kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ কার্তিক ১৪২৮। ২৬ অক্টোবর ২০২১। ১৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

তাসলিমা দেখছিলেন স্বামীর ছোটাছুটি

কুর্মিটোলা হাসপাতালে এক ঘণ্টা

মোবারক আজাদ   

৩১ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সাভারের তাসলিমা আক্তারের (৩৩) পাঁচ দিন আগে করোনা পজিটিভ রিপোর্ট আসে। এলাকার চিকিৎসকের পরামর্শে বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। কিন্তু অবস্থার হঠাৎ অবনতি হওয়ায় গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও সাভার গণস্বাস্থ্য হাসপাতালসহ তিনটি হাসপাতাল ঘুরে কোথাও ভর্তি করানো যায়নি তাঁকে। এরপর স্বামী সোহেল মিয়া তাঁকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে আসেন। কিন্তু এখানে এসেও মিলছে না ভর্তি। তবে সোহেল মিয়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আশ্বাসে সিট পাওয়ার অপেক্ষায় জরুরি বিভাগে তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। জরুরি বিভাগে তাসলিমা নাকে অক্সিজেন মাস্ক লাগিয়ে হুইলচেয়ারে বসে ছিলেন। একটু পর পর তাঁর মাথায় ভরসার হাত বোলাচ্ছিলেন স্বামী। আর কিছু সময় পর পর সিট খালি হচ্ছে কি না জানতে এদিক-ওদিক ছুটছিলেন তিনি।

স্ত্রী দেখছেন তাঁকে সুস্থ করে তুলতে তাঁর স্বামীর কী আপ্রাণ চেষ্টা। কিন্তু মাস্ক লাগানো থাকায় কিছু বলতে পারছেন না। শুধু দুই চোখ দিয়ে স্বামীর চেষ্টাটাই দেখছেন। দুপুর আড়াইটার দিকে সোহেল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তিন হাসপাতাল ঘুরে এখানেও ভর্তি মিলছে না। তবে অপেক্ষায় আছি ভর্তি করানো যায় কি না। আমাদের আইসিইউ দরকার, কিন্তু এখন ভর্তি নিলেও খালি না হলে আইসিইউ দিতে পারবে না বলছে।’ সোহেল বলেন, ‘স্ত্রীকে সুস্থ না করে বাড়ি ফেরা হবে না। দরকার হলে আরো কয়েকটা হাসপাতালে যাব আইসিইউয়ের জন্য।’ রোগীর অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সে অনেক অসুস্থ, অক্সিজেন লেভেলও খুবই কমে গেছে। তবে তাঁর মনোবল শক্ত আছে। তাই আমি সাহস পাচ্ছি এবং তাঁকে সুস্থ করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’

কুর্মিটোলা হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে এর মিনিট দুয়েক পর কথা হয় চাঁদপুর সদরের আনাছ উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বাবাকে (আবুল কাশেম) এলাকার কোনো হাসপাতালে অনেক চেষ্টা করেও ভর্তি করাতে পারেননি। অক্সিজেন লেভেল মাত্রাতিরিক্ত কমে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় এখানে নিয়ে আসি। এখানে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। অপেক্ষায় আছি যদি সুযোগ হয় ভর্তি করাব। আজকে সারা দিন অপেক্ষা করব, না হলেও আল্লাহর নাম নিয়ে বাড়িতেই চলে যেতে হবে। কারণ ঢাকায় আমাদের থাকার কোনো জায়গা নেই।’

নরসিংদী সদর উপজেলা থেকে কভিড রোগী সানজিদা বেগমকে (৬১) অনেক চেষ্টা করেও এলাকার কোনো হাসপাতালে সিট খালি না থাকায় ভর্তি করতে না পেরে কুর্মিটোলায় নিয়ে আসেন তাঁর মেয়ে ও স্বামী। ঘণ্টাখানেক অ্যাম্বুল্যান্সে সানজিদাকে নিয়ে অপেক্ষা করেও কোনো কূলকিনারা পাচ্ছিলেন না তাঁরা। অসহায়ভাবে তাঁদের এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করতে দেখা গেল।

অ্যাম্বুল্যান্সে রোগী নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন সাভার আশুলিয়ার নুরুল ইসলাম। দুপুর ২টার দিকে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। নুরুল বলেন, ‘আমার চাচি মর্জিনা বেগমের (৫৫) করোনা পজিটিভ আসায় দুই দিন ধরে শ্বাসকষ্টসহ নানা সমস্যা বেড়ে যায়। দুই দিন এলাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চেষ্টা করেও ভর্তি না করাতে পেরে আজ এখানে আসছি। সকাল সাড়ে ১১টা থেকে অপেক্ষা করছি। এখন দুপুর, তাও কোনো সাড়া পাচ্ছি না ভর্তি করতে পারব নাকি পারব না।’ 

কুর্মিটোলার জরুরি বিভাগের সামনে এই প্রতিনিধি এক ঘণ্টা থেকে রোগী নিয়ে পাঁচটি অ্যাম্বুল্যান্সকে অপেক্ষা করতে দেখেছেন।

কভিড রোগী ভর্তির বিষয়ে জানতে চাইলে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের টিকিট কাউন্টারের কর্মী ইউনূস জানান, কভিড-১৯ রোগীর জন্য ৩০০ শয্যা রয়েছে। কিন্তু একটিও খালি নেই।

পুরো দিন অপেক্ষা করে রাজধানীর মানিকনগর এলাকার সুলতান আহমেদ নামের এক রোগীকে বৃহস্পতিবার সাধারণ বেডে ভর্তি করানো সম্ভব হয়। রোগীর চিকিৎসা সম্পর্কে জানতে চাইলে তাঁর ছোট ভাই আকবর আহমেদ বলেন, ‘এখন যে পরিস্থিতি সে অনুযায়ী এখানেসহ সব জায়গায় বেড, হুইলচেয়ার, সিলিন্ডার অক্সিজেন প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। এগুলোসহ জনবল বাড়ানো দরকার। না হলে মৃতের সংখ্যা দিন দিন বাড়বেই।’



সাতদিনের সেরা