kalerkantho

রবিবার । ১৯ জানুয়ারি ২০২০। ৫ মাঘ ১৪২৬। ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

সুখবর বাংলাদেশ

তাঁদের সেবার মন

প্রতি শুক্রবার ঢাকার কেরানীগঞ্জ, সাভার বা কামরাঙ্গীরচরের বিভিন্ন স্কুলে ক্যাম্প করে বিনা মূল্যে রোগী দেখেন ডা. হাবিবুর রহমান ও তাঁর বোন ডা. নাসরীন রহমান। খোঁজ পেয়েছিলেন আলতাফ হোসেন মিন্টু

১০ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



তাঁদের সেবার মন

রোগী দেখছেন ডা. নাসরীন রহমান

ডা. হাবিবুর রহমানের বাড়ি কেরানীগঞ্জের শাক্তা ইউনিয়নের নবাবচর গ্রামে। বাবার নাম মো. আলাদিন মিয়া। বাবার নামে নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেছেন আলাদিন পেইন সেন্টার। দরিদ্র ও অসহায় রোগীদের এখানে বিনা মূল্যে সেবা দিয়ে থাকেন। মেডিক্যাল ক্যাম্প তাঁরা শুরু করেন চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি। প্রতি সপ্তাহে এক শর বেশি রোগী দেখেন তাঁরা। এর মধ্যে এক দিনে ৪৮৮ জন রোগী দেখারও  রেকর্ড আছে। ক্যাম্পগুলোতে শুধু বিনা মূল্যে রোগীই দেখা হয় না, বিনা মূল্যে ওষুধও দেওয়া হয়। এখানে সেবা নিতে আসা রোগীদের কোনো টেস্টের প্রয়োজন হলে প্রথমবার বিনা মূল্যেই করে দেওয়া হয় হাবিবুর রহমানের প্রতিষ্ঠিত আটিবাজার সেন্ট্রাল হাসপাতাল থেকে। দিন কয়েক আগে ৪২তম ক্যাম্প করেছেন কালিন্দী ইউনিয়নের চড়াইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

 

অনেকটা ঈদ আনন্দের মতো

ডা. হাবিব বলেন, প্রতি শুক্রবার ফ্রি রোগী দেখার ক্যাম্প করতে আমার খুব ভালো লাগে। শুক্রবার সকালে যখন ক্যাম্প করার উদ্দেশ্য নিয়ে বাসা থেকে বের হই, তখন অনেকটা ঈদ আনন্দের মতো লাগে। যেখানে বন্ধুবান্ধব ডাক্তারদের প্রায় সবাই প্রতি শুক্রবার বেশি টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন জায়গায় রোগী দেখার জন্য চলে যান, সেখানে আমি আর আমার বোন আরো তিন-চারজন বন্ধু ডাক্তার নিয়ে ফ্রি ক্যাম্প করতে বেরিয়ে পড়ি।  এটা অন্য রকম আনন্দ তৈরি করে। আমি এ আনন্দ কখনোই হারাতে চাই না। যত দিন বেঁচে আছি শুক্রবারের ফ্রি ক্যাম্প চালু রাখব। এ ব্যাপারে কথা হয় হাবিবুর রহমানের ছোট বোন নাসরিন রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রথম প্রথম আমার একটু খারাপ লাগত। ক্যাম্প করতে যেতে চাইতাম না। ভাইয়া (ডা. হাবিবুর রহমান) আমাকে বোঝালেন, আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষ স্বল্প আয়ের। ভালো ডাক্তার তাঁরা দেখানোর সুযোগ কমই পান। তাই আমাদের এগিয়ে যাওয়া দরকার। তা ছাড়া এতে আনন্দও অনেক। রোগী আসে অনেক রকম, অনেক রকম গল্প হয়। মানুষের দোয়া পাওয়া যায়। এর পরও ক্যাম্পে যেতে চাইতাম না। তারপর ভাইয়া যখন ক্যাম্প করে ফিরে এসে বিভিন্ন রোগীর কথা বলতেন, তখন শুনতে ভালো লাগত। এর পর থেকেই ভাইয়ার সঙ্গে ক্যাম্পে যাওয়া শুরু করি। এখন তো শুক্রবার এলে আমিই আগেভাগে ভাইয়াকে গিয়ে বলি—আজ কোথায় ক্যাম্প, যাবে না? শুধু তা-ই নয়, ক্যাম্পের দিন আমি সঙ্গে করে বন্ধুদেরও নিয়ে যাই।

 রোগীদের পরামর্শ দিচ্ছেন ডা. হাবিবুর রহমান

 

যাঁরা সহযোগিতা দেন

ফ্রি ক্যাম্পের প্রথম থেকেই সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে আসছেন মো. মহসিন। তিনি বলেন, আমরা হাবিব ভাইয়ের সহযোগী। হাবিব ভাই যদি গরিব অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়াতে পারেন, আমরাও পারব। ফ্রি ক্যাম্পে সব রকম রোগীকেই সেবা দেওয়া হয়। রোগীদের বিনা মূল্যে ওষুধও দেওয়া হয়। হাবিব ভাই নিজের টাকা খরচ করে অথবা বিভিন্ন মাধ্যম থেকে এসব ওষুধ সংগ্রহ করে থাকেন।

ফ্রি ক্যাম্পের আরেক সহযোগী মো. জসিম উদ্দিনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি এই ফ্রি ক্যাম্পের প্রথম থেকেই আছেন। হাবিব ভাই যেখানে ক্যাম্প করেন, আগে থেকে সেখানে মাইকিং করা হয়। তাই এলাকাবাসী আগে থেকেই জেনে যায় ক্যাম্পের কথা। ভিড়ও হয় অনেক। আমি এই ক্যাম্পের প্রথম থেকেই হাবিব ভাইকে রোগীর সিরিয়াল দিয়ে সহযোগিতা করে আসছি। আমরা ডাক্তার না, তবে ডাক্তারদের সঙ্গে থেকে অসহায় মানুষদের সাহায্য করতে পারলে ভালো লাগে। ক্যাম্পে কাজ করেন তুষার আর সুজনও। স্লিপ দেখে রোগীদের ওষুধ দেওয়ার কাজ করেন তাঁরা।

 

যাঁরা চিকিত্সা নিতে এসেছিলেন

৫০ বছর বয়স্ক নারী মমতাজ জানান, তাঁর অনেক দিনের পুরনো ব্যথা। গরিব মানুষ, ভালো ডাক্তার দেখাতে পারি না। ওষুধও খেতে পারি না। তাই ব্যথা নিয়ে ঘুরে বেড়াই। এখানে ডাক্তার সাহেব বিনা মূল্যে চিকিত্সা দিলেন আবার ওষুধও দিলেন। আমি দোয়া করি যেন তিনি দীর্ঘ হায়াত পান। তাহলে আমাদের মতো গরিব মানুষদের বিনা চিকিত্সায় মরতে হবে না। নাসিমা নামের আরেক নারী শিশুপুত্র নিয়ে এসেছিলেন চিকিত্সা নিতে। বললেন, ‘কয়েক দিন ধরেই বাচ্চাটার জ্বর। ডাক্তার সাহেব ছেলেটাকে দেখে কিছু ওষুধ দিয়েছেন আর কিছু পরীক্ষা করতে দিয়েছেন। বলেছেন আটিবাজার সেন্ট্রাল হাসপাতাল থেকে পরীক্ষাগুলো করাতে। বলে দিয়েছেন, সেখান থেকে পরীক্ষা করালে কোনো টাকা লাগবে না।’ রেশমা নামের আরেক রোগীর সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, বেশ কিছুদিন ধরেই আমার ঠাণ্ডা আর জ্বর লেগে আছে। আমার স্বামী একজন গরিব রিকশাচালক। টাকা খরচ করে ডাক্তার দেখানোর মতো পয়সা নেই। এখানে ক্যাম্পে এলাম, ফ্রি ডাক্তার দেখালাম আবার ওষুধও নিলাম। আমার রোগটা কেন হয়েছে, কী কারণে হয়েছে তা কখনোই জানা হয়নি। আবার কী করলে ভালো হবে, সেটাও জানা ছিল না। এখানে ডাক্তাররা রোগীদের সেই দিকগুলো ধরিয়ে দিচ্ছেন। আমি দোয়া করি, এই ডাক্তার সাহেবরা যেন সারা জীবন অসহায় মানুষদের সেবা দিয়ে যেতে পারেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা