kalerkantho

বুধবার । ১১ কার্তিক ১৪২৮। ২৭ অক্টোবর ২০২১। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

শ্যামল দাসের লাশ মেহেদীর কাঁধে

রফিকুল ইসলাম, বরিশাল   

৫ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শ্যামল দাশ। বয়স পঞ্চান্ন ছুঁই ছুঁই। পেশায় গৃহশিক্ষক। করোনায় আক্রান্ত হয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন শনিবার মধ্যরাতে। স্ত্রী শিপ্রা রানী দাশের বাঁধভাঙা কান্নায় গোটা এলাকার বাতাস ভারী হয়ে ওঠে সে রাতে। কিন্তু তাতেও মন গলেনি আত্মীয়-স্বজনের। আর প্রতিবেশীরা করোনার ভয়ে এলাকা থেকেই পালিয়ে যায়। প্রায় আট ঘণ্টা স্বামীর মৃতদেহ আঁকড়ে পড়েছিলেন শিপ্রা। এমন খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান স্বেচ্চাসেবী মেহেদী শিকদার। করোনার ভয় উপেক্ষা করে তিনি আরো দুজনকে নিয়ে হাজির হন মৃতের বাড়িতে। ঘরে গিয়ে দেহ তুলে খাটিয়ায় করে নিয়ে গেলেন শ্মশানে। এভাবেই মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজন শ্যামলের শেষকৃত্য সম্পন্ন করলেন।

সম্প্রীতির এই দৃষ্টান্ত দেখা গেছে সাগরতীরের বরগুনা জেলার পাথরঘাটা পৌরসভার হার্ডওয়্যার পট্টিতে। ধর্মীয় হানাহানির খবরই যখন সংবাদের শিরোনাম হয়, সেই সময় যেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নজির গড়লেন পাথরঘাটার পৌর এলাকার মানুষজন। তিন ভিন্নধর্মী মানুষের কাঁধেই শেষযাত্রায় যান শ্যামল দাশ। শ্মশানেও কাঠ জোগাড় করা থেকে শুরু করে দাহ করার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত শ্যামলের পাশে ছিলেন মেহেদী, নুর আলম ও রাসেল। মেহেদী শিকদার এর আগেও করোনায় আক্তান্ত হয়ে মারা যাওয়া দুজনের লাশ দাফন করেছেন। তাঁদের একজন ছিলেন মানসিক প্রতিবন্ধী। অন্যজন হাসপাতাল রোডের নজরুল ইসলাম। তিনি ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকুরে।

বৃদ্ধ শ্যামলের দেহ সৎকারের পরে প্রশাসনের সহযোগিতায় শিপ্রা রানী এবং তাঁর একমাত্র সন্তান শ্রীতমা দাশের করোনা পরীক্ষা করা হয়েছে। শিপ্রা রানীর করোনা পজিটিভ এবং তাঁর মেয়ের করোনা নেগেটিভ রিপোর্ট এসেছে। তাঁরা দুজন হার্ডওয়্যার পট্টির বাসায় অবস্থান করছেন। প্রশাসনের তরফ থেকে তাঁদের সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। মেহেদী ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু শুকনো খাবার শ্যামলের স্ত্রী আর মেয়েকে দিয়েছেন। যদি তাঁরা দুপুরের খাবার গ্রহণ করেন, সেই দায়িত্বও কাঁধে নিয়েছেন।

শিপ্রা রানী সাংবাদিকদের জানান, স্বামী-সন্তান নিয়ে তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে পৌর এলাকায় থাকতেন। তাঁর আত্মীয়-স্বজন সবাই বাইরে থাকে। মূলত পাড়ায় পাড়ায় শিশুদের পড়িয়ে শ্যামল সংসার চালাতেন। হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। তিন দিন আগে পাথরঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে করোনার স্যাম্পল দিয়ে আসেন। ওই দিন হাসপাতাল থেকে জানিয়ে দেওয়া হয় তিনি করোনা পজিটিভ। সেই থেকেই শ্যামল ঘরের মেঝেতে থাকছেন।

শিপ্রা রানী আরো বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে আমি জ্বরে ভুগছিলাম। শনিবার জ্বরের সঙ্গে আমারও শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকে। স্বামীর ঠিকমতো যত্ন নিতে পারছিলাম না।’ শনিবার রাতে তাঁর স্বামীর শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। রাত আনুমানিক ২টার দিকে তিনি দেহ ত্যাগ করেন।

শিপ্রা বলেন, ‘তখন আমি আরো ভয়ে কুঁকড়ে যাই। কাছের আত্মীয়-স্বজনের খবর দিয়েছি। প্রতিবেশীদের সহযাগিতা চেয়েছি। কিন্তু কেউই আমার পাশে দাঁড়ায়নি। মৃতদেহ নিয়ে প্রায় আট ঘণ্টা আমি ঘরের মধ্যে ছিলাম। সকাল (গতকাল রবিবার সকাল) পৌনে ১০টার দিকে মেহেদী শিকদার নামের এক যুবক প্রথম ঘরে ঢোকেন। তাঁর সঙ্গে আরো তিনজন ছিলেন। তারা ঘর থেকে দেহ নামিয়ে শ্মশানে নিয়ে যান। তার পর কী হয়েছে আমি কিছুই জানি না। সকাল ১১টার দিকে মেহেদী আবার এসে আমাদের দুজনকে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন। সঙ্গে প্রশাসনের গাড়ি ছিল। তবে আমরা মা-মেয়ে রিকশাযোগে হাসপাতালে গিয়ে নমুনা দিয়েছি। শুনেছি, আমি নাকি করোনায় আক্রান্ত। আমি যদি না ফেরার দেশে পাড়ি জমাই, তবে আমার পাশেও স্বজন কিংবা প্রতিবেশীরা দাঁড়াবেন না। এটা ভাবতেই পারছি না।’

স্বেচ্ছায় রক্তদান ও সামাজিক সংগঠন ‘প্রত্যয়’র সভাপতি মেহেদী শিকদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্থানীয় এক যুবক মুঠোফোনে বিষয়টি জানায়। আমি সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখি, ঘরের মেঝেতে শ্যামলের লাশ। লাশের পাশেই ছিলেন স্ত্রী। ঘরের মধ্যে তো দূরে কথা প্রতিবেশীদের কেউ তাঁদের ঘরের আশপাশেই আসেননি। শ্যামলের করোনায় মৃত্যুর খবর জেনে প্রতিবেশী পুরুষ লোকেরা আগেভাগেই বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। হার্ডওয়্যারের ব্যবসায়ী নূর আলম, কিশোর রাসেলকে নিয়ে আমি ঘরে যাই। তিনজন চেষ্টা করেও লাশ বাইরে নিয়ে আসতে পারছিলাম না। পৌরসভার মর্কেটের দিকে এগিয়ে যাই। সেখানে গিয়ে শিপন কর্মকারের সঙ্গে দেখা হয়। শিপনকে অনেক অনুরোধ করে শ্যামলের বাসায় নিয়ে আসি। পরে আমরা চারজনে লাশ ঘর থেকে নামিয়ে বাইরে নিয়ে আসি। দেহ তুলে খাটিয়ায় করে ভ্যানযোগে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরের শ্মশানে আমরাই নিয়ে যাই। এমনকি শ্যামলের দেহ খাটিয়ায় করে আমরাই চিতায় তুলে দিই। তারপর শ্মশানের পুরোহিত হিন্দু রীতি অনুযায়ী শ্যামলের দেহ সৎকার করেন। এই দীর্ঘ সময়ে শ্যামলের প্রতিবেশী কিংবা স্বজনদের দেখা পাইনি।’