kalerkantho

বুধবার । ২৪ আষাঢ় ১৪২৭। ৮ জুলাই ২০২০। ১৬ জিলকদ  ১৪৪১

স্বাস্থ্যবিধি মানলে ঝুঁকি নেই

করোনায় মৃত ব্যক্তির লাশ দাফন করছেন স্বজনরাই

এস এম আজাদ   

৬ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



করোনায় মৃত ব্যক্তির লাশ দাফন করছেন স্বজনরাই

রাজধানীর পল্টন এলাকার ব্যবসায়ী খলিলুর রহমানকে (৪৮) গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় গত মঙ্গলবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ভর্তি করা হয়। বুধবার মারা যান তিনি। সেখান থেকে লাশ নিয়ে রায়েরবাজারের কবরস্থানে দাফন করেন স্বজনরা। জানতে চাইলে খলিলুর রহমানের ভাগিনা মুহাম্মদ হাফিজুল হাকিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনার রোগী বলে ঢাকা মেডিক্যাল থেকে লাশ ছাড়াতে একটু বিড়ম্বনা হয়েছে। আর কোনো ঝামেলা হয়নি। কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবীরা লাশ গোসল করিয়ে দাফনের জন্য নিয়ে যায়। কবরের পাশে জানাজাও হয়েছে।’

মঙ্গলবার ঢাকা মেডিক্যালে করোনায় মৃত্যু হয় ধামরাইয়ের বাসিন্দা পরেশ আলীর (৬৮)। তাঁর লাশ নিজ এলাকায় নিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে দাফন করেছেন স্বজনরা। জানতে চাইলে পরেশ আলীর ছেলে আরিফ হোসেন বলেন, ‘এলাকায় জানাজা ও দাফন হয়েছে। অনেক লোকজনই এসেছেন। থানায় জানানোর পর তারা চারটি পিপিই দিয়েছিল। নিজেরা উপস্থিত থেকে দাফন করতে পারায় আমরা সন্তুষ্ট।’

ধর্মীয় রীতি মেনে করোনায় আক্রান্ত মৃত ব্যক্তির দাফন করতে পেরে এমন সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন অনেক স্বজন। সম্প্রতি করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিকে স্বজনরাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে দাফন করছেন। প্রথম দিকে পুলিশ লাশ দাফনে সহায়তা করলেও এখন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন লাশ দাফনে সহায়তা করছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে নমুনায় প্রমাণিত এবং উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া শতাধিক ব্যক্তির স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। পিপিই পরে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে লাশ দাফন করা হচ্ছে। তবে এখনো অনেক স্থানে প্রতিবেশীদের বাধার মুখে নিজ এলাকায় লাশ দাফন করা যাচ্ছে না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার তিন ঘণ্টা পর ওই মৃতদেহে আর ভাইরাসটির কার্যকারিতা থাকে না। ফলে ওই মৃতদেহ থেকে ভাইরাস ছড়ানোর আশঙ্কা নেই।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ডা. নাসিমা সুলতানা নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে বলছেন, ‘মৃতদেহ দাফন বা সৎকার করতে তিন-চার ঘণ্টা সময় লেগে যায়। তিন ঘণ্টা পর ওই মৃতদেহে করোনাভাইরাসের কার্যকারিতা থাকে না।’ এ কারণে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কেউ মারা গেলে তাকে স্বাস্থ্যবিধি অনুসারে ধর্মীয় রীতি মেনে সৎকার কিংবা পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা যাবে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে কেউ মারা গেলে দাফন ও সৎকার নিয়ে প্রথম দিকে ভয় থাকলেও ক্রমে তা কেটে যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্ধৃতি দিয়ে ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী মৃতদেহের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে দেহটি ব্যাগ বা পলিথিনে মুড়ে স্থানান্তর করা যায়।’

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে গত বৃহস্পতিবার ১৭ জন, গত বুধবার ১৬ জন এবং গত মঙ্গলবার ২০ জন মারা যান। এদের সবার লাশ স্বাস্থ্যবিধি মেনে হস্তান্তর করা হয়।

জানতে চাইলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক আলাউদ্দিন আল আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনায় মৃত্যু পুলিশ কেস নয়। তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে তথ্য দিয়ে লাশগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। প্রথম দিকে আইইডিসিআরের আট সদস্যের একটি টিম ছিল, যাঁরা মৃতদের খিলগাঁও কবরস্থানে দাফন করত। এরপর মন্ত্রণালয়ের একটি সেল হয়, যার মাধ্যমে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামসহ স্বেচ্ছাসেবীদের দিয়ে লাশ দাফন করানো হতো। এপ্রিলের শেষদিকে এসে জানা যায়, মৃতদেহ থেকে করোনাভাইরাস ছড়াতে পারে না। তখন থেকে আগ্রহী স্বজনদের লাশ দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শুরুতে স্বজনরা লাশ নিতে না চাইলেও এখন নিচ্ছেন। দাফনে স্বেচ্ছাসেবীরা সহায়তা করছে।’

গত মঙ্গলবার ঢাকা মেডিক্যালে করোনায় মৃত্যু হয় রাজধানীর কাঁঠালবাগান এলাকার ব্যবসায়ী জামিল হোসেনের (৩৪)। তাঁর বড় ভাই জাকির হোসেনও করোনায় আক্রান্ত হয়ে বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যালে চিকিৎসাধীন। তিনি মোবাইল ফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘খুব ইচ্ছা ছিল চাঁদপুরের মতলবে গ্রামের বাড়িতে ভাইকে দাফন করার। কিন্তু এলাকার লোকজন সচেতন না। মাতব্বররা আমাকে নিষেধ করেছেন। ৯৯৯-এ কল করলে জানায়, লোকাল থানাকে বললে সহায়তা করবে। দেখলাম দেরি হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে রায়েরবাজারেই নিয়ে দাফন করেছি। কয়েকজন আত্মীয়স্বজন ছিল। সহায়তা করেছে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবীরা।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা