kalerkantho

রবিবার। ২২ ফাল্গুন ১৪২৭। ৭ মার্চ ২০২১। ২২ রজব ১৪৪২

জঙ্গিবাদ ছেড়ে ‘নব দিগন্তের পথে’

অবশেষে ছেলের ডাক শুনলেন বাবা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৫ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



অবশেষে ছেলের ডাক শুনলেন বাবা

ভুল বুঝতে পেরে জঙ্গিবাদ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চান এই তরুণ। গতকাল র‌্যাব সদর দপ্তরে এই আয়োজন তাঁকে বরণ করে নিতেই। ছবি : কালের কণ্ঠ

সাড়ে তিন বছর পর ছেলে শাওন মুনতাহা ইবনে শওকতকে (৩৪) বুকে ফিরে পেলেন বাবা শওকত রহমান। আবেগাপ্লুত এই বাবা বললেন, ‘কত দিন বাবা ডাক শুনিনি। শুনেছি শাওন বিয়ে করেছে, সন্তান হয়েছে। বউমা আর নাতি দুটোকে কখনো দেখিনি। অপেক্ষায় ছিলাম। আজ সে অপেক্ষা কাটল।’

সিলেটের বাসিন্দা শওকত রহমান তাঁর ছেলেকে ফিরে পেলেন ‘নব দিগন্তের পথে’ নামের অনুষ্ঠানে। এই আয়োজন জঙ্গিবাদের অন্ধকার থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আয়োজন। র‌্যাবের ডি-র‌্যাডিক্যালাইজেশন কার্যক্রমের মাধ্যমে এই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে স্বজনদের ফিরে পেয়ে শওকত রহমানের মতো অন্যরাও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। একইভাবে শওকত রহমানের ছেলে প্রকৌশলী শাওন মুনতাহা ইবনে শওকতসহ ৯ জন জঙ্গিও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ পেয়ে আবেগ দমিয়ে রাখতে পারেননি।

শওকত রহমান তাঁর ছেলেসহ অন্যদের নতুন করে বাঁচার সুযোগ দেওয়ায় র‌্যাবের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘সন্তানরা যাতে জঙ্গিবাদের মতো বিপথে না যায়, সে জন্য সব থেকে বেশি মা-বাবাকে সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে।’

একই মঞ্চে প্রতিক্রিয়া জানালেন শওকত রহমানের ছেলে শাওন মুনতাহা, যিনি স্ত্রী ডা. নুসরাত আলী জুহি ও দুই শিশুসন্তান নিয়ে ছিলেন কথিত হিজরতে। শাওন মুনতাহা বলেন, ‘২০০৯ সালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে থেকে আমি জঙ্গি সংগঠনের দাওয়াতি কার্যক্রমে যুক্ত হই। ২০১৬ সালে হিজরত করে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হই। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় ও আত্মগোপনের জীবনে চরম নিরাপত্তাহীনতায় পড়েছিলাম। আমার সন্তান-স্ত্রীকে চরম বিপদে ফেলি। একটা পর্যায়ে বুঝতে পারি ধর্মীয় ভুল ব্যাখ্যার শিকার হয়েছি। তখন নতুন করে বাঁচার ইচ্ছা জাগে। প্রথমে দ্বিধা ছিল, ভয় ছিল। র‌্যাবের সহায়তায় তা সম্ভব হয়েছে। আজ এক নতুন শাওনের জন্ম হলো।’

শাওনের মতো অন্যরাও জঙ্গিবাদের অন্ধকার জীবন থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার ব্যবস্থা করায় সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। আত্মসমর্পণ করা বাকি আটজন হলেন আবিদা জান্নাত আসমা ওরফে রাইসা, কুমিল্লার আবদুর রহমান সোহেল, চাঁদপুরের মোহাম্মদ হোসেন ওরফে হাসান গাজী, সাইফুল্লাহ, ঝিনাইদহের সাইফুল ইসলাম, চুয়াডাঙ্গার আবদুল্লাহ আল মামুন  ও সাইদুর রহমান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সিনিয়র সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দীন, আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ, র‌্যাবের মহাপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ, এফবিসিসিআই প্রেসিডেন্ট শেখ ফজলে ফাহিমসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তথ্য, উপাত্ত, গবেষণা ও ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝান কেন জঙ্গিবাদ ভুল পথ; জিহাদের নামে সহিংসতা, হত্যা ও আত্মঘাতী হওয়াটা কতটা ভুল।

প্রধান অতিথি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা শুধু জঙ্গিবাদ কঠোর হস্তে দমন করছি তাই নয়, পাশাপাশি ডি-র‌্যাডিক্যালাইজশনের মাধ্যমে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি। যারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরছে তাদের ট্রাক্টর, কৃষি উপকরণ, নগদ টাকা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।’ এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রীর এ বিষয়ে দেওয়া ‘জিরো টলারেন্সে’র ঘোষণা এবং জঙ্গিবাদের মূলোৎপাটনে সফলতার কথা তুলে ধরেন।

জঙ্গিবাদ ছাড়ার আহ্বান তাঁদের : জঙ্গিবাদ ছেড়ে ফিরে আসা রাইসা জানালেন, ফেসবুকে এক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় থেকে গড়ে ওঠা সম্পর্ক এবং পালিয়ে গিয়ে বিয়ের পর কিভাবে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়েন তিনি। রাইসা বলেন, ‘আমি অবশেষে বুঝতে পেরেছি, আমি ভুল পথে ছিলাম। আমি চাই না আর কেউ ভুল করুক।’ তিনি তাঁর পলাতক স্বামীকেও ফিরে আসার আহ্বান জানান। সবারই নিজের আত্মিক ও মানসিক পরিচর্যা নেওয়া উচিত মন্তব্য করে রাইসা বলেন, ‘কোনো কিছু অন্ধভাবে বিশ্বাস করা যাবে না।’

র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সরোয়ার বলেন, ‘জঙ্গিবাদ একটা ধারণা, বিশ্বাস। এটা ভুল পথে যাওয়া ব্যক্তির মস্তিষ্কে ও হৃদয়ে থাকে। শুধু বন্দুক দিয়ে তা দূর করা যাবে না। ডি-র‌্যাডিক্যালাইজেশনের মাধ্যমে যারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে, তাদের মানসিক, সামাজিক ও আর্থিক সহায়তা দিতে হবে।’

মন্তব্য