kalerkantho

বুধবার । ১১ কার্তিক ১৪২৮। ২৭ অক্টোবর ২০২১। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

বিটিআরসির ‘স্বাধীনতা’ বিলুপ্ত করতে গণমত আহবান

টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের উদ্যোগ
নিজস্ব তহবিলে রাখার বদলে সব আয় সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে

কাজী হাফিজ   

৩১ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) ‘স্বাধীনতা’ বিলুপ্ত করার উদ্যোগ বাস্তবায়নে গণমত আহবান করেছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ। এ বিষয়ে ওয়েবসাইটে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনের খসড়া প্রকাশ করে আগামী ২৪ জুনের মধ্যে ই-মেইলে মতামত চেয়ে সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

খসড়ায় ২০০১ সালের মূল আইনের শিরোনাম অংশের ‘স্বাধীন কমিশন প্রতিষ্ঠা’র স্থলে ‘কমিশন প্রতিষ্ঠা’ প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। প্রস্তাবনা অংশেও আনা হয়েছে একই পরিবর্তন। ২০০১ সালে প্রণীত টেলিযোগাযোগ আইনের প্রস্তাবনায় বলা ছিল, ‘যেহেতু বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও দক্ষ নিয়ন্ত্রণ এবং টেলিযোগাযোগ সেবা নিয়ন্ত্রণের নিমিত্তে একটি স্বাধীন কমিশন প্রতিষ্ঠা, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতা, কার্যাবলি ও দায়িত্ব কমিশনের কাছে হস্তান্তর এবং আনুষঙ্গিক বিষয়াদি সম্পর্কে বিধান করা সমীচীন; সেহেতু এতদ্দ্বারা নিম্নরূপ আইন করা হইল।’ এই অংশটি থেকে স্বাধীন শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছে।

বিদ্যমান আইনের ২১ ধারায় টেলিযোগাযোগ খাত থেকে আয় বিটিআরসির নিজস্ব তহবিলে জমা রাখার বিধান রয়েছে। তা সংশোধন করে সরকারি কোষাগারে জমার বিধান করা হয়েছে। মূল আইনে বিটিআরসির কোনো কমিশনারকে অপসারণ করতে তদন্তের দায়িত্ব রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের হাতে। এটি সংশোধন করে তদন্তের দায়িত্ব থেকে বিচারপতিদের নাম বাদ রাখা হয়েছে।

এর আগে ২০১০ সালে মূল আইন সংশোধন করে প্রস্তাবনা অংশে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের ‘ক্ষমতা’ পরিবর্তন করে কতিপয় ক্ষমতা করা হয়। মূল আইনে ৩১ ধারায় কমিশনের ক্ষমতা বিষয়ে বলা ছিল, কমিশন টেলিযোগাযাগ সেবা বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের লাইসেন্স প্রদান ও তা বাতিল করা, বেতার ফ্রিকোয়েন্সি বরাদ্দ, টেলিযোগাযোগ সেবার ট্যারিফ, কলচার্জ নির্ধারণ ইত্যাদির ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে। এই ক্ষমতা আংশিক খর্ব করে ২০১০ সালের সংশোধিত আইনে লাইসেন্স দেওয়া, লাইসেন্স হস্তান্তর বা বাতিল করার ক্ষেত্রে সরকারে অনুদান নেওয়ার বিধান করা হয়। এবার সংশোধনী খসড়ায় বেতার ফ্রিকোয়েন্সি বরাদ্দ, এর ব্যবহারের কর্তৃত্ব প্রদান, বেতার ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহারের পরিবীক্ষণ ও স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনাতেও সরকারের অনুমতি নেওয়ার বিধান করা হয়েছে।

মূল আইনের ২১ ধারায় বলা ছিল, কমিশনের ‘বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন তহবিল’ নামে একটি তহবিল থাকবে। ওই তহবিলে বিভিন্ন অনুদান, প্রাপ্ত ঋণ ও টেলিযোগাযোগ খাত থেকে বিভিন্ন আয়ের টাকা জমা হবে। এই বিধান সংশোধন করে সংশোধিত আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, এসব টাকা সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে।

এবারের খসড়ায় আইনটির প্রয়োগ অংশে নতুন একটি উপধারা সংযুক্ত করে তাতে বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের বাইরে থেকে এ দেশের কোনো টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা বা যন্ত্রপাতি বা বেতার ব্যবস্থার সাহায্যে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে, তাহলে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে এই আইন এমনভাবে প্রয়োগ করা যাবে যে অপরাধটি বাংলাদেশের ভেতরেই সংঘটিত হয়েছে।

মূল আইনের ৭১ ধারায় টেলিফোনে আড়ি পাতার অপরাধ সম্পর্কে শুধু টেলিফোনে আলাপের কথা বলা আছে। সংশোধনীর খসড়ায় টেলিফোনে আলাপের সঙ্গে টেলিযোগাযোগ মাধ্যমে ভাবের আদান-প্রদানের বিষয়টিও যুক্ত করা হয়েছে।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের এই উদ্যোগে হতাশ বিটিআরসির কর্মকর্তারা। গত বছরের অক্টোবরে বিটিআরসিকে এই খসড়া পাঠিয়ে মতামত দিতে বলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ। বিটিআরসির তৎকালীন চেয়ারম্যান মো. জহিরুল ইসলাম তখন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘টেলিযোগাযোগ আইন এভাবে সংশোধন করা হলে বিটিআরসির মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যাবে। এতে আমলাতন্ত্রের কবলে পড়বে টেলিযোগাযোগ খাত এবং এর নিয়ন্ত্রণে স্বচ্ছতা থাকবে না।’

বিষয়টি সম্পর্কে বিটিআরসির বর্তমান চেয়ারম্যান শ্যাম সুন্দর শিকদার গত শনিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এ বিষয়ে যখন বিটিআরসির মতামত চেয়েছিল, তখন আমি এ প্রতিষ্ঠানে ছিলাম না। আমার জানামতে তখন বিটিআরসির মতামত নিয়েই খসড়াটি করা হয়েছে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের আহ্বান অনুসারে আমাদেরও মতামত দেওয়ার সুযোগ আছে। আমরা আমাদের মতামত জানাব।’

আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান লার্ন এশিয়ার সিনিয়র পলিসি ফেলো আবু সাঈদ খান বলেন, “এভাবে আইন সংশোধনের মাধ্যমে বিটিআরসিকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অধীন একটি সরকারি দপ্তরে পরিণত করা হচ্ছে। এটি দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রণভার টেলিযোগাযোগ অধিদপ্তর বা ‘ডট’কে দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া বলেই মনে হয়।”



সাতদিনের সেরা