব্যস্ত নায়িকারা আমাকে বেশ ঘোরাতে লাগল। শেষ পর্যন্ত কবরীর কাছে গেলাম। তিনি একবাক্যে রাজি হলেন। তাঁর এই সাহসিকতায় সেদিন মুগ্ধ হয়েছিলাম। কবরী কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিকভাবে খুব বেশি পড়াশোনা করেননি। তিনি ছিলেন স্বশিক্ষায় শিক্ষিত। তিনি যখন রাজনৈতিক বক্তব্য দিতেন মনোমুগ্ধ হয়ে শুনতাম। সামাজিক, অর্থনৈতিক, আন্তর্জাতিক—কোন বিষয়ে তিনি জানতেন না! শুটিংয়ের অবসরে আমার সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতেন। নির্মাতা, চিত্রনাট্যকারদের কাছে যেচে গিয়ে খুঁটিনাটি জানতে চাইতেন। এই জ্ঞানপিপাসাই তাঁকে সংসদ সদস্য পর্যন্ত বানিয়েছে। সমসাময়িক অন্য নায়িকাদের চেয়ে তাঁর এগিয়ে থাকার প্রধান কারণ সৌন্দর্য। তিনি সাদা ধবধবে ছিলেন না, ছিলেন না ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি লম্বা। শরীরের গঠনও হালকা-পাতলা ছিল না। তাঁকে দেখলেই মনে হতো পাশের বাড়ির সেই মেয়েটি। মিষ্টি হাসিটাই ছিল তাঁর তলোয়ার। আজ কবরী নেই ভাবতে খারাপ লাগলেও দিন শেষে তো এটাই সত্যি। মেনে নিতে হবে। আমি আমার প্রথম নায়িকার আত্মার শান্তি কামনা করছি।

 

প্রথমে বিশ্বাস করিনি

ফরিদা আক্তার ববিতা

কবরী আপা এত দ্রুত আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন ভাবতেই পারিনি। বেশ কিছু আনন্দঘন মুহূর্ত আর স্মৃতি আছে তাঁর সঙ্গে। একবার মস্কো ফিল্ম ফেস্টিভালে গিয়েছিলাম আমরা। সঙ্গে রাজ্জাক ভাইসহ আরো অনেকে ছিলেন। আমার আর কবরী আপার থাকার জন্য একটি রুম বরাদ্দ হলো। দুজনই মেনে নিলাম। রাতে কিসের ঘুম! দুজন গল্পে মেতে উঠতাম। বিভিন্ন ছবির সেটে কে কী করত, তা নিয়ে হাসাহাসি করতাম। আজ সব স্মৃতি। কবরী আপা আমাকে ছোট বোনের মতো আদর করতেন। তিনি যখন সংসদ সদস্য, আমি গাজী জাহাঙ্গীরের ‘রাজা সূর্য খাঁ’ নামের একটি ছবিতে চুক্তিবদ্ধ হলাম। পরিচালক আবদার করলেন আমার সঙ্গে কবরী আপা থাকলে ভালো হতো। সঙ্গে সঙ্গে ফোন দিলাম আপাকে। তিনি রিসিভ করতেই এপাশ থেকে বললাম, একটি অনুরোধ আছে। রাখতে হবে। তিনি বললেন, ‘কী।’ আমি বললাম, ‘রাজা সূর্য খাঁ’ নামে একটি ছবি হচ্ছে। আমি অভিনয় করছি। আমার সঙ্গে আপনাকেও চাই। তিনি ‘না’ করতে পারলেন না। সংসদ অধিবেশনের শিডিউলের সঙ্গে মিলিয়ে সময় দিলেন। ছবিটিও নির্মিত হলো। গতকাল (১৭ এপ্রিল) ভোররাতে সাহরি খেতে উঠলাম, হঠাৎ একটি মেসেজ এলো মোবাইলে। দেখলাম, কবরী আপা আর নেই। বিশ্বাস করিনি। কারণ এর আগে এ টি এম শামসুজ্জামান থেকে ফারুক ভাই—সবারই তো মৃত্যু গুজব ছড়িয়েছে। কিন্তু নামাজ পড়া শেষে টিভি চালু করে দেখি সত্যি কবরী আপা আর আমাদের মাঝে নেই! এটি মেনে নেওয়া অসম্ভব। ‘রাজা সূর্য খাঁ’ ছবির সেটে প্রতিদিন টিফিন ক্যারিয়ারে করে আপা খাবার আনতেন, আমাদের খাওয়াতেন। কত না আপন ছিলেন। বাংলা চলচ্চিত্রের মিষ্টি মেয়ে খ্যাত কবরী শেষ পর্যন্ত সবাইকে দুঃখ দিয়ে চলে গেলেন। আল্লাহ তাঁকে বেহেশত নসিব করুন।

 

তিনি বাংলার নারীদের প্রতীক

সুবর্ণা মুস্তাফা

ছোটবেলা থেকেই কবরী ম্যাডামের সঙ্গে আমার পরিচয়। আমাদের বাসায় আসতেন। বাবাকে খুব সম্মান করতেন। আমার দেখা মতে বাংলাদেশের রুপালি পর্দায় তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁকে দেখে শিখবে। মারা যাওয়ার পরও তিনি চলচ্চিত্রের ইনস্টিটিউট হয়ে থাকবেন। কবরী ছিলেন এককথার মানুষ। তাঁর সিদ্ধান্ত থেকে আজ পর্যন্ত কেউ সরাতে পারেনি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে কবরীর অবদান অবিস্মরণীয়। তিনি ভারতে গিয়ে মানুষকে বুঝিয়েছেন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংসতার কথা, বর্বরতার কথা। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে পথ চলেছেন। এই সময় সুবিধাবাদী অনেকেই দল পরিবর্তন করেছেন। কবরী আপা লোভহীনভাবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শেই ছিলেন। তিনি শুধু অভিনেত্রী নন, সারা বাংলার নারীদের প্রতীক। এমন প্রতিবাদী নারী পাওয়াটা খুব কঠিন। আমার কাছে মনে হয়েছে, আগামী দশ প্রজন্মেও আরেকজন কবরী আসবেন না বাংলা চলচ্চিত্রে। আমরা এক অমূল্য সম্পদ হারালাম। তিনি ‘এই তুমি সেই তুমি’ ছবির শুটিং শুরু করার আগে থেকেই আমার সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন। ছবিটি নিয়ে দারুণ আশাবাদী ছিলেন। শুটিংও প্রায় শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন; কিন্তু ছবিটি আর দেখে যেতে পারলেন না। এই অতৃপ্তিটা হয়তো তাঁর রয়ে যাবে। আমি তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি।