kalerkantho

রবিবার । ১০ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৫ জুলাই ২০২১। ১৪ জিলহজ ১৪৪২

বগুড়ার হাটে হাটে ‘হাসিল সন্ত্রাস’

গরুর খাজনা সর্বোচ্চ ৪০০-এর জায়গায় আদায় ১২০০ টাকা

লিমন বাসার, বগুড়া   

২০ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বগুড়ার হাটে হাটে ‘হাসিল সন্ত্রাস’

বগুড়ার মহাস্থানে কোরবানির পশুর হাট। গতকাল তোলা। ছবি : সালাহ্ উদ্দিন

কোরবানির পশু কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের হাসিল বা খাজনা সন্ত্রাসে মেতে উঠেছে বগুড়ার বিভিন্ন হাটের ইজারাদাররা। প্রায় প্রতিটি হাটে হাসিল নিয়ে বাদানুবাদ হচ্ছে কোরবানির পশু কিনতে আসা ক্রেতাদের সঙ্গে। কোনো কোনো হাটে আবার ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের কাছ থেকেই হাসিল নেওয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে একাধিক অভিযোগ করার পরেও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেছে ভুক্তভোগীরা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বগুড়ার কোরবানির পশুর হাটগুলো জমে উঠছে। স্বাস্থ্যবিধি না মেনে হাটে প্রচুর জনসমাগম হচ্ছে। আসছে প্রচুর কোরবানির পশু। সাধারণ ক্রেতার পাশাপাশি হাটে পাইকারি ক্রেতা ও ব্যাপারীদের তৎপরতা বেশি। গত বছরের চেয়ে এবার গরুর দামও বেশি। সেই সঙ্গে জেলার প্রায় সব হাটে অতিরিক্ত টোল (খাজনা) আদায়ের অভিযোগ করেছে ক্রেতারা। কোনো কোনো হাটে খাজনা আদায়ের জন্য কর্মী বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

একাধিক হাট ঘুরে দেখা গেছে, সরকারি নির্দেশনা থাকলেও জেলার কোনো হাটেই টাঙানো হয়নি টোল আদায়ের তালিকা। গরুর দাম বেশি হওয়ার ফলে বিক্রেতারা খুশি হলেও ক্রেতারা পছন্দসই গরু কিনতে হিমশিম খাচ্ছে।

বগুড়া শহর, শহরতলিসহ বেশ কয়েকটি উপজেলায় কোরবানির পশুর বড় হাট বসে। বগুড়া সদর, দুপচাঁচিয়া, শিবগঞ্জ, গাবতলী ও শাজাহানপুর উপজেলায় এ রকম বড় হাট প্রায় ১৫টি। এর বাইরেও অনেক পশুর হাট রয়েছে। বড় হাটগুলোর মধ্যে মহাস্থান হাট, ধাপেরহাট, সুলতানগঞ্জ হাট, সাবগ্রাম হাট অন্যতম। তবে কোরবানি উপলক্ষে অনেক স্থানে মৌসুমি হাট বসানো হয়। সেই হিসাব অনুযায়ী জেলায় পশুর হাট বসেছে ৫৭টি। ব্যাপারীরা এখানকার হাটগুলো থেকে কোরবানির পশু কিনে নিয়ে যাচ্ছেন ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। বিক্রেতাসহ হাট কর্তৃপক্ষ বলছে, আজ গরুর বেচাকেনা আরো বাড়বে।

বগুড়ার বড় কোরবানির পশুর হাটগুলোর অন্যতম মহাস্থান। গত বুধবার হাটের দিন দেখা গেছে, কোরবানির পশুর আমদানি অনেক। মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা বেশি হওয়ায় দামও বেশি। মহাস্থান হাটে গরু কিনতে আসা ক্রেতারা জানায়, দালালদের দৌরাত্ম্যে গরুর দাম করতে গিয়ে তাদের সমস্যায় পড়তে হয়েছে। চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ব্যাপারীরা প্রচুর গরু কিনছেন। তাই বাজার একটু চড়া। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো হাসিল সন্ত্রাস। সেখানে গরুপ্রতি এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা আদায় করা হয়েছে। ছাগলের জন্য নির্ধারিত ১০০ টাকার স্থলে আদায় হয়েছে ৫০০ টাকা।

সরেজমিনে সাবগ্রাম, ধাপেরহাট ঘুরে দেখা গেছে, জেলা প্রশাসনের নির্ধারণ করে দেওয়া টোলের কোনো তালিকা নেই। উল্টো গরুপ্রতি এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা এবং ছাগলপ্রতি ৫০০ টাকা আদায়ের অভিযোগ করেছে ক্রেতারা।

বগুড়া সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা আজিজুর রহমান বলেন, এ বছর জেলার প্রতিটি পশুর হাটে গরু-মহিষপ্রতি ৫০ হাজার টাকার ওপরে হলে সর্বোচ্চ ৪০০ টাকা এবং ৫০ হাজারের নিচে হলে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা করে আদায় করার নির্দেশনা রয়েছে। আর ছাগল-ভেড়াপ্রতি ১০০ টাকা ইজারাদার টোল (খাজনা) নির্ধারণ করে দিয়েছে জেলা প্রশাসন। সেই সঙ্গে প্রতিটি হাটে টোলের টাকা উল্লেখ করে তালিকা টাঙানোর জন্য সরকারি নির্দেশ রয়েছে। তবে কোনো হাটেই এই তালিকা টাঙানো হয়নি বলে তিনি স্বীকার করেন।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলা প্রশাসনের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে চালানো চাঁদমুহা হাটেও ৪০০ টাকার স্থলে ৮০০ টাকা করে অতিরিক্ত হাসিল আদায় করা হচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, এই হাটটি পরিচালনা করছে একটি অস্থায়ী কমিটি। এরা এই অনৈতিক কাজের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।

একাধিক ক্রেতা অভিযোগ করে জানায়, শহরের ভেতরে সুলতানগঞ্জ হাটে টোল আদায়ের জন্য কর্মী বাহিনী নিয়োগ দিয়েছেন ইজারাদার। তারা জোর করে দুই থেকে তিন গুণ বেশি টোল আদায় করছে। জানতে চাইলে এই হাটের ইজারাদার সাজু মিয়া কোনো কথা বলতে চাননি।

মহাস্থান হাটে গরুপ্রতি এক হাজার টাকা এবং ছাগলপ্রতি ৫০০ টাকা আদায় করা হচ্ছে। হাটগুলোতে খাজনা কিছুটা বেশি নেওয়ার কথা স্বীকার করে হাটের ইজারাদার রাগিবুল আহসান রিপু বলেন, ঈদের কারণে অতিরিক্ত আদায়কারী এবং হাট সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য বেশ কিছু লোক রাখতে হয়েছে। এ ছাড়া হাটের বার্ষিক ডাকে টাকার অঙ্কও বেড়েছে দ্বিগুণ। আগে এই হাটের ইজারা মূল্য সাড়ে তিন কোটি টাকা ছিল। এখন এই ইজারা মূল্য হলো ভ্যাটসহ সাত কোটি ৫০ লাখ টাকা। তিনি আরো বলেন, এবার গরুপ্রতি ক্রেতার কাছ থেকে ৮০০ টাকা এবং বিক্রেতার কাছ থেকে ২০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। আর ছাগলের জন্য নেওয়া হচ্ছে ৪০০ টাকা।

শহরের ভেতরে সাবগ্রাম ও কালীতলা হটের অবস্থা সবচেয়ে করুণ। এই হাট থেকে গরু কিনে ক্রেতারা জানায়, সেখানে ইচ্ছামতো এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত হাসিল নেওয়া হচ্ছে। হাসিলের টাকা নিয়ে প্রতিটি হাটে ইজারাদার যে স্লিপ দিচ্ছে তাতে শুধু গরুর মূল্য লেখা রয়েছে। হাসিলের অঙ্ক লেখা নেই। কোনো ক্রেতা এই রসিদ নিতে না চাইলে হুমকি-ধমকি দিয়ে তাকে হাট থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে।

বগুড়ার পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূঞা বলেন, ক্রেতা কিংবা বিক্রেতাদের হয়রানি করার যেকোনো অভিযোগ পেলে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে যে কেউ এ ব্যাপারে পুলিশের সহযোগিতা নিতে পারে।

জেলা প্রশাসক জিয়াউল হক বলেন, হাটগুলোতে অতিরিক্ত টোল আদায় রোধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। তাঁরা চেষ্টা করছেন সরকারি নির্দেশনা মেনে হাট পরিচালনা করার। তিনি বলেন, অতিরিক্ত হাসিল আদায়ের কোনো অভিযোগ তাঁর কাছে কেউ করেনি।



সাতদিনের সেরা