kalerkantho

শনিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৮ নভেম্বর ২০২০। ১২ রবিউস সানি ১৪৪২

কারা শেষ করল ওই কিশোরদের সম্ভাবনা

রিফাত হত্যাকাণ্ড

রফিকুল ইসলাম, বরিশাল   

২৮ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কারা শেষ করল ওই কিশোরদের সম্ভাবনা

রিফাত শরীফ হত্যা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত কিশোর আসামি রাশিদুল হাসান রিশান। এলাকায় রিশান ফরাজী নামে পরিচিত। বরগুনার ইউটিডিসি মডেল বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় ২০১২ সালে অংশ নিয়ে জিপিএ ৫ পায়। জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষায়ও সে মেধার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বরগুনা জিলা স্কুল থেকে জিপিএ ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়। ২০২০ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় সরকারি নির্দেশনা মতে (পরীক্ষা ছাড়া পাস) সে জিপিএ ৫ পাচ্ছে। রিশান ফরাজী শুধু পড়ালেখায় নয়; বক্তৃতা, রচনা প্রতিযোগিতা, তথ্য-প্রযুক্তি সব ক্ষেত্রেই মেধাবী ছিল।

২০১৯ সালের ২৬ জুন প্রকাশ্যে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। যোগাযোগ মাধ্যমে খুনের ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হয়। সেখানে দেখা যায়, ধারালো অস্ত্র দিয়ে নয়ন বন্ড ও রিশানের বড় ভাই রিফাত ফরাজী মিলে রিফাত শরীফকে কোপাচ্ছে। কোপানোর সময় রিফাত শরীফের কোমর জাপটে ধরে আছে রিশান। ওই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া রিশান তখন কিশোর ছিল। ওই কিশোর বয়সেই বড় ভাইয়ের হাত ধরে সে জড়িয়ে পড়ে মাদকসহ নানা অপরাধে, গ্যাং কালচারে। নিয়মিত আড্ডা দিত বরগুনা সরকারি কলেজ ক্যাম্পাসে। পারিবারিক কারণে রাজনীতিতে নাম লেখালেও মূলত তারা লিপ্ত ছিল ক্যাডার রাজনীতিতে।

রিফাত হত্যা মামলার প্রধান নয়ন বন্ড কিশোরদের সমন্বয়ে বরগুনায় গড়ে তোলে কিশোর গ্যাং। নাম দেওয়া হয় ০০৭। গ্যাংয়ের প্রধান নয়ন বন্ড বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। গ্যাংয়ের সেকেন্ড ইন কমান্ড রিশানের বড় ভাই রিফাত ফরাজীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ হয়েছে। নয়ন ও রিফাত ফরাজীও মেধাবী ছিল। তাদের জীবনও ছিল সম্ভাবনাময়। কিন্তু হঠাৎ করেই তারা বিপথে চলে যায়। ক্রমশ মাদক তাদের গ্রাস করে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিবারের উদাসীনতা, সামাজিক অবক্ষয়, অপরাজনীতি আর সর্বনাশা মাদকের ছোবলে ওই মেধাবী কিশোররা অন্ধকার জগতে পা বাড়িয়েছিল। সঠিক পথে ধরে রাখতে পারলে তারা শুধু পরিবারের নয়, দেশের জন্য সম্পদ ছিল।

রিশানের মতোই রিফাত হত্যা মামলার আরো দুই দণ্ডপ্রাপ্ত কিশোর আসামি রাকিবুল হাসান রিফাত হাওলাদার ও মো. নাঈম মেধাবী ছিল। তারা দুজনই পিইসি, জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়েছিল। এবারের এইচএসসি পরীক্ষায়ও জিপিএ ৫ পাচ্ছে।

এ ছাড়া রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি বাক্প্রতিবন্ধী জয়চন্দ্র সরকার ওরফে চন্দন ও আবু আব্দুল্লাহ রায়হানও মেধাবী ছিল। কিন্তু পরিবারের অসচেতনতার কারণেই তারা খুনের মতো ঘৃণ্য অপরাধে জড়িয়ে এখন অন্ধকার পথযাত্রী।

মামলার আসামি হিসেবে ১৪ কিশোরই দাগি আসামিদের সঙ্গে জেলে ছিল। এদের মধ্যে তিনজন খালাস পেয়েছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক সব আসামির মধ্যেই শুরুতে কারাজীবন নিয়ে এক ধরনের ভীতি থাকলেও পরে সে ভয় কেটে যায়। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অভিজ্ঞতা নিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা ততটা সহজ নয়।

রিশান ফরাজীর মা রেশমা বেগম বলেন, ‘রিশান সব সময় বলত, আম্মু আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ব। অথচ নষ্ট রাজনীতির কারণে আমার মেধাবী ছেলের জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেল। রিশানের বড় ভাই রিফাত ফরাজীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ হয়েছে আগেই। আজ ছোট ছেলে রিশানকেও কারাদণ্ড দিলেন আদালত। দুই সন্তানকে নিয়ে আমাদের যে স্বপ্ন ছিল, তা শুরুতেই চুরমার হয়ে গেল।’ তিনি বলেন, ‘তার পরও আমরা আশাবাদী উচ্চ আদালত তাদের বেকসুর খালাস দিবেন। নয়তো, কিশোর সংশোধাগারে থেকে রিশান আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসবে।’ 

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বরগুনার সাধারণ সম্পাদক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক মুশফিক আরিফ বলেন, রিফাত হত্যা মামলায় ১৪ জন কিশোর আসামির মধ্যে অনেকেই মেধাবী। কিন্তু পরিবারের অসচেতনতায় তারা সামাজিক অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল। কিশোর বয়সেই তাদের বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ১১ কিশোরকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্তদের কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হবে। সেখানে থেকে তারা সংশোধিত হয়ে আগের অবস্থায় ফিরে আসবে এমনটা তাদের পরিবার আশা করছে।

সাংস্কৃতিক জোট বরগুনার সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. শাহজাহান বলেন, ‘সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্বের মাধ্যমে এ রকম মেধাবীদের আমরা গড়ে তুলতে পারছি না। পরিবারের যে দায়িত্ব পালন করার কথা, সামাজিকভাবে তারাও সে দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এর ফলে কিশোর মেধাবীরা বিপথগামী হচ্ছে। কিশোরদের বিপথগামীর দায় শুধু তাদের পরিবারের একার নয়, রাষ্ট্রেরও দায় আছে।’ তিনি বলেন, রিফার শরীফ হত্যা সামাজিক অবক্ষয়ের বড় উদাহরণ। আমরা এ রকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখতে চাই না। কিশোরদের খেলাধুলা আর সাংস্কৃতিক সংগঠনের মধ্যে আবদ্ধ রাখতে পারলেই সমাজ থেকে, মাদকের মোহ থেকে তারা মুক্ত হবে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা