kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৬ আগস্ট ২০২২ । ১ ভাদ্র ১৪২৯ । ১৭ মহররম ১৪৪৪

কম দামে গরু বেচতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা

ইয়াহইয়া ফজল (সিলেট), জাহাঙ্গীর হোসেন (রাজবাড়ী) ও গোলাম সরোয়ার লিটন (তাহিরপুর)   

৩ জুলাই, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কম দামে গরু বেচতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা

গত মে মাসের প্রথমভাগে সিলেটে বন্যা দেখা দেয়। দিন পনের পরে পানি কমতে থাকে। কিন্তু জুনের মধ্যভাগ থেকে আবার বন্যা দেখা দিয়েছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছে লাখ লাখ মানুষ।

বিজ্ঞাপন

ঘরবাড়িসহ মালপত্রের ক্ষতি হয়েছে। নিজেদের ও গবাদি পশুর খাবার জোগাড় কঠিন হয়ে পড়েছে। পশু রাখার শুকনা জায়গারও অভাব। এসব কারণে যত্নে পালিত গরু বেচে দিতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা। কিন্তু দর-কষাকষির সুযোগ কম থাকায় ভালো দাম পাচ্ছেন না। এ অবস্থায় বন্যাকবলিত উপজেলাগুলোতে বাড়ছে ফড়িয়া ও ব্যাপারীদের ভিড়। এখানে সস্তায় গরু কিনে তা দেশের বিভিন্ন স্থানে কোরবানির পশুর হাটে বিক্রি করে বড় অঙ্কের লাভের স্বপ্ন দেখছেন তাঁরা।

একই অবস্থা সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায়। পদ্মা নদীর পানি বেড়ে রাজবাড়ী জেলা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বাইরের চরাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। আরো পানি বৃদ্ধি তথা বন্যার আশঙ্কায় ও গোখাদ্যের সংকটে ঈদের অনেক আগেই কম দামে গরু বিক্রি করে দিচ্ছে এখানকার কৃষক পরিবারগুলো।

সিলেটে বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলোর একটি গোয়াইনঘাট। উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নে বসেছে কোরবানির হাট। তবে ক্রেতার সংখ্যা কম। উপজেলার নগর ডেংরি গ্রামের জিয়াউর রহমান (৩৯) বলেন, ‘আমার হালচাষ ও দুধের জন্য ছয়টা গরু আছে। সেগুলো বিক্রি করে দিতে হচ্ছে। কারণ বন্যায় ঘরের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সেগুলো মেরামতের জন্য টাকা দরকার। তা ছাড়া চারদিকে পানি। গোখাদ্যের তীব্র সংকট। ঠিকমতো খাবার দিতে না পারায় গরুগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। ’ তিনি বলেন, ‘শুক্রবার ভালো দাম মিলবে এমন আশায় একটি গরু নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু ৫০ হাজার টাকার গরুর দাম ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা বলে। পরে বলেকয়ে ৩৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেছি। বিপদ দেখে মানুষ পানির দামে কিনতে চায়। দেখি ঈদের তিন-চার দিন আগে মোটামুটি দাম পেলেও বাকি গরুগুলো বিক্রি করে দেব। ’

জকিগঞ্জ উপজেলার খলাদাপনিয়া গ্রামের তখলিছুর রহমান বলেন, ‘দেড় বছর থেকে বাড়িতে দুটি গরু পালন করছি। লক্ষ্য ছিল এবারের কোরবানির হাটে ভালো দামে বিক্রি করার। কিন্তু বাজারে বড় গরুটি ৮০ হাজার টাকা দাম চাইলেও ক্রেতা ৩০ হাজারের বেশি দিতে চাইছে না। ’

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার খায়েরগাঁও গ্রামের দুই ভাই নছর মিয়া ও নাসির মিয়া শুক্রবার তাঁদের ছয়টি গরুর দুটি বেচার জন্য বাজারে নিয়ে আসেন। বাজারে লাল গরুটি বন্যার আগে এক লাখ ১৫ হাজার টাকা দাম উঠেছিল, বেচেননি। এখন সেটির দাম ৯০ হাজার টাকা বলা হচ্ছে।

কোরবানির গরু কিনতে বন্যাকবলিত গ্রামগঞ্জে খোঁজ লাগিয়েছেন অনেকে। কেউ সস্তায় গরু বিক্রি করছেন খবর পেলে তাঁরা দ্রুত যাচ্ছেন সেটি কিনতে। সস্তায় গরু কিনতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অনেক ব্যাপারী ও ফড়িয়াও ভিড় জমাচ্ছেন এসব এলাকায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলা থেকে কোম্পানীগঞ্জে আসা ব্যাপারী মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘সিলেটের বন্যাকবলিত এলাকায় কম দামে গবাদি পশু পাওয়া যাবে সে জন্য বৃহস্পতিবার রাতে সিলেটে এসেছি। শুক্রবার টুকেরবাজার থেকে এক লাখ ৯০ হাজার টাকায় পাঁচটি ভালো আকারের গরু কিনেছি। পিকআপে সেগুলো ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পাঠিয়ে দিয়েছি। ভালো লাভ হবে। ’ একই এলাকার ব্যাপারী আনোয়ার আলী বলেন, ‘বন্যার কারণে সিলেটে কম দামে গরু পাওয়া যাবে এমন আশায় কোম্পানীগঞ্জে এসেছি। কিনে নবীনগর উপজেলার বাইশমৌজা বাজার নিয়ে ভালো দামে বিক্রির পরিকল্পনা আমার। ’

টুকেরবাজার গরুর হাটের ইজারাদার মো. ইয়াকুব আলী বলেন, ‘বাজারে প্রচুর গরু এসেছে। কৃষকরা কম দামেই পশু বিক্রি করছেন। তার পরও ক্রেতা কম। ’

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় কৃষকের বাড়িতে রাখা খড় বন্যায় পচে যাওয়ায় গোখাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দেওয়ায় লোকজন কম দামেই গবাদি পশু বিক্রি করছেন। বিভিন্ন হাট ঘুরে এবং কৃষক ও খামারিদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য পাওয়া গেছে। মাটিয়ান হাওরপারের কৃষক সবুর মিয়া বলেন, ‘বিকল্প উপায় নেই, তাই লাখ টাকার গরু ৬০ হাজারে বিক্রি করেছি। ’

টাঙ্গুয়ার হাওরপারের রূপনগর গ্রামের কিষানি হেপি আক্তার জানান, ১৫ বৈশাখ বাঁধ ভেঙে তাঁর তিন একর ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে যায়। এতে নিজের ও গরুর খাবার জোটানো কঠিন হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে পরদিন গোয়ালের চারটি গরু কম দামে বেচে দেন। বাকি সাতটি গরু বাঁচাতে ধার করে খড় কিনেছিলেন। এবারের বন্যায় তাও পচে গেছে। তাই সাতটি গরুও বিক্রির চেষ্টা করছেন। কিন্তু ন্যায্য দাম বলছে না কেউ।

উপজেলার বাদাঘাট ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান রাখাব উদ্দিন বলেন, খড় না থাকায় সবাই গরু বিক্রির চেষ্টা করছেন। তাই কোরবানির হাটেও গরুর ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না কৃষকরা।

তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রায়হান কবির বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে গোখাদ্য সহায়তার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। ’

রাজবাড়ীর মিজানপুর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান আমিযার রহমান জানান, পদ্মায় পানি বাড়ায় পানিবন্দি হয়ে পড়ছেন ইউনিয়নের কাঠুরিয়া, মৌকুড়ি, আমবাড়িয়া, চর আমবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দারা। ফলে গোখাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। মৌকুড়ি গ্রামের মুদি দোকানি আব্দুস সামাদ বেপারী জানিয়েছেন, তাঁর আটটি গরু ছিল। আবার পানি বাড়ায় তাঁরা শঙ্কায় পড়েছেন। তাই তিনি তাঁর চারটি গরু বাজারদরের চেয়ে ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা কমেই বিক্রি করে ফেলেছেন। বাকিগুলোও বেচে দেবেন।

আরেক কৃষক সোহেল বেপারী জানান, তিনি বাজারদরের চেয়ে কম দামে দুটি গরু বিক্রি করে ফেলেছেন। তিনি বলেন, তাঁদের এই চরাঞ্চল থেকে এরই মধ্যে দুই শতাধিক গরু বন্যার আশঙ্কায় কৃষকরা কম দামেই বেচে দিয়েছেন।

 



সাতদিনের সেরা