kalerkantho

বুধবার । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

অর্জিত হয়নি লক্ষ্যমাত্রা

নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা এখনো অধরা

♦ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার হলে বাড়বে উৎপাদন
♦ ডিজেল ও বৈদ্যুতিক সেচ পাম্পগুলো সোলারে কনভার্ট করার পরামর্শ

সজীব আহমেদ   

১৪ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা এখনো অধরা

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা এবং একই সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব দিচ্ছে বিশ্বের উন্নত দেশগুলো। এরই মধ্যে অনেক দেশ ব্যবহৃত জ্বালানির ৩০ শতাংশ পর্যন্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে জোগান দিচ্ছে। বাংলাদেশে গত এক যুগে বিদ্যুৎ খাতে অভাবনীয় সাফল্য এলেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন একেবারেই সামান্য।

বর্তমানে দেশে সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ২৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি।

বিজ্ঞাপন

এর মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৯০৯.১৯ মেগাওয়াট, যা সর্বমোট সক্ষমতার প্রায় ৪ শতাংশেরও কম। এদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ২০২১ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ১০ শতাংশে (২৪৭০ মেগাওয়াট) পৌঁছানোর লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও কিছু সীমাবদ্ধতায় লক্ষ্য অর্জিত হয়নি বলে জানান বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, অর্জন করা গেছে তার এক-তৃতীয়াংশ। ফলে আর্থিক ক্ষতি যেমন হচ্ছে, বাড়ছে তেমনি পরনির্ভরশীলতা। নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে সরকারের নীতি-পরিকল্পনায় বদল আনতে হবে। একই সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।

টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৯০৯.১৯ মেগাওয়াট, যা দেশে মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ৪ শতাংশেরও কিছু কম। এর মধ্যে শুধু সৌরশক্তি থেকেই উৎপাদন হচ্ছে ৬৭৫.২ মেগাওয়াট, যা মোট নবায়নযোগ্য জ্বালানির ৭৪ শতাংশ। এ ছাড়া হাইড্রো থেকে ২৩০ মেগাওয়াট, বায়ু থেকে আসছে ২.৯ মেগাওয়াট, বায়োগ্যাস থেকে আসছে দশমিক ৬৯ মেগাওয়াট ও বায়োম্যাস থেকে আসছে দশমিক ৪ মেগাওয়াট।

জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ফসলের জমি ক্ষতি না করেও নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে সোলারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। আমাদের সেই প্রযুক্তি ব্যবহারের দিকে যেতে হবে। ’

তিনি বলেন, ‘যেহেতু আমাদের জায়গার অভাব, সেহেতু আমি মনে করি আমাদের ডিজেল ও বৈদ্যুতিক সেচ পাম্পগুলোকে সোলারে কনভার্ট করা সম্ভব। এতে সেচের মালিক অর্ধেক টাকা দিল আর সরকারের পক্ষ থেকে ভর্তুকি হিসেবে অর্ধেক টাকা দিল। তাহলে এই খাতে বড় ধরনের অগ্রগতি হবে। ’ 

বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ‘দেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সৌর, বায়ু ও পানির মতো উৎসকে কাজে লাগিয়ে চাহিদামাফিক বিদ্যুৎ পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। যদিও বিশ্বের উন্নত দেশগুলো নবায়নযোগ্য শক্তিকে কাজে লাগিয়েই জ্বালানি খাতকে এগিয়ে নিচ্ছে। এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতেও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুতের ঘাটতি পূরণের চেষ্টা চালানো হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্যও পেয়েছে দেশটি। ’

বিদ্যুৎ বিভাগের নীতি ও গবেষণা শাখা পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, ‘দেশে উৎপাদিত বিদ্যুতের ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও তা অর্জন সম্ভব হয়নি। লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ আমাদের পর্যাপ্ত জমি না থাকা। সোলার ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের তেমন কোনো উপায় নেই। তবে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে কাজ করে যাচ্ছি। ’

স্রেডার তথ্য অনুযায়ী, নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এ পর্যন্ত মোট ৪০টির অধিক প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, যার বেশির ভাগই গৃহীত হয়েছে ২০১৭, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের ২৫ জেলায় স্থাপিত সোলার পার্ক থেকে মোট দুই হাজার ১১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। এর মধ্যে রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলায় ৭.৪ মেগাওয়াট, পঞ্চগড় সদর উপজেলায় আট, কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় ২০ ও জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার তিন মেগাওয়াট সক্ষমতার চারটি সোলার পার্কের কাজ শেষ হয়েছে। এর বাইরে ময়মনসিংহে নির্মিত ৫০ মেগাওয়াট সোলার বিদ্যুৎ, এখন পর্যন্ত দেশের বৃহত্তম সোলার পার্কও এরই মধ্যে উৎপাদনে চলে এসেছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে পিছিয়ে পড়ার কারণ উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক সাইফুল হক বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে পিছিয়ে থাকার বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, বিষয়টি নিয়ে কাজ করার জন্য দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে বেশ সময় লেগেছে। ৩০ বছর আগে থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে কাজ শুরু হলেও বাংলাদেশ এটি ২০০৮-১০ সালের দিকে শুরু হয়েছে। গত ১২ বছরে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ভালো ধারণা ও দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে সময় লেগে গেছে। ’ তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন বিদ্যুৎ বিভাগ ছিল জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। ফলে অন্যান্য উৎসকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এখনো বেশ কঠিন। তা ছাড়া এই প্রযুক্তি থেকে বিদ্যুৎ পাওয়ার জন্য যেসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার হতো, সেগুলো ছিল উচ্চমূল্যের। এখন দাম কমে এসেছে, ফলে এখন বিনিয়োগ হচ্ছে। ’



সাতদিনের সেরা