kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

একাধিক প্রতিষ্ঠানের জরিপ

পাবলিক প্লেসে যৌন হয়রানির শিকার ৯৭.৯৬% নারী ও কন্যাশিশু

নওশাদ জামিল   

৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পাবলিক প্লেসে যৌন হয়রানির শিকার ৯৭.৯৬% নারী ও কন্যাশিশু

জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল ও গার্লস অ্যাডভোকেসি অ্যালায়েন্সের মাঠপর্যায়ের জরিপ থেকে জানা যায়, পাবলিক প্লেসে ৯৭.৯৬ শতাংশ নারী ও কন্যাশিশু এক থেকে একাধিকবার যৌন হয়রানির শিকার হয়। দেশের নানা স্থানে পরিচালিত এই জরিপে মোট ৩৯২ জন উত্তরদাতার মধ্যে ৩৮৪ জনই বিভিন্ন সময় যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার কথা জানায়।

নারী ও কন্যাশিশুদের প্রতি যৌন হয়রানি, বিশেষ করে পাবলিক প্লেসে যৌন হয়রানির নির্ভরযোগ্য কোনো পরিসংখ্যান খুঁজে পাওয়া বেশ কষ্টসাধ্য। এই সীমাবদ্ধতা অনুধাবন করে পাবলিক প্লেসে যৌন হয়রানির অবস্থা বোঝার জন্য জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল ও গার্লস অ্যাডভোকেসি অ্যালায়েন্সের সহায়তায় নমুনা হিসেবে ২৭টি প্রশ্নসংবলিত একটি প্রশ্নপত্র তৈরি করা হয়। পরে ১০ জনের একটি তরুণ দলের মাধ্যমে বরিশাল জেলা সদর, বাবুগঞ্জ ও আগৈলঝাড়া উপজেলা, ওই উপজেলার দুটি ইউনিয়ন রাজিহার ও কেদারপুর এবং রংপুর জেলার সদর, গঙ্গাচড়া ও পীরগঞ্জ উপজেলায় এবং দুইটি ইউনিয়ন গজঘণ্টা ও কাবিলপুরে জরিপ কার্য পরিচালনা করা হয়। মোট ৩৯২ জন উত্তরদাতার বয়স ছিল সর্বনিম্ন ১২ এবং সর্বোচ্চ ৩৫ বছর। ৪২ শতাংশ উত্তরদাতার বয়স ১৮ বছরের নিচে, ৫৮ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।

জরিপ থেকে যে বিষয়গুলো পাওয়া গেছে : পাবলিক প্লেসে ৯৭.৯৬ শতাংশ নারী ও কন্যাশিশু এক থেকে একাধিকবার যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। ৩৮৪ জন বলেছে, তারা বিভিন্নভাবে বিভিন্ন সময় যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। শতকরা ৫৯.৪৫ জন বলেছে, তারা ১১ থেকে ১৭ বছর বয়সের মধ্যেই প্রথমত যৌন হয়রানির অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়।

জরিপ থেকে জানা যায়, ৫.৪৭ শতাংশ নারী ছয় বছর বয়সের আগেই এবং ১৫.২৬ শতাংশ ১০ বছরের আগেই প্রথম যৌন হয়রানির শিকার হয়েছিলেন। উত্তরদাতা ৫.৮৮ শতাংশ নারী নিকটাত্মীয় দ্বারা, ২৬.১৭ শতাংশ পরিচিত ব্যক্তি দ্বারা এবং ৬৭.৯৫ শতাংশ নারী অপরিচিত ব্যক্তি দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে জানা যায়।

এ অবস্থায় সর্বস্তরে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে একটি সমন্বিত আইন প্রণয়ন অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেছেন অ্যাডভোকেসি ফোরামের নেতারা। জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সভাপতি ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘বর্তমানে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কর্মস্থলে যৌন হয়রানিরোধে কমিটি গঠনের জন্য হাইকোর্টের একটি নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু অন্যান্য স্থানে যৌন হয়রানির ক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনায় কিছু নেই। তাই সব ক্ষেত্রে যৌন হয়রানিরোধে একটি সমন্বিত আইন প্রণয়ন হওয়া দরকার।’ 

ফোরাম সম্পাদক নাছিমা আক্তার জলি বলেন, ‘নারী ও শিশুদের প্রতি ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। যার ধরন ও মাত্রা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। শুধু কন্যাশিশুরাই নয়, ছেলে শিশু, প্রতিবন্ধী নারীসহ সব বয়সী নারীর প্রতি ঘটছে ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা এবং নানাবিধ যৌন হয়রানি। আমরা মনে করি, এটি কোনো সুস্থ সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য কাম্য নয়।’

নারী ও কন্যাশিশুর ওপর যৌন নিপীড়ন বন্ধে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম, অপরাজেয় বাংলাদেশ, বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্র, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল-বাংলাদেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরেছে। জরুরি ভিত্তিতে আইন প্রণয়ন, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিষয়ে পৃথক আইন প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত হাইকোর্টের রায়কে যথাযথভাবে অনুসরণ করা এবং এর ব্যত্যয় ঘটলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার সব ঘটনাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করা। ক্রমবর্ধমান নারী নির্যাতন প্রতিরোধে নারী-পুরুষ, সরকার, প্রশাসন, নাগরিক সমাজ, পরিবার সবার ঐক্যবদ্ধ হওয়া। নারী নির্যাতনকারীদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ করা। শিশু আইন ২০১৩ (সংশোধিত ২০১৮) অনুযায়ী শিশু আদালতকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালের সঙ্গে যুক্ত না রেখে পৃথক আদালত হিসেবে রাখা। জরুরিভিত্তিতে ‘শিশু আইন ২০১৩’-এর বিধিমালা প্রণয়ন করা। শিশু সুরক্ষায় শিশুদের জন্য একটি পৃথক অধিদপ্তর গঠন করা। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সকল প্রকার সহিংসতা প্রতিরোধে তরুণ ও যুবসমাজকে সচেতন করা। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আইনের উপস্থিতির পাশাপাশি এর কঠোর প্রয়োগও নিশ্চিত করা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা