kalerkantho

শুক্রবার । ২ আশ্বিন ১৪২৮। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। ৯ সফর ১৪৪৩

নিমেষে শেষ পাঁচ হাজার লেবুগাছ

কক্সবাজারে বন বিভাগের ওই ‘পরিত্যক্ত’ ভূমিতে দরিদ্র চাষির বাগানের গাছগুলোতে অন্তত ১০ লাখ লেবু ছিল

বিশেষ প্রতিনিধি, কক্সবাজার   

৪ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নিমেষে শেষ পাঁচ হাজার লেবুগাছ

কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের জোয়ারিয়ানালা বন রেঞ্জের প্রায় ২০ কানি (আট একর) বনভূমিজুড়ে পাঁচ হাজার গাছের একটি লেবুবাগান করেন দরিদ্র চাষি নজির আলম। প্রতিটি গাছে ২০০টি করে হলেও ১০ লাখ লেবু ধরেছিল। কয়েক বছরে তিলে তিলে গড়ে তোলা বাগানের পাঁচ হাজার গাছই গত বৃহস্পতিবার সকালে কেটে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বনকর্মীদের বিরুদ্ধে।

ক্ষতিগ্রস্ত নজির আলমের (৪৩) বাড়ি কক্সবাজারের রামু উপজেলার জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের পূর্বপাড়ায়। তাঁর বাড়ি থেকে পাঁচ-ছয় কিলোমিটার দূরে পাহাড়ের দুর্গম এলাকায় বাগানটি। তিনি জানান, ওই বনভূমি এমনিতেই পরিত্যক্ত। সেখানে বন বিভাগের কোনো গাছই নেই। স্থানীয় সোনাইছড়ি খালের তীরে ভিলেজারের (বন জায়গিরদার) উত্তরাধিকার সূত্রে বনকর্মীদের অনুমতি নিয়ে বনভূমিতে লেবুবাগানটি করেন তিনি। এর আগে ওই বনভূমিতে ২০ বছর ধরে তিনি তরমজু, মরিচসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করে আসছিলেন। কিন্তু পরে সেখানে অপহরণকারী ও ডাকাতদলের উৎপাত বাড়লে তিনি আট বছর আগে লেবু চাষ শুরু করেন। জীবনের সব সঞ্চয় ও ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তিলে তিলে বাগানটি সৃজন করেন তিনি। এখন একমাত্র উপার্জনের মাধ্যম বাগানটির সবকয়টি গাছ কেটে দেওয়ায় তিনি নিঃস্ব হয়ে গেছেন।

এদিকে কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) তৌহিদুল ইসলাম গতকাল মঙ্গলবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘লেবুবাগান কেটে বন বিভাগের জমি জবরদখলমুক্ত করেছি। বনভূমি রক্ষায় উচ্ছেদের সময় কি গাছগাছালি বা বন কাটা গেল সেটা মুখ্য নয়।’ বনভূমির ওই এলাকায় বন বিভাগের সৃজিত কোনো গাছ নেই, এমনকি আরো অনেকের লেবুবাগান থাকলেও শুধু নজির আলমের বাগানটি কেন কাটা হলো—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘উচ্ছেদ মাত্র শুরু হয়েছে। এটা চলবে।’

বনভূমিতে বাগান করার বিনিময়সহ স্বল্প টাকার মজুরিতে বনকর্মীরা কৃষক নজির আলম ও তাঁর ছেলে আরিফকে সেগুনবাগান পাহারাসহ নানা কাজে লাগান। ৩০ মাস ধরে নজির ও তাঁর পুত্র বন বিভাগের স্থানীয় সেগুনবাগান পাহারার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। কিন্তু তাঁদের কোনো পারিশ্রমিক দেওয়া হয়নি। নজির বন রেঞ্জ কর্মকর্তার কাছে সেগুনবাগান পাহারার পাওনা দুই লাখ ২০ হাজার টাকা দাবি করায় উল্টো বনভূমিতে লেবুবাগানের জন্য তাঁর কাছে টাকা চাওয়া হয়। নজিরের অভিযোগ, টাকা না দেওয়ায় কয়েক দিন আগে বনকর্মীরা ধরে নিয়ে যান তাঁর ছেলে আরিফকে। বনকর্মীরা তাঁকে মারধর করে বনভূমিতে লেবুবাগান করার জন্য তিন লাখ টাকা দাবি করেন। এ ঘটনার পর থেকে নজিরের সঙ্গে বনকর্মীদের সম্পর্কে মারাত্মক দূরত্ব তৈরি হয়। প্রতিটি গাছে ১০০ থেকে ৫০০টি পর্যন্ত লেবু ধরেছে। নজিরের এই সফলতা দেখে বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তা-হেডম্যান (বন জায়গিরদার প্রধান) তাঁর কাছে তিন লাখ টাকা দাবি করতে থাকেন। টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় গত বৃহস্পতিবার সকালে জোয়ারিয়ানালা রেঞ্জ কর্মকর্তা সুলতান মাহমুদ টিটুসহ একদল ভাড়াটে লোক লেবুবাগানটির ফলবান সব গাছ (পাঁচ হাজার) গাছ কেটে দেন। গত সোমবার স্থানীয় কয়েকজন সংবাদকর্মীও ঘটনাস্থলে গিয়ে লেবুবাগানটি কেটে ফেলার বিষয়টি দেখতে পেয়েছেন।

জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল শামসুদ্দিন আহমেদ প্রিন্স কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। তিলে তিলে গড়ে তোলা হাজার হাজার ফলবান গাছের একটি বাগান কেটে ফেলার মানে উচ্ছেদ হতে পারে না।’ তিনি বলেন, বনভূমির লেবুবাগানটিই তো বন বিভাগের মালিকানায় থাকতে পারত। একটি গাছ রোপণের পর বড় করা বেশ কষ্টসাধ্য, কিন্তু কেটে ফেলা সহজ। বনকর্মীরা সহজটিই করেছেন। কৃষক নজির সারা জীবনই বন বিভাগের কাজ করে যাচ্ছেন। বনকর্মীদের সঙ্গে মনোমালিন্যের কারণেই এমন সবুজ বাগানটি কেটে ফেলা হয়েছে।

পরিবেশবাদীরা বলছেন, হাজার হাজার একর শূন্য বনভূমিতে বনকর্মীরা কোনো বনায়ন করে যেখানে সবুজায়নও করতে পারছেন না, সেখানে স্থানীয়দের গড়ে তোলা বাগান কেটে ফেলার ঘটনাটি পরিবেশের জন্যও উদ্বেগজনক। তাঁরা বিষয়টি তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দাবি জানিয়েছেন।

অভিযুক্ত জোয়ারিয়ানালা রেঞ্জ কর্মকর্তা সুলতান মাহমুদ টিটু বন বিভাগের পক্ষে তিন লাখ টাকা দাবির বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, বন বিভাগের সংরক্ষিত বনে বাগানটি সৃজন করায় সেটি কেটে দেওয়া হয়েছে। আরো যাঁরা এভাবে বন দখল করে বাগান করেছেন সেগুলোও উচ্ছেদ করা হবে।



সাতদিনের সেরা