kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ভরাট করা পুকুরের জায়গায় ফের মার্কেটের কাজ শুরু

খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক বলছেন, পুকুর ভরাট করার সুযোগ আইনগতভাবে কারোরই নেই

আবু দাউদ, খাগড়াছড়ি   

৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ভরাট করা পুকুরের জায়গায় ফের মার্কেটের কাজ শুরু

খাগড়াছড়ি শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত জগন্নাথ মন্দিরসংলগ্ন শত বছরের পুরনো পুকুরটি ভরাট করে সেখানে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বহুতল সুপারমার্কেট নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

উন্নয়নের নামে পুকুর বা জলাশয় ভরাট না করার প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ খাগড়াছড়িতে মানা হচ্ছে না। শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত জগন্নাথ মন্দিরসংলগ্ন শত বছরের পুরনো পুকুরটি ভরাট করে সেখানে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বহুতল সুপারমার্কেট নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে।

গত বছর কালের কণ্ঠে সংবাদ প্রকাশের কারণে কাজটি কিছুদিন বন্ধ থাকলেও সম্প্রতি আবার শুরু হয়েছে। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে এলাকাবাসী। তারা সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছে। এর আগে ২০১১ সালে পুকুরটি ভরাটের কাজ শুরু করে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ। তখনো কালের কণ্ঠে এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়।

এ ছাড়া শহরের বাজার মসজিদ পুকুরটি দখলের পাঁয়তারা চলছে। পুরাতন গরু হাটের পাশের পুকুরটিও ভরাট করা হচ্ছে। ঠিকাদার মো. সেলিমের লোকজন এই পুকুরটি গ্রাস করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছে, পৌর শহরের মানুষের অগ্নিনিরাপত্তাকে তোয়াক্কা না করেই জগন্নাথ মন্দিরের পাশের পুকুরটি দখল করে সুপারমার্কেটের মতো একটি জনগুরুত্বহীন স্থাপনা নির্মাণ করছে পৌরসভা। বাংলাদেশ মিউনিসিপ্যাল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টকে (বিএমডিএফ) মিথ্যা তথ্য দিয়ে পুকুর ভরাট করে এই স্থাপনা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। এ ব্যাপারে বিএমডিএফ বলছে, এখন আর তাদের কিছুই করার নেই।

জানতে চাইলে পৌরসভার মেয়র রফিকুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিষ্কণ্টক জমিতে পৌর সুপারমার্কেট নির্মাণের কাজ চলছে। এটি মূলত জগদানন্দ চাকমার জমি। তাঁর কাছ থেকে জমি কিনে মার্কেট করা হচ্ছে। এতে কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। এ ছাড়া এ ব্যাপারে পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও পরিবেশ অধিদপ্তরের অনাপত্তি নেওয়া হয়েছে।’

তবে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও বাজারফান্ডের প্রশাসক কংজুরী চৌধুরী কালের কণ্ঠের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে চাননি।

বাজারফান্ডের পরিদর্শক জালিম চাকমা বলেন, ‘বাজারফান্ডের জমির ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে অনাপত্তি দেওয়ার অধিকার কারো নেই।’

পার্বত্য শহর খাগড়াছড়িতে এমনিতেই পুকুর-জলাশয় কম। জগন্নাথ মন্দিরের পাশের পুকুর, পানবাজার পুকুর ও বাজার মসজিদসংলগ্ন তিনটি পুকুর কোনোভাবে টিকে ছিল। এর আগে মেয়র থাকাকালে ২০১১ সালের নভেম্বরে রফিকুল আলম বাজারফান্ডের ৩৫১ নম্বর প্লটের জগন্নাথ মন্দির লাগোয়া পুকুরটি পরিষ্কারের নামে দখল করেন। পরে দিন-দুপুরে আশপাশের বাসিন্দাদের সরিয়ে দিয়ে পুকুরের দখল নিয়ে তা ভরাট করেন।

স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দা শান্তা দাস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটা অনেক পুরাতন পুকুর ছিল। মার্কেটের জন্য জায়গা লাগবে বলে পুকুরটা ভরাট করা হয়েছে। আমাদের ঘরটিও ভেঙে দিয়েছে তারা।’

জানা গেছে, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে তৎকালীন সংসদ সদস্য ও মেয়রসহ ৩২ জন প্রভাবশালী ব্যক্তি বাজারের দুটি পুকুর বন্দোবস্ত দিলেও তখন জনআন্দোলনের মুখে পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সেই বন্দোবস্ত বাতিল করতে বাধ্য হন।

জানা গেছে, জগন্নাথ মন্দিরের পাশের এই পুকুরটির মালিকানা নিয়ে বিরোধ রয়েছে। পুকুরসহ সংলগ্ন ভূমির মালিক দাবিদার প্রয়াত গোলাপ ফুল চৌধুরীর একমাত্র সন্তান রাপ্রুচাই চৌধুরী। তাঁর অভিযোগ, পুকুরসহ এক একর ৫২ শতক ভূমির মালিকানা নিয়ে বাজারফান্ডের সঙ্গে বিরোধের কারণে উচ্চ আদালতের স্থিতাবস্থা জারি রয়েছে। তা সত্ত্বেও পৌরসভার মেয়র রফিকুল আলম গায়ের জোরে পুকুর ভরাট করে মার্কেট করছেন। বারবার অভিযোগ দেওয়ার পরও অবৈধ কাজে বিএমডিএফ কিভাবে অর্থ ছাড় করে তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এবং সরকারপ্রধানের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, প্রভাব বিস্তার করে মেয়র রফিকুল আলম ২০১৫ সালে বাজারফান্ডের ৩৭২ নম্বর প্লটের পান বাজার পুকুরটিও দখল করেন। এই পুকুরের ওপর মাচাং করে কফি হাউসের নামে ইট-সুরকির স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে।

পরিবেশকর্মী ও সাংবাদিক অপু দত্ত পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই পুকুর ভরাট করে মার্কেট নির্মাণে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি অভিযোগ করে কালের কণ্ঠকে বলেন, পুরাতন গরু বাজার এলাকার একমাত্র পুকুরটিও ভরাট করছে প্রভাবশালীরা। শহরের মানচিত্র থেকে মসজিদ পুকুরটিও মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র চলছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) খাগড়াছড়ি শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নাসির উদ্দিন ও পরিবেশ গবেষক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা জানান, নগর পরিকল্পনা না থাকায় প্রভাবশালীরা ইচ্ছামতো পুকুর, জলাশয় ও ছড়া-খাল দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করছে। এটা সচেতন বাসিন্দারা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না। তারা ভরাট করে ফেলা জগন্নাথ মন্দির পুকুর পুনঃখননসহ অন্য পুকুরগুলো বাঁচানোর দাবি জানিয়েছেন।

পুকুর ভরাট করে বহুতল মার্কেট নির্মাণের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক প্রতাশ চন্দ্র বিশ্বাস কালের কণ্ঠকে বলেন, এমন তথ্য তাঁর জানা ছিল না। পুকুর ভরাট করার সুযোগ আইনগতভাবে কারোরই নেই জানিয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অবশ্য তিনি এই প্রতিবেদককেই লিখিতভাবে অভিযোগ করার অনুরোধ জানান।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা