kalerkantho

শনিবার । ৩১ আশ্বিন ১৪২৮। ১৬ অক্টোবর ২০২১। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

র‌্যাবের গুলিতে পা হারানো সেই লিমন বিয়ে করলেন

ঝালকাঠি ও অভয়নগর (যশোর) প্রতিনিধি   

৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘লিমন একজন সংগ্রামী মানুষ। জীবনযুদ্ধে তিনি জয়ী হয়েছেন। সংগ্রাম করে নিজের ক্যারিয়ার গড়েছেন। আশা করি দাম্পত্যজীবনে তিনি আরো দায়িত্বশীল হবেন। আমি সব কিছু বুঝেই বিয়ে করেছি।’ র‌্যাবের গুলিতে এক পা হারানো ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া গ্রামের লিমন হোসেন সম্পর্কে গতকাল শুক্রবার কথাগুলো বলেন যশোরের অভয়নগর উপজেলার সরখোলা গ্রামের রাবেয়া বসরী।

বিয়ে করেছেন লিমন হোসেন। কনে রাবেয়া বসরীর বাড়িতেই গতকাল দুপুরে তাঁদের বিয়ে রেজিস্ট্রি হয়। এর আগে বৃহস্পতিবার দুপুরে লিমনের গ্রামের বাড়িতে গায়েহলুদ অনুষ্ঠিত হয়। লিমন জানান, মা-বাবার পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করেছেন তিনি। জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করতে যাচ্ছেন।

২০১১ সালের ২৩ মার্চ র‌্যাবের গুলিতে পা হারিয়েছিলেন লিমন হোসেন। সে বছর এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল তাঁর। ১৭ বছরের সেই কিশোর এখন ২৭ বছরের যুবক। ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোচিত হয়, প্রশ্নবিদ্ধ হয় র‌্যাবের অভিযান। সাতুরিয়া গ্রামের তোফাজ্জেল হোসেন ও হেনোয়ারা বেগমের ছেলে লিমন হোসেন এখন ঢাকার সাভারের গণবিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী প্রভাষক। আর রাবেয়া বসরী সরখোলা গ্রামের কৃষক জাহিদুল ইসলাম টিটোর একমাত্র মেয়ে ও অভয়নগরের নওয়াপাড়া সরকারি মহাবিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী।

গণবিশ্বাবিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের প্রধান ড. ফুয়াদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কনে রাবেয়া বসরী সম্পর্কে আমার ভাতিজি। একই কর্মস্থলে থাকায় লিমনের সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এ সূত্রে ছয় মাস আগে উভয় পরিবারের মধ্যে যোগাযোগ শুরু করা হয়। বর-কনের সম্মতিতে দুই লাখ এক টাকা দেনমোহরে বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে।’

দুর্বিষহ দিন পেরিয়ে ছেলে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় গর্বিত লিমনের মা-বাবা। ছেলের বিয়ে নিয়ে উচ্ছ্বসিত তাঁরা। বাবা তোফাজ্জেল হোসেন বলেন, ‘আমার ছেলেকে তো মেরেই ফেলেছিল। আল্লাহ তাকে বাঁচিয়েছেন।’ তোফাজ্জেল ও জাহিদুল ইসলাম টিটো ছেলে-মেয়ের জন্য সবার দোয়া চেয়েছেন।

২০১১ সালের ২৩ মার্চ সাতুরিয়ায় বাড়ির কাছের মাঠে গরু আনতে গিয়ে হতদরিদ্র কলেজছাত্র লিমন হোসেন র‌্যাবের গুলিতে আহত হন। লিমনকে সন্ত্রাসী সাজিয়ে র‌্যাবের ডিএডি লুৎফর রহমান বাদী হয়ে মামলা করেন। লিমন ও স্থানীয় সন্ত্রাসী মোরসেদ জমাদ্দার এবং তাঁর সহযোগীসহ আটজনকে আসামি করে অস্ত্র আইনে ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে দুটি মামলা করা হয়। গুরুতর আহত লিমনকে ভর্তি করা হয় বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সেখান থেকে নেওয়া হয় ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে। যথাযথ চিকিৎসার অভাবে ২০১১ সালের ২৭ মার্চ লিমনের বাঁ পা হাঁটু থেকে কেটে ফেলা হয়।

এ ঘটনায় লিমনের মা হেনোয়ারা বেগম বরিশাল র‌্যাব-৮-এর ছয় সদস্যের বিরুদ্ধে লিমনকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ২০১১ সালের ১০ এপ্রিল ঝালকাঠির জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম নুসরাত জাহানের আদালতে একটি নালিশি মামলা করেন। পরে আদালতের নির্দেশে ২৬ এপ্রিল রাজাপুর থানায় মামলাটি লিপিবদ্ধ করা হয়।

লিমনের মায়ের মামলায় উল্লেখ করা হয়েছিল, মায়ের সঙ্গে মাঠে গরু আনতে গিয়েছিলেন লিমন। তখন তিনটি মোটরসাইকেলে ছয়জন র‌্যাব সদস্য সেখানে উপস্থিত হন। র‌্যাব সদস্য লুৎফর রহমান লিমনকে শার্টের কলার ধরে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে সন্ত্রাসী আখ্যা দেন। লিমন তখন বলেন, তিনি সন্ত্রাসী নন, ছাত্র। এরপর লুৎফর মাথায় গুলি না করে লিমনের পায়ে গুলি করেন।

মামলা চলাকালে কারাগার হাসপাতালে থেকে পড়ালেখা করেন লিমন। ২০১১ সালের ৯ মে হাইকোর্ট লিমনের জামিন মঞ্জুর করেন। জামিনে বেরিয়ে ২০১৩ সালে পিরোজপুরের কাউখালী কাঠালিয়া পিজিএস বহুমুখী স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ২০১৮ সালে গণবিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০২০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি গণবিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে শিক্ষা সহকারী পদে যোগ দেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আইন বিভাগের সহকারী প্রভাষক হিসেবে পদোন্নতি পান।



সাতদিনের সেরা