kalerkantho

মঙ্গলবার । ৮ আষাঢ় ১৪২৮। ২২ জুন ২০২১। ১০ জিলকদ ১৪৪২

স্বাস্থ্যবিধি মানার বালাই নেই

মোবারক আজাদ   

১১ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



স্বাস্থ্যবিধি মানার বালাই নেই

সকাল সাড়ে ১১টা। রাজধানীর কড়াইল বস্তির বেলতলা এলাকায় আব্দুল মালেকের চায়ের দোকান। ছোট্ট ওই দোকানে ১০-১২ জন লোক ঠাসাঠাসি করে বসে চা খাচ্ছে আর টিভি দেখছে। কারো মুখেই মাস্ক নেই। এর মধ্যে আট থেকে ১০ বছরের দুটি শিশু রয়েছে। কারো মুখে মাস্ক না থাকা এবং স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণ জানতে চাইলে মালেক পান চিবাতে চিবাতে বলেন, ‘এহানে এগুলা মানা সম্ভব না। লোকজন আহে, চা খায়, আড্ডা দেয়; না তো আর করা যায় না! তয় এ এলাকায় কোনো করোনা আছে, এ পর্যন্ত শুনিনি।’

একই এলাকার আরমান স্টোর নামের একটি দোকানের ভিতর-বাহির মিলিয়ে ১২ থেকে ১৫ জন ঠাসাঠাসি করে বসে-দাঁড়িয়ে টিভি দেখছে আর চা খাচ্ছে। এর আগে  সকাল ১১টায় টিঅ্যান্ডটি মহিলা কলেজের সামনের রাস্তায় গাদাগাদি করে বিভিন্ন বয়সের মহিলারা টিসিবির গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলেন। গতকাল শনিবার এভাবে কোনো ধরনের স্বাস্থ্যবিধি না মেনে চলার এমন দৃশ্য কড়াইল বস্তি এলাকার  বেলতলা, আদর্শনগর, খামারবাড়ি, কাজী মার্কেট, বৌবাজার,  ঝিলপারসহ বিভিন্ন এলাকার বাজার ও দোকানে দেখা গেছে। এমনকি অনেক ফার্মেসিতেও ওষুধ বিক্রেতাদের মুখে মাস্ক ছিল না।

রাজধানীর অন্যতম বৃহৎ কড়াইল বস্তিতে প্রায় ৩০ হাজার ঘরে প্রায় দেড় লাখ মানুষের বসবাস। এখানে মানুষের পিঠে মানুষ—এমন অবস্থা। এই ঘিঞ্জি এলাকার মানুষজনের করোনা মহামারি শুরুর সময় থেকে স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে অনীহা ছিল। এখনো তা-ই রয়ে গেছে। করোনার টিকা, স্বাস্থ্যবিধি মানা, লকডাউনে তারা বিশ্বাসী নয়। তাদের চাওয়া—‘টিকা-মিক্যা লাগব না, সরকার থেকে পারলে চাউল-ডাউলের ব্যবস্থা করে দেউক কেউ।’ এ পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়ে কড়াইল বস্তি এলাকায় কেউ মারা গেছে বলে জানা যায়নি। অন্যদিকে সরকার নির্ধারিত সময়ে দোকানপাট বন্ধ ও খোলার বিষয়টিও এখানে মানা হচ্ছে না। আগামী বুধবার থেকে সরকারের নির্ধারিত লকডাউনও তারা কতটা মানবে তা পরিষ্কার নয়।

আদর্শনগরের আরগন ফার্মাসিউটিক্যালের ওষুধ বিক্রেতা মুরছালিন কালের কণ্ঠকে বলেন, এখানে নিম্ন আয়ের মানুষজনের বসবাস। কায়িক শ্রম করে বলে করোনা তাদের কিছু করতে পারবে না, এটা তাদের বিশ্বাস। এ সময় মুরছালিনের মুখে মাস্ক নেই কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মাস্ক তো পরি। ভিড় কম, তাই এখন মাস্ক পরা হয়নি।’

ঝিলপার এলাকার কাপড় বিক্রেতা আমির হোসেন (৫৫) বলেন, ‘আমি করোনা বুঝি না। এই রোগ বড়লোকের জন্য, এ এলাকা গরিবের এলাকা। আল্লাহরে ভয় না পাইয়া, করোনারে ভয় পাইলে হইব? তয় করোনাতে আমাদের ব্যবসা মন্দা, এ জন্য সরকার কিছু করলে বালা হইত। কারণ লকডাউনে যদি পুলিশের কড়াকড়ি ব্যবস্থা থাকে, তবে দোকান তো বন্ধ রাখতে হইব।’

বউবাজারে সবজি বিক্রেতা মো. মনির বলেন, ‘এখানে সবাই শ্রমজীবী মানুষ। কেউ রিকশা-ভ্যান চালায়, মাটি কাটে, নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করে, রাস্তায় ঘুরে ঘুরে নানা ধরনের হকারের কাজ করে। তাই অল্প-স্বল্প অসুস্থ হলেও কেউ করোনা পরীক্ষা করায় না। কেউ মারা গেলে জ্বর, স্ট্রোক করে মারা যায় ধরে নেওয়া হয়। তবে যারা মারা যায়, তারা বয়স্ক লোক। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এখানে স্বাস্থ্যবিধি মানার চাপ সৃষ্টি করা হয় না। কারণ এখানকার বেশির ভাগ ঘর আট হাত বাই আট হাত। এসব ঘরে পাঁচ-ছয়জনের বসবাস। তাই এই গরমে লকডাউনেও ঘরে থাকা সম্ভব না। ঘরের চেয়ে বাইরে আরাম, তাই রাস্তায় রাস্তায় ঘুরব। তবে মেইন রাস্তায় পুলিশের ভয়ে যাইতে পারব না।’

খামারবাড়ির মুদি দোকানি ডলি বেগম বলেন, ‘আমাগো ঠাসাঠাসি পরিবেশে বসবাস। টিভিতে যা দেহায় আর কয়, এগুলা আমাগোর পক্ষে মানা সম্ভব না। আল্লাহরই রহমত, সেই জন্য আমাগোর ধারেকাছে কারো করোনা হয়ও নাই, কেউ টিকাও দেয় নাই।’

মমতাময়ী কড়াইল প্যালিয়েটিভ কেয়ার কমিউনিটি সেন্টারের সহকারী সাজেদা আক্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, কড়াইল বস্তি এলাকায় স্বাস্থ্যবিধি মানা হয় না। বস্তিবাসী নিম্ন আয়ের মানুষ, কেউ টেস্ট করায় না। যারা করিয়েছে, তাদেরও নেগেটিভই আসছে।