kalerkantho

শুক্রবার । ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৫ রবিউস সানি          

মুন্সীগঞ্জের পাতক্ষীর

মুন্সীগঞ্জের পাতক্ষীরের কথা অনেকেই জানবেন এত দিনে। এর বয়স দেড় শ বছর ছাড়িয়ে যেতে পারে। স্থানীয় লোকজন এ খাবার নিয়ে গর্ববোধ করেন। মো. মাসুদ খানও তার ব্যতিক্রম নন

১৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



মুন্সীগঞ্জের পাতক্ষীর

পদ্মা, মেঘনা, ধলেশ্বরী আর ইছামতীর দেশ মুন্সীগঞ্জ। এ অঞ্চলের মানুষ ভোজনবিলাসী। অতিথি আপ্যায়নে তাদের জুড়ি মেলা ভার। এখানকার পাতক্ষীরের (পাতার ক্ষীর) সুনাম সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই। এমন ক্ষীর সারা দেশে আর কোনো অঞ্চলে তৈরি হয় না।

 

রাজলক্ষ্মী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার

সিরাজদিখান বাজারের রাজলক্ষ্মী মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের মালিক খোকনচন্দ্র ঘোষ। তাঁর ভাই প্রয়াত সুনীলচন্দ্র ঘোষ এটি চালু করেছিলেন। তিনি ছিলেন পাতক্ষীর তৈরির মশহুর কারিগর। লোকে বলে, তাঁর হাতে জাদু ছিল। তাঁর তৈরি পাতক্ষীর যারা খেয়েছে, তারা ভুলতে পারে না। খোকন বললেন, ‘ব্রিটিশ আমল থেকে বংশপরম্পরায় আমরা এ পাতক্ষীর তৈরি করি। ঠিক কবে থেকে এখানে পাতক্ষীর তৈরি শুরু হয় তার ইতিহাস আমাদের জানা নেই। তবে এটি জমিদার আর বাবুদের এলাকা। তাঁদের চাহিদা মেটাতে গিয়েই পাতক্ষীরের প্রচলন ঘটে থাকবে। এটি খাওয়ার শেষে দইয়ের মতো যেমন খাওয়া যায় আবার পিঠা তৈরির উপকরণ হিসেবেও ব্যবহূত হয়, বিশেষ করে পাটিসাপটা পিঠার পুর (ভেতরের মসলা) হিসেবে এটি দারুণ জনপ্রিয়। তবে এতে খরচ বেশি পড়ে। জমিদারদের ব্যবসা ছিল কলকাতার সঙ্গে। তাঁরা সেখানে রওনা দেওয়ার আগে পাতক্ষীর কারিগরদের ব্যস্ততা বেড়ে যেত। কারণ ওখানকার মহাজন ও আত্মীয়-স্বজনরা পাতক্ষীরের আশায় বসে থাকত। তাই বেশ কিছুদিন আগেই ফরমায়েশ দেওয়া হতো। আর কারিগররাও ব্যস্ত সময় কাটাতেন। আমার পূর্বপুরুষরা খুব যত্ন করেই পাতক্ষীর তৈরি করতেন। তাঁরা যত না ব্যবসার কথা ভাবতেন, তার চেয়েও বেশি চাইতেন সুনাম ধরে রাখতে।’

 

যেভাবে তৈরি হয়

খোকন ঘোষের কাছ থেকেই জানা গেল, প্রথম প্রথম এ পাতক্ষীর একটু পাতলা হতো; কিন্তু একসময় দেখা গেল আরো কিছুটা ঘন করলে এর স্বাদ বেড়ে যায়। মজাদার হয়। তাই ঘন করেই এখন তৈরি হচ্ছে। এক কেজি ক্ষীর তৈরিতে ছয় কেজি দুধ লাগে। প্রথমে দুধ একটি পাত্রে নিয়ে জ্বাল দিতে হয়। জ্বাল দিতে দিতে যথেষ্ট পরিমাণ ঘন হলে নামিয়ে আনা হয়। তবে নামিয়ে আনার কিছু আগে অল্প পরিমাণ চিনি মেশানো হয়। নামিয়ে আনার পরপরই ঢেলে দেওয়া হয় কলাপাতার ওপর। একটু ঠাণ্ডা হলে ধীরে ধীরে জমে দইয়ের আকার ধারণ করে। পাতার ওপর ঢালা হয় বলেই এটি পাতক্ষীর। সে আমলে ইংরেজরাও পাতক্ষীরের সমঝদার ছিল। বাবুদের পাতে তো প্রতি বেলায়ই পাতক্ষীর লাগত। এ ছাড়া বিশেষ অনুষ্ঠানে পাতক্ষীর অতিথি আপ্যায়নে এগিয়ে থাকত। এখনো কিন্তু ২৫ ডিসেম্বরের বড়দিনে বিদেশি কূটনীতিকদের আপ্যায়ন করতে বঙ্গভবনে পাতক্ষীর থাকে। প্রবাসীদের জন্য স্বজনরা এটি লোক মারফত বিদেশে পাঠিয়ে থাকেন।

পাতক্ষীর নিয়ে কথা হচ্ছিল সিরাজদিখানের সাংবাদিক ইমতিয়াজ বাবুলের সঙ্গে। তিনি বললেন, বিদেশ থেকে বন্ধুবান্ধব ফোন করলে তারা পাতক্ষীর পাঠাতে বলে। মুন্সীগঞ্জের মানুষ অতিথিপরায়ণ। নিজেরাও খেতে ভালোবাসে। খাওয়ার ব্যাপারে টাকার কথা হিসাব করে না। নতুন জামাই বাড়ি এলে পাতক্ষীরের পাটিসাপটা তারা বানাবেই। এখানে পাতক্ষীর কয়েক দোকানেই পাওয়া যায়; কিন্তু রাজলক্ষ্মী অতুলনীয়। এখানে একসময় প্রতি বাড়িতেই ছিল গাভি। গাভির দুধে উপচে পড়ত বালতি। এত দুধ এমনি এমনি খাওয়া তো সহজ নয়। তাই দুধ জ্বাল দিয়ে ঘন করে খেয়ে বিশেষ স্বাদ পাওয়ায় ঘোষরা ক্ষীর তৈরির উপায় বের করে ফেলে। আবিষ্কৃত হয় নতুন এক সুস্বাদু খাবার। এটা ঠিক মিষ্টি নয়, এর স্বাদ বিশেষ রকমের। শুধু খেলেই টের পাওয়া যায়।

ছবি : লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা