kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২ জুন ২০২০। ৯ শাওয়াল ১৪৪১

২৫ মার্চ : সুনামগঞ্জ সদর

সংবাদকর্মী শামস শামীম ২৫ মার্চ ঘুরেছেন সুনামগঞ্জ শহরের এমাথা-ওমাথা

৩১ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



২৫ মার্চ : সুনামগঞ্জ সদর

চার-পাঁচ দিন ধরে তাঁর কোনো আয় নেই

পুবের জানালা খুলে দিতেই বিছানায় এসে পড়ল ভোরের আলো। হাওরের ধানিজমি ভরাট করে বাড়িওয়ালা দেড় দশক আগে তৈরি করেছেন এ বাড়ি। বাড়িওয়ালাদের সবাই ইতালিপ্রবাসী। এখন সেখানে হোম কোয়ারেন্টিনে আছেন। বাড়ির লাগোয়া হাওরের কিছু ধানিজমি এখনো অবশিষ্ট আছে। সেই জমির কিনারে নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে থাকা লাটিমগাছে দুটি ফিঙ্গে ঠায় বসে আছে। লেজও নাড়ছে না তারা। যেন এক শব্দহীন রোদনকাল অতিক্রম করছে।

 

করিমের গান

বিছানা থেকে উঠে প্রথমে ফোন দিলাম বাড়িতে। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ৭৭ বছর বয়সী মা মাইল্ড স্ট্রোক করেছেন। হার্টেরও সমস্যা আছে। খোঁজ নিয়ে জানলাম, ভালোই আছেন। তারপর দাঁত মেজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশ ও বিদেশের করোনাযুদ্ধে কিছুক্ষণ চোখ রাখলাম। এর মধ্যেই ফোন দিলেন শাহ আবদুল করিমের শিষ্য বাউল লাল শাহ। শহুরে জীবনের খবর নিলেন। জানালেন, গ্রামের মানুষ এ নিয়ে সাবধান বা সচেতন না হলেও এক অজানা আশঙ্কায় আছে। তারপর করিমেরই একটি গান—‘কত কথা মনে পড়ে, গ্রামবাংলায় যা দেখছি ঘরে ঘরে, গরিব বাঁচবে কেমন করে...’ শুনিয়ে ফোন রেখে দিল।

 

এখন সকাল সাড়ে ৯টা

ছেলে লৌকিকের ঘুম ভাঙল। বয়স তাঁর চার মোটে। অভ্যেস মতো কেঁদে কেঁদে মাকে ডাকল। বেচারা নিরীহ স্কুল শিক্ষক তখন রান্নাঘরে। এই সংকটকালে ছুটি পেয়েও বিশ্রাম পায়নি। সোয়া ১০টায় তাহিরপুর সীমান্তে আমার আদিবাসী শ্বশুরবাড়ি থেকে পাওয়া বিরুইন চালের বিরানভাত আর বেগুনভাজি দিয়ে নাশতা সারলাম। তিন-চার দিন ধরেই সাধারণত এক বেলা বেরোচ্ছি। আজ সোয়া ১১টায় বেরোলাম। বেরোনোর আগে হাত ও পায়ে স্পিরিট মেখে নিলাম। ক্যামেরা, মাস্ক ও গ্লাভস নিয়ে মোটর বাইকটা স্টার্ট দিলাম। বাতাস নেই। মাথার ওপরে ঝুম রোদ। বাসার সামনের রাস্তাটি সকাল-বিকাল ছোটদের দখলে থাকত। তারাও এখন গৃহবন্দি। হাজীপাড়া থেকে নতুনপাড়া হয়ে সামান্য স্পিডে ১১০ সিসির বাইকটি খুবই সাবধানে চালাচ্ছি। হাজীপাড়ার পূর্বমাথার মসজিদটার মোড়ে কয়েকজন উঠতি যুবক গল্প করছে দূরত্ব না মেনেই। নতুনপাড়া মোড়ে দেখা গেল কয়েকটি দোকান খোলা। এক-দুইজন ক্রেতাও আছেন ভেতরে। নতুনপাড়া থেকে বাজারমুখী সড়ক ধরে মহিলা কলেজের পেছনের সড়ক দিয়ে চললাম। মহিলা কলেজ গেটে দেখা হলো কলেজজীবনের বন্ধু লিটনের সঙ্গে। মাস্ক মুখে। হাতে আরেকটি মাস্ক ও হেক্সিসল। দুই বন্ধু নিরাপদ দূরত্ব রেখে সড়কেই আড্ডা জুড়ে দিলাম। সে আমার গাড়িতে হেক্সিসল ছিটিয়ে দিল। দেশ লকডাউন না করে লোকদের গ্রামে ফেরার সুযোগ করে দেওয়ায় সে ক্ষোভ প্রকাশ করল।

 

জুনেদকে পেলাম না

বন্ধুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হোসেন বখত চত্বরে গিয়ে দেখি পুলিশ হ্যান্ড মাইকে জনগণকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলছে—‘ঘরে থাকুন, দেশ ও মানুষকে মহামারি থেকে বাঁচান।’

হোসেন বখত চত্বর কয়েক বছর ধরে জেলা শহরের দৃষ্টিনন্দন স্থান। এখানে অনেক মানুষ দিন-রাত আড্ডা দেয়। সেখানে এখন মানুষের উপস্থিতি নেই। সড়ক ধরে দু-একজন মানুষ গন্তব্যে আসা-যাওয়া করছেন। কিছু দূর এগিয়ে হাসপাতাল পয়েন্টে গিয়ে স্বর্ণা ফার্মেসির মালিক বন্ধু জুনেদকে খুঁজলাম। সে তখনো বাসায়। হাসপাতাল চত্বরে ঢুকে পুরনো ও নতুন হাসপাতাল ফোকাসে রেখে কয়েকটি ছবি তুললাম। হাসপাতাল চত্বরেও মানুষ নেই। কিছু শুকনো পাতা গাছের দুঃখ হয়ে নিচে পড়ে আছে। তারপর যাই জেলা পশুসম্পদ হাসপাতালে। করোনাকালে হাওরাঞ্চলে দেখা দিয়েছে নতুন ভাইরাস এলএসডি। তাতে আক্রান্ত হচ্ছে গবাদি পশু। ভারত থেকে যেসব গরু এ দেশে ডুকছে তা থেকে এই ভাইরাস ছড়িয়েছে। তারই খোঁজ নিতে চাইলাম। দেখলাম নিজের টেবিল থেকে তিন ফুট দূরে চেয়ার সাজিয়ে বসে আছেন প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান খান। গরম পানিতে কাপ ধুয়ে রং চা খাওয়ালেন। কিছুক্ষণ গল্প হলো, প্রতিবেদন তৈরির কাজও হলো। বিদায়ের সময় একটি সার্জিক্যাল মাস্ক উপহার দিলেন। নিচে নেমে দেখি একজন নারী দুটি ছাগল ও একজন পুরুষ দুটি গরু নিয়ে আসছেন। গরিব মানুষেরা উপায় না পেয়ে অনেক দূর থেকে হেঁটে হেঁটে আসছেন দাওয়াই নিতে।

 

গেলাম রিভারভিউয়ে

এখানে রাত-দিন পাহাড় আর নদীর মিতালীতে মুগ্ধ হন শত শত নাগরিক। নদীতীরে গিয়ে দেখি কোনো মানুষ নেই। প্রতিটি বেঞ্চ ঝকঝকে তকতকে; কিন্তু বসার কেউই নেই। ১৫ কিলোমিটার দূরের মেঘালয়ের সবুজ পাহাড়ও কেমন নিঝুম, থমকে আছে। কয়েক হাত দূরেই স্থির সুরমা নদীও। অচঞ্চল রিভারভিউ থেকে মুক্তিযোদ্ধা আলফাত চত্বরে গেলাম। এটা বাজার এলাকা। কিছু মানুষের আনাগোনা দেখা গেল। সামনের দোজা মার্কেটে তখন পুলিশ টহল দিচ্ছে। এর মধ্যেই দেখা হলো সংবাদকর্মী বুরহান ভাই ও আকরাম ভাইয়ের সঙ্গে। দেখলাম সুনামগঞ্জ শহরের দুই প্রিয়মুখ অকৃতদার শিক্ষাবিদ সঞ্চিতা চৌধুরী ও জনপ্রতিনিধি আরতি তালুকদার শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে মাস্ক ও হ্যান্ড গ্লাভস বিতরণ করছেন।

 

১টা বাজলে পরে

কিছু বাজার সদাই করতে দাস ব্রাদার্সে ঢু মারব—তখনই দেখি লাঠিতে ভর দিয়ে একজন খোঁড়া ভিক্ষুক রাস্তা অতিক্রম করছেন। তাঁর গায়ে লাল পাঞ্জাবি। ছায়ায় ডেকে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলাম। জানালেন, চার-পাঁচ দিন ধরে তাঁর কোনো আয় নেই। মানুষই নেই যেখানে, ফকিরের হাতে কে দেবে টাকা! দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার মুরাদপুর গ্রামে বাড়ি তাঁর। সরকারের ভিক্ষুক তালিকায় তাঁর নাম নেই। কখনো ভিক্ষুক সহায়তাও পাননি। তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দাস ব্রাদার্সে ঢোকার মুখেই দেখি মালিক ননী দা দাঁড়িয়ে। তাঁর মুখেও মাস্ক। দু-এক মিনিট কথা বলে ভেতরে ঢুকে দেখি ক্যাশবাক্সের সামনে বসা তাঁর বড় ভাই কটি দা। দোকানের চার-পাঁচজন কর্মচারীর সবার মুখেই মাস্ক। ছোট্ট দোকান; কিন্তু অবস্থান শহরের নাভিতে। তাই সব সময়ই ভিড়। কিছু বাজার সদাই করে পাশেই আমার খণ্ডকালীন কর্মস্থল দৈনিক সুনামকণ্ঠ অফিসে গেলাম।

 

তখন দেড়টা বেজে গেছে

সম্পাদক বিজন সেন রায় নিজের চেয়ারে বসে ইউটিউবে শাহ আব্দুল করিমের গান শুনছেন। পাশে সহকারী হাম্মাদ মিয়া। তাঁর চোখও ফেসবুকে। নিউজরুমে ঢুকে দেখি সম্পাদকীয় বিভাগের প্রধান কবি ইকবাল কাগজী চেয়ারে দুই পা তুলে সম্পাদকীয় লিখছেন। সুনামগঞ্জ শহরের প্রথাবিরোধী বুদ্ধিজীবী তিনি। ‘পুঁজিবাদের অভিশাপ করোনাভাইরাস, এখন এই পুঁজিবাদ একে প্রতিরোধ করতে সর্বস্ব নিয়োগ করেও হিমশিম খাচ্ছে।’ বললেন তিনি। দুপুর ২টায় শহরের সবচেয়ে ব্যস্ত এলাকা পুরনো বাসস্টেশন গেলাম। সেখানেও নীরবতা। আরো একটু এগিয়ে গিয়ে দেখি শহরের সবচেয়ে বড় খাবারের দোকান পানসী রেস্টুরেন্ট বন্ধ। পাশের সব বাস কাউন্টারও। সোজা এগিয়ে গেলাম জেলা আদালত পাড়ায়। আইনজীবী সমিতি ভবনের সামনে কয়েকজন আইনজীবী বিচ্ছিন্নভাবে গল্প করছেন। আইনজীবী বন্ধু আব্দুল খালেক চা পানের আমন্ত্রণ জানালে বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করি। দাঁড়িয়েই রাজনৈতিক কিছু বিষয় নিয়ে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। মোটর বাইকে আরো কিছুক্ষণ এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরি করলাম মূলত মানুষের অবস্থা দেখতে। তারপরে বাসার পথ ধরলাম।

ছবি : লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা