kalerkantho

রবিবার । ৮ কার্তিক ১৪২৮। ২৪ অক্টোবর ২০২১। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

নাগরিক প্ল্যাটফর্মের ব্রিফিং

নতুন দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের জন্য বাজেটে কিছু নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৭ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



দেশে এত দিন তথ্য-উপাত্তের ঘাটতি ছিল, এখন তা তথ্য নৈরাজ্যের দিকে যাচ্ছে। করোনাকালে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়া মানুষের তথ্য-উপাত্ত নেই। সে কারণে নীতিগতভাবে বলা যায়, বাজেটে তাদের জন্য কিছু রাখা হয়নি। এ ছাড়া অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসায়ী ও মধ্যবিত্তের জন্যও বাজেটে কিছু নেই। প্রস্তাবিত বাজেটে দারিদ্র্য বিমোচনে প্রকৃত অর্থে বরাদ্দ বাড়েনি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সমস্যাও বাজেটে প্রতিফলিত হয়নি। আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের কাছ থেকে এসব অভিমত এসেছে।

গতকাল রবিবার ‘প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট ২০২১-২২ : পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য কি আছে’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিং ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত হয়।

বিফ্রিংয়ের মূল উপস্থাপনায় নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘যেহেতু করোনা মহামারিকালীন নতুন দরিদ্র মানুষের কোনো পরিসংখ্যান আমাদের নেই, সেহেতু নীতিগতভাবে বাজেটে তাদের জন্য কিছু রয়েছে বলে আমরা মনে করি না।’ তিনি আরো বলেন, ‘নতুন দরিদ্র, অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসায়ী ও মধ্যবিত্তের জন্য এই বাজেট প্রস্তাব করা হয়নি। এই বাজেট মূলত বড় ব্যবসায়ীদের জন্য।’

ড. দেবপ্রিয় বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেটে দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য প্রকৃত অর্থে বরাদ্দ বাড়ানো হয়নি। তাহলে প্রশ্ন জাগে, প্রস্তাবিত বাজেটে দারিদ্র্য বিমোচনে কতটুকু অর্থ বরাদ্দ দিল সরকার? প্রস্তাবিত বাজেটে বলা হয়েছে, দারিদ্র্য বিমোচনে সরকার যে ব্যয় করবে তা জিডিপির ১০.৫ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরে ছিল ১০ শতাংশ। আমাদের পর্যালোচনা মতে, দারিদ্র্য বিমোচনে প্রকৃত অর্থে সরকারের ব্যয় বাড়বে না। তাহলে কিভাবে নতুন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখা হলো?’ তিনি বলেন, ‘বাজেটে যেসব সংস্কারের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা বড় ব্যবসায়ীদের জন্য সুবিধাজনক। এখানে ভোক্তা সম্পর্কে কোনো আলোচনাই করা হয়নি।’

নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক বলেন, ‘দেশে ন্যূনতম দারিদ্র্যসীমা ১০ থেকে বেড়ে ১৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে যা ৩৫ থেকে ৪৩ শতাংশের বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। স্বাস্থ্য, শ্রম, গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, নারী ও শিশু অধিদপ্তর, সেতু বিভাগ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ব্যয়কেও দারিদ্র্য বিমোচনের অংশ হিসেবে ধরা হয়েছে। সরকারকে এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা দিতে হবে। কিভাবে এসব খাতের ব্যয় প্রত্যক্ষ দারিদ্র্য বিমোচনের আওতায় আসবে সে বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি।’

বাজেটে কর্মসংস্থান নিয়ে স্বচ্ছ ধারণা নেই উল্লেখ করে ড. দেবপ্রিয় বলেন, ‘দেশের কর্মক্ষমদের ৫০ শতাংশই যুবক। এসব জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান বিষয়ে বাজেটে স্বচ্ছ ধারণা নেই। প্রস্তাবিত বাজেটের এক জায়গায় বলা হয়েছে যে প্রযুক্তি খাতে ১০ লাখ যুবকের কর্মসংস্থান হয়েছে। অথচ আমরা জানতে পারলাম না। এ তথ্য কোথা থেকে এলো, তার উৎস সম্পর্কে বলা নেই।’ তিনি বলেন, ‘এই যে বেসরকারি শিক্ষা খাতে ১৫ শতাংশ ভ্যাটের প্রস্তাব করা হয়েছে, এটা যে ভোক্তার কাঁধে আসবে না তার কোনো গ্যারান্টি আছে?’

সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে. চৌধূরী বলেন, ‘করোনার কারণে শিক্ষা খাত বিপর্যয়ের বিষয়টি বাজেটে আনা হয়নি। অনলাইনে সচ্ছল পরিবারের সন্তানরা বেশি ক্লাস করছে। কিন্তু পিছিয়ে পড়া ও দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা একদমই ক্লাস করতে পারছে না। তাদের বিষয়ে সরকার তেমন কিছুই বাজেটে ভাবেনি। বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষায় এই সময়ে অনেক ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু এই খাতে আলাদা করে কোনো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। উল্টো শিক্ষার বরাদ্দের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বরাদ্দ।’ তিনি আরো বলেন, ‘নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নিয়ে কোনো কথা বাজেটে বলা হয়নি, নেই কিন্ডারগার্টেন বন্ধ হওয়া প্রসঙ্গে কোনো শব্দ। তাই বলা যায়, এই বাজেট শিক্ষাবান্ধব হয়নি।’

সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘পিছিয়ে পড়া বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিতে হলে সবার আগে যথাযথ তথ্য-উপাত্ত জরুরি, যা বাজেটে নেই। যদি এটার পরিমাপ করতেই না পারি তাহলে বাস্তবায়ন কিভাবে করব? তবে বাজেটে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের ছাড় যথেষ্ট নয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘করোনাকালে অনেকে নতুন দরিদ্র হয়েছে, অনেকের আয় কমেছে। সেই জায়গায় সরকারকে নজর দিতে হবে।’

স্বাস্থ্য কমিশন গঠনের সুপারিশ করে এসডিজি (সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল) প্ল্যাটফর্মের কোর গ্রুপের সদস্য ও জনস্বাস্থ্যবিদ মোশতাক রাজা চৌধুরী বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতের মৌলিক সমস্যা সম্পর্কে কোনো বক্তব্য নেই। সংস্কারের উদ্যোগ নেই। মাননীয় অর্থমন্ত্রী ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছেন। তিনি প্রতি মাসে ২৫ লাখ মানুষকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনার কথা বলেছেন। তাতে ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকা দিতে সময় লাগবে পাঁচ বছর, যা বাস্তবসম্মত নয়।’



সাতদিনের সেরা