kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৯ জুলাই ২০২১। ১৮ জিলহজ ১৪৪২

তদারকির ‘অভাব’ রেস্তোরাঁয় মানহীন খাদ্যে ঝুঁকি ভোক্তার

রোকন মাহমুদ   

২ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বিধিবহির্ভূতভাবে রাস্তার পাশে করা হচ্ছে রান্নাঘর। অস্বাস্থ্যকর, অপরিচ্ছন্ন রান্নার পরিবেশ। খাদ্যের অযৌক্তিক দাম। পচা-বাসি খাবার পরিবেশন। রান্নায় দীর্ঘদিনের পোড়া তেল ব্যবহার। রান্নাঘরের ধোঁয়ায় ভোগান্তি পথচারীদের। নেই প্রয়োজনীয় টয়লেট-ওয়াশরুম। এমন নানা সমস্যা নিয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা, পাড়া-মহল্লা, অলিগলির যত্রতত্র গড়ে উঠছে হোটেল-রেস্তোরাঁ।

  লাইসেন্স দেওয়ার আগে নিশ্চিত করা হচ্ছে না এসব হোটেল-রেস্তোরাঁর পরিবেশ ও মান। ফলে একদিকে ভোক্তারা ঠকছে খাবারে, অন্যদিকে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। দিনের পর দিন এভাবে চললেও দেখার কেউ নেই। নামমাত্র কিছু অভিযানে সীমাবদ্ধ তদারকির কার্যক্রম। মানের ভিত্তিতে গ্রেডিং করার কার্যক্রমও থেমে আছে। জরিমানাই স্থায়ী সমাধান নয় বলে মনে করছেন খোদ রেস্তোরাঁ মালিকরাও। লোক-দেখানো অভিযানের পরিবর্তে লাইসেন্স দেওয়ার আগেই সব কিছু যাচাই-বাছাই করার কথা বলছেন তাঁরা।

বাংলাদেশ হোটেল ও রেস্তোরাঁ-২০১৬ (সংশোধিত) বিধি অনুসারে দেশের হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোকে এ, বি, সি ও ডি এই চার ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে। সবশ্রেণির রেস্তোরাঁর জন্যই রয়েছে ন্যূনতম ২৪ ধরনের বিধি। পরিষ্কার রান্নাঘর, রান্না ও বাসনপত্র ধোয়ার পরিষ্কার বিশুদ্ধ পানির ব্যবহার, রান্নায় ভালো বা ফ্রেশ তেল ব্যবহার, পরিবেশনকারীদের নির্দিষ্ট পোশাক। এ ছাড়া খাবার টেবিলে রান্নাঘরের ধোঁয়া আসা যাবে না, উচ্ছিষ্ট খাবার অপসারণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা, উন্নত ও স্বাস্থ্যসম্মত ওয়াশরুম, এ ও বি শ্রেণির জন্য ন্যূনতম দুটি টয়লেট, সি এবং ডি শ্রেণির জন্য কমপক্ষে একটি টয়লেট, প্রশিক্ষিত বাবুর্চি দিয়ে রেস্তোরাঁ পরিচালনা, প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের ব্যবস্থা ও নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থা থাকতে হবে বিধি অনুসারে। যুক্তিসংগত মূল্য তালিকা, অভিযোগ বাক্স থাকা, বেচে যাওয়া খাবার যথাযথ সংরক্ষণব্যবস্থা ইত্যাদি বিষয়গুলোও রয়েছে বিধিতে। বাসি বা পুরনো তেল ব্যবহার ও উন্মুক্ত স্থান বা রাস্তার পাশে রান্না নিষিদ্ধ করা হয়েছে বিধিতে।

রাজধানী এবং এর আশপাশের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এসব বিধির কোনোটিই ঠিকমতো মানছে না হোটেল রেস্তোরাঁগুলো। কিছু নামি-দামি হোটেল-রেস্তোরাঁ এসব বিধি মানলেও মাঝেমধ্যে তাদের বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ উঠছে।

রাজধানীর মতিঝিল, পল্টনসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, কোনো রেস্তোরাঁতেই ভালো কোনো টয়লেট নেই। আগের দিনের পোড়া তেল ফেলে দেওয়ার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রতিটিরই রান্নাঘর রয়েছে রাস্তার পাশে এবং ধোঁয়াগুলো ঠেলে দেওয়া হচ্ছে রাস্তার দিকে। বাতাস যাচ্ছে রেস্তোরাঁর ভেতরেও। কর্মচারীদের নেই পরিচ্ছন্নতার বালাই।

বিভিন্ন সংস্থার অভিযানেও উঠে আসছে নানা অনিয়মের চিত্র। গত ১৩ অক্টোবর বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ অভিযান চালিয়ে ফ্রিজারে লেবেলবিহীন খাদ্য, ঢাকনাবিহীন দই, অনুমোদনহীন ও লেবেলবিহীন রং, দুধ, মিষ্টি তৈরির কাঁচামাল রাখার অপরাধে মতিঝিলের হিরাঝিল হোটেলকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। ১৯ অক্টোবর গুলশান-২ টনি রোমাস রেস্টুরেন্টের রান্নাঘর ও স্টোররুম থেকে লেবেলবিহীন লিক্যুইড স্মোক, পাইনাপেল জুস, বিফ পেটি, মাশরুম এবং মিথ্যা লেবেলযুক্ত ভিনেগার ও পাস্তা, এক ড্রাম পোড়া তেল জব্দ করা হয়। কাঁটাবনে নিউ অষ্টব্যঞ্জন রেস্টুরেন্ট, কমলাপুরের হোটেল আল ফারুক অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, তোপখানা রোডের ঢাকা হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট ও ক্যাফে ঝিল, তেজগাঁও রূপচাঁদা রেস্টুরেন্টকে নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রান্না ও খাদ্য উপকরণ রাখা, লাইসেন্স না থাকাসহ নানা অপরাধে বিভিন্ন দণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বলছে, গত জুলাই থেকে ডিসেম্বরের ২১ তারিখ পর্যন্ত শুধু রাজধানীতে ৬০টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়; এ সময় ৭৩টি প্রতিষ্ঠানকে নানা অভিযোগে ৮৭ লাখ টাকা জরিমানা ও মামলা করা হয়, দুজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০১৯-২০ সালে রাজধানীতে ১৩৪টি অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় ১৪১টি হোটেল-রেস্তোরাঁকে বিভিন্ন অপরাধে শাস্তি দেওয়া হয়, ১৩৭টি মামলা করা হয়, জরিমানা আদায় করা হয় দুই কোটি ৬২ লাখ টাকা, ১৩ ব্যক্তিকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আগের বছর ৬০টি অভিযানে ৭৩টি প্রতিষ্ঠানকে দণ্ড দিয়ে আদায় করা হয় ৮৭ লাখ টাকা জরিমানা।

বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সহসভাপতি আনোয়ার হোসেন মৃধা কালের কণ্ঠকে বলেন, অনেক রেস্তোরাঁ রয়েছে, যাদের ভালো একটি ওয়াশরুম বা টয়লেট নেই। কোনো রকম একটি জায়গা নিয়ে রাস্তার পাশে রেস্তোরাঁ খুলে বসেছে। বেশির ভাগ রেস্তোরাঁকে কোনো গ্রেডেই রাখা উপযুক্ত নয়। এর অন্যতম কারণ হলো লাইসেন্স দেওয়ার আগে এসব বিষয় দেখা হচ্ছে না।

সমিতির মহাসচিব এম রেজাউল করিম সরকার রবিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরাও চাই হোটেল রেস্তোরাঁগুলো একটি নিয়ম ও শৃঙ্খলার মধ্যে ভালো মান নিয়ে পরিচালিত হোক। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমাদের হাতে সচেতনতার প্রচার ছাড়া কোনো ক্ষমতা নেই। অভিযান আর জরিমানাই এসব সমস্যার সমাধান নয়। মূল জায়গায় হাত দিতে হবে। অভিযানগুলোও সব সময় সঠিক নিয়মে হয় না। মাঝেমধ্যে এমন সব কারণে জরিমানা করা হয়, যা খুবই সামান্য। এ ছাড়া মান সনদ দিচ্ছে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। কিন্তু অভিযান পরিচালনা করে ভোক্তা অধিদপ্তরসহ পাঁচ থেকে সাতটি প্রতিষ্ঠান। গ্রেডিং পদ্ধতিতে যেসব শর্ত দেওয়া হয়েছে দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এর অনেকটাই অচল।’

ভোক্তাদের স্বার্থে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ২০১৮ সালে গ্রেডিং পদ্ধতি চালু করেছিল। খাবারের মান, বিশুদ্ধতা, পরিবেশ, ডেকোরেশন, মনিটরে রান্নাঘরের পরিবেশ দেখার ব্যবস্থা ও ওয়েটারদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ভিত্তিতে রেস্তোরাঁগুলোকে চার ক্যাটাগরিতে চিহ্নিত করা হয়। ১০০ এর মধ্যে ৯০ নম্বরের বেশি স্কোর হলে ‘এ+’ সবুজ বর্ণের স্টিকার, স্কোর ৮০ এর ঊর্ধ্বে হলে বা ‘এ’ হলে নীল বর্ণের স্টিকার, ৫৫ থেকে ৭৯ পর্যন্ত স্কোর হলে ‘বি’ হলুদ বর্ণের স্টিকার এবং ৪৫ থেকে ৫৫ স্কোর হলে কমলা বর্ণের ‘সি’ ক্যাটাগরি পায়। ‘এ+’ মানে রেস্তোরাঁটি উত্তম, ‘এ’ ভালো, ‘বি’ গড়পড়তা ভালো এবং ‘সি’ মানে গ্রেড পেন্ডিং। হলুদ স্টিকারধারী রেস্তোরাঁকে তিন মাসের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া নিয়ম রয়েছে তাদের মান ও গ্রেড উন্নতির জন্য। একইভাবে কমলা বর্ণের রেস্তোরাঁকে গ্রেডিং বাড়ানোর জন্য এক মাস সময় দেওয়ার কথা। এ সময়ের মধ্যে তা বাস্তবায়ন করা না হলে, হোটেল-রেস্তোরাঁর লাইসেন্স বাতিল হওয়ার নিয়ম রয়েছে।

নিরাপদ কর্তৃপক্ষ বলছে, এখন পর্যন্ত ৮৭টি হোটেল-রেস্তোরাঁকে গ্রেডিং প্রদান করা হয়েছে। তার মধ্যে ১৯টি এ+, ৫৫টি এ, ৯টি বি ও চারটি হোটেলকে সি গ্রেডের আওতায় আনা হয়েছে। নতুন করে ১৫টির গ্রেডিং কার্যক্রম চলমান রয়েছে। জানতে চাইলে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য মো. রেজাউল করিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গ্রেডিং কার্যক্রমগুলো আমরা শুরু করব। ৩০টিকে রি-গ্রেডিং করা হবে। আগের মানে থাকলে গ্রেডও থাকবে। ৩০টিকে নতুন করে গ্রেডিং করা হবে।’

জানা যায়, গ্রেডিংয়ের আবেদনের জন্য রেস্তোরাঁগুলোকে অডিট করাতে হয়। দেশে বেসরকারি ১৭টি অডিট প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অডিট রিপোর্টসহ আবেদন করা হলে কর্তৃপক্ষ যাচাই-বাছাই করে গ্রেডিং করে।’



সাতদিনের সেরা