kalerkantho

শুক্রবার । ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৭ নভেম্বর ২০২০। ১১ রবিউস সানি ১৪৪২

তিল-তিসি কি হারিয়ে যাবে?

বাজারজাতকরণসহ নানা সমস্যায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন কৃষকরা

রোকন মাহমুদ    

২৩ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



একটা সময় ছিল প্রায় সব অঞ্চলেই তিল আর তিসির আবাদ হতো। ভোজ্য তেলের চাহিদার অনেকটাই পূরণ হতো এসব তেলবীজের মাধ্যমে। তেল ছাড়াও অন্যান্য খাদ্যপণ্য হিসেবেও চাহিদা ছিল। তিলের খাজা, নাড়ু পাওয়া যেত বাজারে-বন্দরে। রয়েছে ঔষধি গুণাগুণও। কিন্তু এখন আর খুব বেশি আবাদ ও উৎপাদন হচ্ছে না ফসল দুটি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাজারে চাহিদা কমে আসায়, আবাদ পরিকল্পনার সমন্বয় সমস্যা, চাষের জমি কমে আসা, উন্নতমানের বীজ না থাকায় ফলন কম হওয়া, মুনাফা কম হওয়া, বাজারজাতকরণে সমস্যা—মূলত এসব কারণে তিল ও তিসির আবাদে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন কৃষকরা। তিল ও তিসির আবাদের জমিগুলোতে এখন আউশ, রোপা আমন, ভুট্টা, আলু ইত্যাতি আবাদ হচ্ছে।

তাঁরা বলছেন, তিলের চাহিদা এখনো দেশি ও আন্তর্জাতিক বাজারে কিছুটা রয়েছে বলে আবাদ হচ্ছে। হয়তো আরো ১৫-২০ বছর থাকবে। তারপর কী হবে বলা মুশকিল। কিন্তু এই সময়টায় অন্যান্য ফসলের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে তিসি টিকিয়ে রাখা কষ্টকর হবে। জব, কাউন ইত্যাদি ফসলের মতো হয়তো তিসিও হারিয়ে যাবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) মাঠ ফসলের আবাদি জমি ও উৎপাদনের চিত্রে দেখা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তিন হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে তিসির আবাদ হয়েছিল। ওই বছর মোট তিন হাজার ৪০০ মেট্রিক টন তিসি উৎপাদন হয়। পরের বছর আবাদি জমির পরিমাণ কমে দাঁড়ায় দুই হাজার ৭৮০ হেক্টরে। এ সময় উৎপাদন হয় দুই হাজার ৭০০ টন। অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় উৎপাদন কম ৬২০ টন। পরের অর্থবছরে (২০১৯-২০) তিসি আবাদের পরিমাণ আরো কমে যায়। এ সময় তিসি আবাদ হয় দুই হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন হয় দুই হাজার ৩৯১ টন।

অথচ বছর দশেক আগেও দেশে তিসির আবাদি জমি ও উৎপাদন ছিল এখনকার দ্বিগুণ। ২০১১-১৩ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর ছয় হাজার হেক্টর জমিতে তিসি আবাদ হতো। এ সময় উৎপাদন ছিল ছয় হাজার টনের ওপরে। ২০১৪ সালে এক হাজার টন কমে পাঁচ হাজারে নেমে আসে। কৃষিবিদরা বলছেন, ২০১০ সালের আগে তিসির উৎপাদন ছিল আরো বেশি।

তিলের অবস্থা তিসির চেয়ে অনেকটাই ভালো। তবে তিলের উৎপাদনও কমছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে শীত ও গ্রীষ্ম দুই মৌসুমে দেশে তিলের উৎপাদন ছিল ৮৬ হাজার টন আর আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ৮২ হাজার হেক্টর। সর্বশেষ ২০১৯-২০ অর্থবছরে উৎপাদন নেমে আসে ৭৮ হাজার ৬০০ টনে, আর আবাদ হয় মাত্র ৬৮ হাজার হেক্টর জমিতে। মাঝখানে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আবাদ হয়েছিল ৮৩ হাজার হেক্টর জমিতে। পরের বছর তা কমে ৭০ হাজার হেক্টরে নেমে আসে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের দুই মৌসুমে তিলের উৎপাদন ছিল ৯৪ হাজার ৫০০ টন। পরের বছর কমে হয় ৭৫ হাজার ৬৪৮ টন।

জানতে চাইলে ডিএইর ডাল, তেল ও মসলাজাতীয় বীজ উৎপাদন সংরক্ষণ ও বিতরণ প্রকল্পের পরিচালক মো. খাইরুল আলম (প্রিন্স) কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ক্রমবর্ধমান খাদ্য পণ্যের চাহিদার কারণে কম মুনাফা বা কম চাহিদার অনেক ঐতিহ্যবাহী ফসলই হারিয়ে যাচ্ছে। এখন এক জমিতে বছরে তিন থেকে চারটি ফসল আবাদ করছেন কৃষকরা। সেখানে যে ফসলে লাভ বেশি এবং আবাদের সময় সমন্বয় করা যায় সেটাই চাষ করছেন।’ তিনি বলছেন, তিল-তিসিতে কৃষকরা খুব বেশি মুনাফা পান না। এ ছাড়া তিল ও তিসির তেল বাজারজাতকরণেও রয়েছে নানা সমস্যা। উচ্চফলনশীল বীজ না থাকায় ফলনও কম হয়। ফলে কৃষকরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। তবে তিলের উল্লেখযোগ্য চাহিদা এখনো রয়েছে বলে জানান তিনি।

খাইরুল আলম বলেন, ‘তিল আমাদের ঐতিহ্যবাহী ফসল। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বাজারে এর চাহিদা রয়েছে। লাভজনক করা গেলে আবাদ টিকিয়ে রাখা সম্ভব।’

২০১০ সালে বিশ্বব্যাপী তিলবীজ উৎপাদনের এক তথ্যে দেখা যায়, মোট ফলন হয়েছিল ৩৮ লাখ চার হাজার মেট্রিক টন। সর্বাধিক উৎপাদক ছিল মিয়ানমার। এর পরের অবস্থানে ছিল ভারত ও চীন। এই তিন দেশ বিশ্বব্যাপী মোট উৎপাদনের ৫০ শতাংশ তিল উৎপাদন করত। ২০১০ সালে ৭৮ লাখের বেশি হেক্টর জমিতে তিল ফলানো হয়।

বারির ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. নাজিম উদ্দীন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তিলের তেল বাংলাদেশের তৃতীয় প্রধান ভোজ্য তেল। এতে রয়েছে ওমেগা-৩। এই তেলে মাছ-মাংসের সমান ২০ শতাংশ প্রোটিন রয়েছে। কোনো কোলেস্টেরল নেই। তিলের তেল নিরাপদ ভোজ্য তেল।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা