kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

উদ্যমী বাংলাদেশ

হারুন ও আনোয়ারার টুপির কারখানা

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার ছোট্ট গ্রাম মাথাফাটা। হারুন অর রশিদ ও আনোয়ারা পারভীন দম্পতির বাস এ গ্রামেই। তাঁরা গড়ে তুলেছেন একটি টুপির কারখানা। নাম আল ইকরা ক্যাপ ইন্ডাস্ট্রি। তাঁদের তৈরি টুপি দেশের বড় বড় শহরে বিক্রি হচ্ছে। দেখতে গিয়েছিলেন মো. লুৎফর রহমান

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



হারুন ও আনোয়ারার টুপির কারখানা

নিজেদের বানানো টুপি হাতে হারুন ও আনোয়ারা

তেঁতুলিয়া সদর থেকে আজিজনগর হয়ে রণচণ্ডী যাওয়ার রাস্তা। সাড়ে তিন কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলেই মাথাফাটা গ্রাম। শান্ত সুন্দর গ্রামটিতে ঢোকার মুখেই আল ইকরা ক্যাপ ইন্ডাস্ট্রি। খবর পেলাম একসময় এই গ্রামে সাত-আটটি টুপির কারখানা ছিল। এখন শুধু টিকে আছে আল ইকরা। কারখানার ভেতরে ৩০টি সেলাই মেশিন। কাজ করছিলেন হারুন-আনোয়ারাসহ আরো কয়েকজন কারিগর। আল ইকরায় মোট কারিগরের সংখ্যা ৩০ জন। তার মধ্যে ২০ জনই নারী। ঘরজুড়ে সেলাইয়ের শব্দ। একেকজন কারিগর মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেন। জানা গেল, একটি টুপি তৈরিতে সময় লাগে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা। প্রতি মাসে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার টুপি তৈরি হয় আল ইকরায়। ব্যবসায়ীরা দেশের বড় বড় শহরে নিয়ে যান এসব টুপি। ইদানীং ভারতেও রপ্তানি হচ্ছে। টুপিগুলোর নকশা বাহারি, বাতাস চলাচলের জন্য ছোট ছোট ছিদ্র থাকে। দেখতে যেমন, মানেও ভালো। তাই দিন দিন টুপিগুলোর চাহিদা বাড়ছে। লোকেরা এগুলোকে গোল টুপি, এসি টুপি বা ওমানি টুপি নামে ডাকে।

 

শুরুর কাল

মাথাফাটা গ্রামে প্রথম টুপির কারখানা গড়ে তোলেন মাদরাসা শিক্ষক আব্দুল হান্নান। চার বছর পর ১৯৯৬ সালে হারুন অর রশিদ ওই কারখানায় কাজ শুরু করেন। হারুন তখন দশম শ্রেণির ছাত্র। কিন্তু অভাবের কারণে এসএসসি পরীক্ষা দিতে পারেননি। তিন ভাই, এক বোনের মধ্যে দ্বিতীয় হারুন। বাবা মজিবর রহমান রাজমিস্ত্রি ছিলেন। কিন্তু বার্ধক্যের কারণে কাজ আর করতে পারছিলেন না। শেষে সংসার চালানোর দায়িত্ব হারুনকেই নিতে হয়। কারখানায় যোগ দিয়ে প্রথম কয়েক মাস কাজ শেখেন হারুন। তারপর একসময় দক্ষ টুপির কারিগর হয়ে ওঠেন। চার বছর ওই কারখানায় কাজ করেন। তারপর ২০০০ সালে নিজেই দুটি সেলাই মেশিন কিনে টুপি তৈরি শুরু করেন। যাত্রা শুরু করে আল ইকরা ক্যাপ ইন্ডাস্ট্রি। দুজন সহযোগীও ছিল তাঁর। ২০০২ সালে নিজের খরচে ছোট বোন মরিয়ম বেগমকে বিয়ে দেন। নিজে বিয়ে করেন ২০০৫ সালে,  তেঁতুলিয়ার তীরনইহাট ইউনিয়নের ঠুনঠুনিয়া এলাকার আলী হোসেনের মেয়ে আনোয়ারা পারভীনকে। বিয়ের পর স্ত্রীকেও টুপি তৈরির কাজ শেখান হারুন। কয়েক মাসেই দক্ষ হয়ে ওঠেন আনোয়ারা। এরপর স্বামী-স্ত্রী পুরোদমে শুরু করেন টুপি তৈরির কাজ।

 

বড় হয় কারখানা

বেশি টুপি তৈরি করতে পারায় লাভও হতে থাকে বেশি। কারখানাও বড় হতে থাকে। দুটি থেকে ৩০টি মেশিন হয় তাঁদের। টিনশেড আধা পাকা ইটের ঘর পুরো পাকা করেন। নারীদের টুপি তৈরির কাজে উৎসাহিত করেন আনোয়ারা নিজেই। হারুন ও আনোয়ারা দম্পত্তির তিন সন্তান। দু্ই ছেলে, এক মেয়ে। বড় ছেলে আব্দুল্লাহ আল আলিম মাথাফাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। পরের দুজন যমজ আল জুবাইদ হিমেল ও হুমায়রা আক্তার হাফসা। তাদের বয়স তিন বছর।   

 

কারিগরদের কথা

কারিগর আলমাস আলী বলেন, ‘কাজ না থাকায় আগে আমাদের বসে দিন কাটাতে হতো। আল ইকরা ক্যাপ ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ শিখে এখন ১২ মাস কাজ করতে পারছি। মজুরি যা পাই তা দিয়ে সংসার ভালোই চলে যায়। তবে আরো কারখানা গড়ে উঠলে আমাদের মতো আরো অনেক লোক কাজের সুযোগ পাবে।’ কারিগর রাহিমা খাতুন বলেন, ‘সুঁই-সুতার কাজ আগে থেকেই আমি ভালো পারি। আনোয়ারা আপা আমাকে তাঁর কারখানায় কাজ করার জন্য সুযোগ দেন। আমি কাজ শিখে এখন ভালো মজুরি পাই। সংসারে টাকা দিতে পারি। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ দিতে পারি। সংসারে আমার মূল্যও বেড়েছে। আমরা ২০ জন নারী এই কারখানায় কাজ করছি।’

আনোয়ারা পারভীন বলেন, ‘আমি দেখতাম এই এলাকার নারীরা ঘরে বসে থাকে। আমার মনে হলো আমি তাদের কাজের সুযোগ দিতে পারি। তাদের ডেকে এনে আমাদের কারখানায় কাজ শেখাই। এভাবে অনেক নারীই এখন আমাদের এখানে কাজ করে সুন্দরভাবে সংসার চালাচ্ছে। আমার ইচ্ছা, এই কারখানায় আরো অনেক নারীকে কাজের সুযোগ দেওয়া। আমার স্বপ্ন আমার সন্তানদের ভালোভাবে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তোলা।

 

হারুন অর রশিদ বললেন

অভাবের কারণে লেখাপড়া করতে পারিনি। এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের টাকা জোগার না হওয়ায় পরীক্ষা দিতে পারিনি। পরে টুপির কারখানায় কাজ শুরু করি। সেখান থেকেই নিজে একটি কারখানা করার স্বপ্ন দেখতাম। সংসারের খরচ দিয়ে অল্প অল্প করে কিছু টাকা বাঁচিয়ে খুব কষ্টে দুটি সেলাই মেশিন কিনে কারখানা শুরু করি। তার পর স্ত্রীকে সঙ্গে পাই। সে-ও খুব পরিশ্রমী। দুজনে মিলে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে আরো কিছু মেশিন যুক্ত করি। টুপি বিক্রি করে সেই ঋণ শোধ করে দিই। এখন আমাদের কারখানায় ৩০টি মেশিন রয়েছে। ৩০ জন নারী-পুরুষ কাজ করছে। অনেক ভালো লাগে আমরা নিজেদের আয়ের পাশাপাশি মানুষকে কাজের সুযোগ দিতে পারছি বলে। কারখানা আরো বড় করতে চাই। অনেক বেকার নারী-পুরুষকে কাজের সুযোগ দিতে চাই। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ শর্তে ঋণ পেলে আমাদের মতো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ভালো কিছু করতে পারবে। 

ছবি : লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা