kalerkantho

সোমবার । ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭। ১০ আগস্ট ২০২০ । ১৯ জিলহজ ১৪৪১

বাঁচার তাগিদে পেশা বদল অনেকের

করোনা ‘পথে বসিয়েছে’ পথখাবার বিক্রেতাদের

সজীব আহমেদ   

১৫ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



করোনা ‘পথে বসিয়েছে’ পথখাবার বিক্রেতাদের

এত দিন যাঁরা পথেঘাটে খাবার বিক্রি করে সংসার চালাতেন, করোনাভাইরাস মহামারিতে কাজ হারিয়ে তাঁরা এখন চরম দুর্দশায় দিন কাটাচ্ছেন। চায়ের দোকানগুলোতে, ফুটপাতের হোটেলগুলোতে তেমন একটা দেখা মিলছে না ক্রেতার। সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পড়েছেন রাস্তার হালিম, পিঠা, বাদাম-চানাচুর, ঝালমুড়ি ও ফুচকা-চটপটি বিক্রেতারা। বাঁচার তাগিদে তাঁদের অনেকে পেশা বদল করে মৌসুমি ফল বিক্রি করছেন, কেউ সবজি বিক্রি করছেন, কেউ বা করোনা থেকে সুরক্ষার পণ্যসামগ্রী বিক্রিতে নেমেছেন। আবার অনেকে খাবারের ব্যবসা হারিয়ে পথে বসে গেছেন।

দোকানিরা বলছেন, করোনাভাইরাস আতঙ্কে পথের খাবারের দোকানগুলোতে বেচাকেনা একেবারে নেই বললেই চলে। মানুষ এখন পথেঘাটের এসব খোলা খাবার খেতে চায় না। অন্যদিকে পথচারী ক্রেতারা বলছেন, এ সময় যতটা সম্ভব পথঘাটের খাবার না খাওয়ার চেষ্টা করছি। আর স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, করোনার সংক্রমণ থেকে বাঁচতে স্বাস্থ্যবিধি মানার পাশাপাশি উন্মুক্ত পথখাবার থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকতে হবে। 

রাজধানীর জোয়ারসাহারা নুরানি মসজিদ এলাকায় থাকেন হালিম বিক্রেতা বাবুল মিয়া। চার বছর ধরে রাজধানীর কুড়িল চৌরাস্তা এলাকায় হালিম বিক্রি করছেন। ভালোই চলছিল তাঁর সংসার। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে লকডাউনের কারণে হালিম বিক্রি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়ি জামালপুর চলে যান। ঈদের পরে লকডাউন তুলে সব কিছু খুলে দেওয়া হলে হালিম বিক্রি করার আশায় আবার পরিবার নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন তিনি। কিন্তু এখন আগের মতো হালিম বিক্রি করতে পারছেন না। বাবুল বলেন, ‘করোনা সব শেষ করে দিল। লকডাউন তুলে নেওয়ার পর কয়েক দিন হালিম নিয়ে রাস্তায় গিয়েছিলাম, কিন্তু কেউ খেতে চায় না। পরে অন্য কোনো উপায় না পেয়ে হালিম বিক্রি বাদ দিয়ে আম বিক্রিতে নেমেছি।’

প্রেস ক্লাবসংলগ্ন রাস্তার পাশে খাবার বিক্রেতা আজম বলেন, ‘আমার দোকানে শুধু দুপুরের খাবার বিক্রি হয়। এর আগে দুপুর ১টার পর থেকেই ক্রেতার ভিড় লেগে যেত। এখন ক্রেতা নেই বললেই চলে। আগে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ খেতে আসত। এখন তেমন কেউ আসেও না, খোলা খাবার খেতেও চায় না। শুধু রিকশাওয়ালারা খেতে আসে। এভাবে কয় দিন চলতে পারব জানি না।’

প্রেস ক্লাব এলাকারই চা বিক্রেতা আবুল হোসেন বলেন, ‘আগে দিনে ২৫০ থেকে ৩০০ কাপ চা বিক্রি হতো। কিন্তু জনমনে করোনা আতঙ্ক তৈরি হওয়ার পর থেকে এখন ১০০ কাপও বিক্রি হচ্ছে না। আবার রুটি, কলা, কেক ও সিগারেট বিক্রিও কমে গেছে। বাসাভাড়া আছে, এভাবে বিক্রি চললে পরিবার নিয়ে স্থায়ীভাবে ঢাকা ছাড়তে হবে।’

রোকেয়া খাতুন নামে এক নারী আগে প্রতিদিন বিকেলে পিঠা বানিয়ে বিক্রি করতেন। এখন তিনি বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার গেটের বাইরে রাস্তায় পান ও সিগারেট বিক্রি করেন। তিনি বলেন, ‘পিঠা বিক্রি বন্ধ হওয়ায় খুব বিপদের মধ্যে পড়েছিলাম। দুই মাসের ঘরভাড়া বাকিও পড়ে গিয়েছিল। পরে আর কোনো উপায় না দেখে পান ও সিগারেট নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছি। এখন কোনো রকম ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে আছি।’

শুধু বাবুল মিয়া, আজম, আবুল হোসেন বা রোকেয়া খাতুনই নন, তাঁদের মতো হাজার হাজার খুদে দোকানি যাঁরা রাজধানীতে পিঠা, হালিম, ফুচকা, চটপটি, ডিম, ছোলামুড়ি, শিঙাড়া-সমুচা-পিঁয়াজু, হট পেটিস, চা-পান, বাদাম-চানাচুর বা ভাত-তরকারি বিক্রি করতেন, তাঁরা এখন কাজ হারিয়ে দিশাহারা। তাঁদের অনেকে বেকার, অনেকে পেশা বদল করে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। অনেকে সংসার চালাতে না পেরে পরিবার, বউ-বাচ্চা গ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছেন। 

পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো. আক্তারুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পথের মধ্যে যারা খাবার বিক্রি করে তাদের মধ্যেও নিরাপদ ব্যবস্থা আছে। স্বাস্থ্যসম্মতভাবে ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে খাবার তারা বিক্রি করতে পারে। স্বাস্থ্যবিধিতে বলা নেই যে যারা পথে খাবার বিক্রি করে তাদের থেকে খাবার কিনে খাওয়া যাবে না। স্বাস্থ্যবিদরা বলছেন যে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে কেউ যদি নিরাপদ খাদ্য বিক্রি করে তাহলে সেটা খেতে পারবেন।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা