kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৯ নভেম্বর ২০২২ । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ ।  ৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

‘সকালে ঘুম থেকে জেগে দেখি গ্রাম উধাও’

কুদ্দুস বিশ্বাস, কুড়িগ্রাম (আঞ্চলিক)   

৭ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



‘সকালে ঘুম থেকে জেগে দেখি গ্রাম উধাও’

কিছুদিন আগেও এখানে ঘর ছিল। সাজানোগোছানো সংসার ছিল। ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের মুখে সেই ঘর ভেঙে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে লোকজন। গতকাল কুড়িগ্রামের রাজীবপুর উপজেলার ঢাকাইয়াপাড়া গ্রাম থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘বিকেলে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের তাণ্ডব দেখেছি দাঁড়িয়ে। এ সময় গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথাও বলেছি নদের ভাঙন নিয়ে। যেভাবে ভাঙছিল তাতে মনে হয়েছিল, গ্রামের কাছেই থাকা আমার স্কুল ভবনটিও থাকবে না। এমন আশঙ্কা নিয়ে বাজারে ঘুরে রাতে বাড়িতে ঘুমাই।

বিজ্ঞাপন

ভোরবেলা মানুষের চিৎকারে বাড়ি থেকে বের হয়ে দেখি, ঢাকাইয়া পাড়া গ্রামটি উধাও। গ্রামটির চিহ্ন পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া গেল না। ’

গতকাল বৃহস্পতিবার কুড়িগ্রামের রাজীবপুর উপজেলার মোহনগঞ্জ ইউনিয়নে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনকবলিত এলাকা দেখতে গেলে এসব কথা বলেন সাইফুল ইসলাম। তিনি মোহনগঞ্জের চরনেওয়াজী গ্রামের চরনেওয়াজী সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। চরনেওয়াজীর পাশের গ্রাম মোহনগঞ্জের ঢাকাইয়া পাড়া।

সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমার স্কুলটি ভাঙনের হুমকির মুখে। নদ যেকোনো সময়ে আঘাত হানতে পারে। বিষয়টি আমি শিক্ষা অফিসকে অবহিত করেছি। শিক্ষা কর্মকর্তা সরেজমিনে দেখতে আসবেন—এমন কথা দিয়েছেন। এই মুহূর্তে ভাঙনের তাণ্ডব কমে গেছে, কিন্তু বিশ্বাস নেই আবার ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এ কারণে আতঙ্কে আছি আমরা শিক্ষকরা। ’

ঢাকাইয়া পাড়া গ্রামে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন দেখা দেয় সাত দিন আগে। ভাঙনের শিকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধীরে ধীরে ভাঙতে থাকা ব্রহ্মপুত্র নদ বুধবার দিবাগত রাতে হঠাৎ করে ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। এ সময় ৬০ পরিবারের গ্রামটির বাকি ঘরবাড়িগুলো নদের গর্ভে হারিয়ে যায়। প্রায় আড়াই শ মানুষ তাদের ঘরবাড়ি, ভিটেমাটি হারিয়ে এখন নিঃস্ব। গৃহহীন মানুষ যে যার মতো আশ্রয় খুঁজে বেড়াচ্ছে।

ভাঙনে সব কিছু হারানো জামাল হোসেন ওরফে জামাল বয়াতী (৭০) বলেন, ‘রাতের অন্ধকারে হঠাৎ কইরা ঘরবাড়ি ভাইঙ্গা যাওয়া শুরু করে। আমরা কোনো রকমে ঘটি-বাটি, খ্যাতা-বালিশ, স্ত্রী-সন্তান নিয়া বাঁইচা গেছি। চোখের সামনে ভাঙ্গনে ভাইসা গেছে ঘরের চালা, খামখোটা। আমার ৭০ বছর বয়সে এবা ভাঙ্গন দেহি নাই। ’

ভাঙনের শিকার স্বামীহারা ববিতা বেগম বলেন, ‘আমার এডা ঘর, তাও ভাঙ্গনে ভাইসা গেছে। দুই সন্তান নিয়া এহন মাইনষের বাইত্তে উঠছি। ’

তাঁদের মতো ভাঙনে নিঃস্ব মানুষের কান্না এখন ওই এলাকার বাতাসে।

মোহনগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান গৃহহীন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কোনো খোঁজখবর নেননি বলে তাঁরা অভিযোগ করেছেন।

ইউপির সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড সদস্য শাহ আলম জানান, ঢাকাইয়া পাড়া গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ দিনমজুর, খেটে খাওয়া। ভাঙনে তাদের ঘরবাড়ি, ভিটেমাটি হারিয়ে যাওয়ায় তাদের মাঝে খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে। এই গৃহহীনরা রাস্তায় ও অন্যের বাড়িতে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মোহনগঞ্জ ইউপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমি খবর পেয়েছি যে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে ঢাকাইয়া পাড়া গ্রামটি বিলীন হয়ে গেছে। বিষয়টি আমি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করেছি। ’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমিত চক্রবর্তী জানান, ভাঙনে নিঃস্ব পরিবারদের তালিকা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারিভাবে তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করা হবে।

 

 



সাতদিনের সেরা