kalerkantho

শুক্রবার । ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৫ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

বাড়িটাই জাদুঘর

একুশে পদকপ্রাপ্ত আইনজীবী এস এম আব্রাহাম লিংকন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে অনেক দুর্লভ স্মারক সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করেন। সেই সুবাদে কুড়িগ্রামে তাঁর নিজ বাড়িটিই হয়ে উঠেছে জাদুঘর। এখন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ১৬ শতক জমির ওপর নির্মিত হচ্ছে উত্তরবঙ্গ জাদুঘরের নতুন ভবন। দেখে এসেছেন আব্দুল খালেক ফারুক

৯ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বাড়িটাই জাদুঘর

জাদুঘরের স্মারক দেখাচ্ছেন এস এম আব্রাহাম লিংকন। ছবি : লেখক

বাইরে থেকে দেখে মনে হবে—এটা শুধুই বসতবাড়ি। ভুল ভাঙবে ভেতরে গেলে। বাড়ির ভেতরে জমে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস আর ঐতিহ্যের প্রায় ছয় হাজার স্মারক। শোবার ঘর, ড্রয়িংরুম, বারান্দা, করিডরজুড়ে থরে থরে সাজানো নানা মূল্যবান দলিল ও স্মারক।

বিজ্ঞাপন

বাড়িটি একুশে পদকপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব আব্রাহাম লিংকনের।

 

কেন গড়লেন জাদুঘর

আব্রাহাম লিংকন বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাংলা একাডেমির সঙ্গে গবেষণা করার সময় বেশ কিছু বিরল জিনিসপত্র হাতে আসে। ভাবলাম, এগুলো জাতির সামনে উন্মোচন করা দরকার। আমার একটা অভিমানের জায়গা ছিল, সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত তাজুল ইসলাম চৌধুরীর বাবা পনির উদ্দিন আহমেদ কুড়িগ্রামের মহকুমা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। তাজুল নিজেও স্বাধীনতাবিরোধী। বেশ কিছু ডকুমেন্ট তৈরি করে তাঁর বাবাকে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক বানানোর চেষ্টা করেছিলেন। অথচ তাঁর বাবা ১৯৭৩ সালে দালাল আইনে গ্রেপ্তার হয়ে জেল খাটেন। ইতিহাস বিকৃতির এই চেষ্টা দেখে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। সেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে একটি জাদুঘর গড়ে তোলার স্বপ্ন জাগে, যাতে মানুষ সঠিক ইতিহাস জানতে পারে। ’

 

রাতে বাড়ি, দিনে জাদুঘর

আব্রাহাম লিংকনের স্ত্রী নাজমুন নাহার সুইটি। পেশায় কলেজ শিক্ষক। প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনের কর্মী ছিলেন। আব্রাহাম লিংকন জাদুঘর করার উদ্যোগ নিলে সানন্দে সায় দেন তিনি। স্বামী-স্ত্রীর নিবিড় তত্ত্বাবধানে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে জাদুঘরটি। এখন তাঁদের বাড়িতে আলাদা করে কোনো শোবার ঘর নেই। দিনে দর্শনার্থীরা বাড়ির সদরে-অন্দরে ঘুরে ঘুরে স্মারকগুলো দর্শন করে। রাতে দেয়ালে, বেডের পাশে নানা স্মারকে ভরা জাদুঘরের কক্ষ হয়ে ওঠে এই দম্পতির শোবার ঘর।

 

সংগ্রহ বাড়ছে দিনে দিনে

প্রতিনিয়ত নতুন নতুন স্মারক ও দলিল যুক্ত হচ্ছে ব্যতিক্রমী এই জাদুঘরে। এখন প্রায় ছয় হাজার স্মারক ও মূল্যবান দলিল রয়েছে। কুড়িগ্রাম জেলার চার হাজার মুক্তিযোদ্ধার লাল কালিতে হাতের ছাপ, তাঁদের পরিচিতি, স্বাক্ষরসহ যাবতীয় তথ্য রয়েছে এখানে। রয়েছে বিভিন্ন দেশের মুদ্রা, বিরল স্থিরচিত্র, একাত্তরে ব্যবহৃত গুলি, সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক, বীরপ্রতীক তারামন বিবি ও কমরেড ফরহাদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র, লেখা, ডায়েরিসহ অনেক মূল্যবান স্মারক। আব্রাহাম লিংকন জানান, এই জাদুঘরে ৬ ও ১১ নম্বর সেক্টরের উল্লেখযোগ্য ঘটনা ও চরিত্রগুলোকে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। এখানে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের যুদ্ধাস্ত্র, ভারতীয় সেনাবাহিনীর অধিনায়ক জেনারেল মানেকশ বিজয়ের আগে পাকিস্তানি সৈন্যদের অস্ত্র সমর্পণের আহ্বান জানিয়ে বিমান থেকে যে লিফলেট ছড়িয়ে দেন তার একটি কপি রয়েছে এখানে। এটি উর্দু ও পশতু ভাষায় প্রচারিত হয়। রাজাকারে যোগদানের আবেদন, যুদ্ধ শেষে ক্ষমার আবেদন, হিন্দু সম্পত্তি আত্মসাৎ বা ভাগ-বাটোয়ারাসংক্রান্ত দলিলসহ স্বাধীনতাবিরোধীদের ন্যক্কারজনক ভূমিকার বেশ কিছু বিরল দলিলও আছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ১১ নম্বর সেক্টরের মুক্তাঞ্চল ছিল রৌমারী, যেখানে প্রতিষ্ঠা করা হয় স্বাধীন বাংলার প্রথম আদালত। আদালতে ব্যবহার্য কাগজপত্রসহ এসংক্রান্ত কিছু দলিল ও কাগজপত্রও আছে। তালপাতায় লেখা চণ্ডীমঙ্গল কাব্য, সামন্ত যুগের তলোয়ার, ১৮১৬ সালের ১৪ হাত লম্বা কুষ্টিসহ নানা কিছু রয়েছে। এরই মধ্যে জাদুঘর ঘুরে গেছেন ভারত, সুইডেন ও আমেরিকার রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকরা।  

 

যেতে হয়েছে বহুদূর

স্মারকগুলো সংগ্রহে ঘাম ঝরেছে আব্রাহাম লিংকনের। কোথাও কোনো মূল্যবান স্মারক আছে শুনলেই ছুটে গেছেন। কখনো অর্থের বিনিময়ে নিতে হয়েছে, কখনো বিনা মূল্যে মানুষ দিয়েছে মূল্যবান স্মারক। তিনি জানালেন, গবেষণাকাজে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে দেশের নানা প্রান্তে যেতে হয়েছে। তখন থেকেই স্মারকগুলো হাতে আসতে শুরু করে। ২০১০ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাস : রংপুর’, রঙ্গপুর গবেষণা পরিষদের ‘রঙ্গপুরের মুক্তিযুদ্ধ ও রঙ্গপুরের বরেণ্য ব্যক্তিত্ব’,

‘১৯৭১ : ইপিআরের বরেণ্য যোদ্ধাগণ’, ‘মুক্তিযুদ্ধের কিশোর ইতিহাস : কুড়িগ্রাম’, ‘উত্তর রণাঙ্গনে সংখ্যালঘু গণহত্যা ও নারী নির্যাতন’, ‘একাত্তরের অগ্রদূত’ ইত্যাদি পুস্তকের কাজ করতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক স্মারকের সন্ধান পান।

শুরুতে কুড়িগ্রামের ‘শেকড়’ নামের একটি সংগঠনের কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত গ্রেনেড পান। রৌমারী হাই স্কুল থেকে পান সাইক্লোস্টাইল মেশিন। স্বাধীন বাংলার পতাকা বানানোর কাজে ব্যবহৃত একটি সেলাই মেশিনও আছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ১১ নম্বর সেক্টরের মাইনকার চর সাব-সেক্টর থেকে প্রকাশিত হতো সাপ্তাহিক অগ্রদূত নামের একটি হাতে লেখা পত্রিকা। এতে যুদ্ধের খবর, সম্পাদকীয়, সাহিত্য, স্থানীয় খবরসহ নানা বিষয় স্থান পেত, যা সাইক্লোস্টাইল করে ছড়িয়ে দেওয়া হতো রণাঙ্গনসহ বিভিন্ন এলাকায়।

এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন আজিজুল হক মাস্টার। রৌমারী থেকে পত্রিকার সম্পাদক আজিজুল হক ও তাঁর ছেলে মামুন ইকবালের কাছ থেকে অগ্রদূতের সব কপি পেয়ে যান। তানভীর মোকাম্মেলের মধ্যস্থতায় শিল্প নির্দেশক উত্তম গুহের কাছ থেকে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে গণহত্যার শিকার মানুষের কিছু হাড়গোড় সংগ্রহ করেন। বন্ধু মাহমুদা কামাল পিনুর সহায়তায় ফরিদ কামাল অপুর কাছ থেকে জেনারেল মানেকশর পাকিস্তান আর্মির আত্মসমর্পণের প্রচারপত্রটি পান। কুড়িগ্রামের অ্যাডভোকেট মাহফুজুল হক ছিলেন রৌমারীর মুক্তাঞ্চলে স্থাপিত আদালতের আইনজীবী। তাঁর ছেলে ইউনুছ চৌধুরী পাখির কাছ থেকে সংগ্রহ করেন সেই আদালতের দলিলপত্র। রাজারহাটের পণ্ডিত অনিল ভাদুড়ীর ভাতিজা পঙ্কজ ভাদুড়ীর কাছ থেকে পান গাছের বাকলে লেখা চণ্ডীমঙ্গল কাব্য। সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের ব্যবহার্য বেশ কিছু সামগ্রী জাদুঘরে প্রদান করেন আনোয়ারা সৈয়দ হক। তারামন বিবির ছেলে ও স্বামী তাঁর চেক, পাসপোর্ট ও কাপড়চোপড় প্রদান করেন। প্রখ্যাত রাজনীতিক কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদের স্ত্রী রিনা খানম ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক মূল্যায়ন নিয়ে কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদের লেখা কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক দলিল, ঢাকা জেলে আটক অবস্থায় লিখিত ডায়েরি, ব্যবহার্য সামগ্রীসহ নানা মূল্যবান স্মারক জাদুঘরে প্রদান করেন। শুধু পরিচিতজনদের কাছ থেকে নয়, আদালতের মাধ্যমেও কিছু স্মারক পেয়েছেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি আমলের পয়সা, দুর্লভ নন্দীমূর্তি, মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের ৭১টি বাতিল গুলি পান এভাবে।

 

জাদুঘর যাচ্ছে নতুন ঠিকানায়

কিছুদিন আগে জাদুঘরটির জন্য বাড়ির পাশে ১৬ শতক জমি দান করেছেন আব্রাহাম লিংকন। সেখানেই মুক্তিযুদ্ধবিয়ষক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে এলজিইডির তত্ত্বাবধানে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে নান্দনিক ভবন। আব্রাহাম লিংকন চান তাঁর মৃত্যুর পরও যেন এই জাদুঘরের কার্যক্রম চলে আপন গতিতে। বললেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুলনা গণহত্যা জাদুঘরকে একটি স্থায়ী তহবিল দিয়েছেন। যার লাভ দিয়ে সেটি চলতে থাকবে। এ ধরনের একটি তহবিল দিলে এই জাদুঘর আর কখনো বন্ধ হবে না। ’

 

বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. শওকত আলী সরকারের হাতের ছাপ

 

হাতে লেখা অগ্রদূত পত্রিকার কপি

 

সৈয়দ শামসুল হকের ব্যবহৃত জিনিসপত্র

 

পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের জন্য প্রচারপত্র



সাতদিনের সেরা