kalerkantho

রবিবার । ১১ আশ্বিন ১৪২৮। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৮ সফর ১৪৪৩

ছিটমহল বিনিময়ের ছয় বছর

‘আগোত মানুষ হিসাবে দাম পাই নাই’

আব্দুল খালেক ফারুক, কুড়িগ্রাম   

১ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়ার বৃদ্ধ কবির হোসেনের চোখে মুখে নির্ভরতা আর পরিতৃপ্তির ঝিলিক। রাস্তার পাশে টং ঘরে বসে পুরনো স্মৃতি তর্পণ করছিলেন। ‘আগোত মানুষ হিসাবে কোনো দাম পাই নাই। ছেলেপেলে চাকুরি পায় নাই। ডাকাতি হইলে বিচার পাই নাই। থানা যাবার পাই নাই। এলা আইন হইছে। বিচায় চাইলে পাই। পুরান বাংলা-নতুন বাংলা সমান সমান। এলা সরকার অনেক অনুদান দেয়। হামরা ছিটমহলের মানুষ খুব খুশি।’

ছিটমহল বিনিময়ের মাধ্যমে ঘুচেছে ছিটমহলবাসীর ৬৮ বছরের বঞ্চনা। নাগরিক অধিকার ফিরে পাওয়ার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগসহ নানা খাতে অভূতপূর্ব উন্নয়নের সুফল পেয়ে খুশি বিলুপ্ত ছিটমহলবাসী। ছিটমহল বিনিময়ের ছয় বছর পূর্তিতে তাদের দাবি—কর্মসংস্থান ও বেকারত্বের নিরসন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে গত রাতে তারা ছয় বছর পূর্তির অনুষ্ঠানও করেছে।

কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার ভারতীয় ছিটমহল দাসিয়ারছড়ায় ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই রাত ১২টা ১ মিনিটে মোমবাতি প্রজ্বালনসহ নানা আনুষ্ঠানিকতায় বিনিময় হয় বাংলাদেশ ও ভারতের ১৬২টি ছিটমহল।

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, গত ছয় বছরে সেই দাশিয়ারছড়ায় সরকারিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। গ্রামের বেশির ভাগ কাঁচা সড়ক এখন পাকা। উত্পাদন করা কৃষি পণ্যের বিপণন করতে পেরে কৃষকদের বাড়িতে বাড়িতে উঠছে আধাপাকা ঘর। বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত একটি মাদরাসা জাতীয়করণ করা হয়েছে। এলজিইডির মাধ্যমে ২৭ কিলোমিটার পাকা সড়ক, নীলকমল নদীর ওপর ৪৪ মিটার দীর্ঘ একটি ব্রিজ, ৯টি কালভার্ট এবং বেশ কটি মসজিদ, মন্দির, শ্মশান নির্মাণ করা হয়েছে। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সুদৃশ্য ও দৃষ্টিনন্দন আইসিটি ভবন নির্মিত হয়েছে। পাশেই ভাষাশহীদদের স্মরণে গড়ে তোলা হয়েছে শহীদ মিনার। বিলুপ্ত ছিটমহলের সবার ঘরে এখন বিনা মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে বিদ্যুৎ সুবিধা। স্যানিটেশন, স্বাস্থ্য, শিশুশিক্ষাসহ নানা ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে গত কয়েক বছরে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে কৃষি প্রশিক্ষণ, নতুন জাতের ফসল সম্প্রসারণসহ নানা কর্মসূচি। ছিটমহলের সড়কে সড়কে বাসক পাতার চাষ সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি আয়ের সুযোগ করে দিয়েছে গ্রামের দরিদ্র নারীদের।

ছিটমহলের বাসিন্দারা জানান, নাগরিক অধিকার ফিরে পাওয়ার পাশাপাশি ভূমির অধিকার ও আইনি সুরক্ষা পাওয়ায় ছয় বছর পূর্তির মাহেন্দ্রক্ষণে অনেক খুশি তাঁরা।

কালিরহাটে কথা হয় মোজাফফর হোসেন নামে এক কৃষকের সঙ্গে। তিনি জানান, এত দ্রুত এত উন্নয়ন হবে ভাবেননি তাঁরা।  খড়িটারির মোজাম্মেল হোসেন জানান, রিলিফ, বয়স্ক ভাতাসহ সরকারের সকল সুযোগ-সুবিধা সবার আগে তাঁরা পাচ্ছেন। এই গ্রামের যুবক মিনহাজুল ইসলামের চাকরি হয়েছে কমিউনিটি ক্লিনিকে।

তবে এত প্রাপ্তির পরও কিছু অপ্রাপ্তি রয়েছে তাঁদের। ভূমি জরিপে কিছু ভুলভ্রান্তির কারণে অনেকে আছেন মনঃকষ্টে। জমির ক্রয়-বিক্রয় বন্ধ থাকায় প্রয়োজনে জমি কোনো কাজে আসছে না তাঁদের।

বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির দাসিয়ারছড়া ইউনিটের সভাপতি আলতাফ হোসেন জানান, মিজানুর রহমান ভারতে চলে গেছে অথচ তাঁর জমি রেকর্ড হয়েছে। আর ছিটমহল আন্দোলনের নেতা আব্দুল খালেকের জমি খাস খতিয়ানে চলে গেছে। এ ছাড়া সমন্বয়পাড়ার আব্দুল কাদেরের ২৪ শতক, ছকিয়ত মিয়ার ১২ শতক ও ওবায়দুল খন্দকারের ২৪ শতক জমি খাস খতিয়ানে গেছে। বর্তমানে জমি কেনাবেচা বন্ধ। ভূমির সমস্যা দ্রুত সমাধান করলে ছিটমহলবাসী খুশি হবেন।

ছিটমহল আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী মনির হোসেন জানান, কালিরহাট বাজারটি ভেঙে সরকারিভাবে নতুন করে মার্কেট নির্মাণ করে দেওয়ার কথা থাকলেও কোনো উদ্যোগ না থাকায় অনেক ব্যবসায়ী ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

ছিটমহলের বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান এখনো প্রত্যাশামাফিক হয়নি। তাই শিক্ষিত যুবকদের কর্মসংস্থান ও শর্ত শিথিল করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার দাবিসহ ভূমি সমস্যার আশু সমাধান চান তাঁরা।

ছিটমহলের শিক্ষিত যুবক জাকির হোসেন বলেন, ৬৮ বছরের বঞ্চনা ঘোচাতে হলে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের জন্য বিশেষ কোটা চালু না করলে বৈষম্য দূর করা যাবে না।

বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির বাংলাদেশ ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘দাসিয়ারছড়ায় তিনটি হাই স্কুল ও একটি কলেজ অনুমোদন হলেও এমপিওভুক্ত না হওয়ায় শিক্ষকরা মানবেতর জীবন যাপন করছেন। শর্ত শিথিল করে এসব প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের এমপিওভুক্ত করা দরকার।

ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুমন দাস জানান, দাসিয়ারছড়ায় অভূতপূর্ব অবকাঠামো উন্নয়ন হয়েছে। এখন মানবসম্পদ উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে নেওয়া হচ্ছে কর্মপরিকল্পনা।



সাতদিনের সেরা