kalerkantho

শুক্রবার  । ১৮ অক্টোবর ২০১৯। ২ কাতির্ক ১৪২৬। ১৮ সফর ১৪৪১              

ওয়াসার ৩৮০৮ কোটি টাকার প্রকল্প

আধুনিক পয়োনিষ্কাশনের আওতায় আসছে চট্টগ্রাম

২০০ কিমি রাস্তা খুঁড়ে বসানো হবে পাইপলাইন

রাশেদুল তুষার, চট্টগ্রাম   

১০ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আধুনিক পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার আওতায় আসছে চট্টগ্রাম মহানগরী। মানববর্জ্য ও গৃহস্থালি বর্জ্যসহ ব্যবহার অনুপযোগী পানি পরিশোধন করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রায় শতভাগ সরকারি অর্থায়নে এই প্রকল্প হাতে নিয়েছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। এর নাম দেওয়া হয়েছে চট্টগ্রাম মহানগরী পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা স্থাপন প্রকল্প (১ম পর্যায়)। এরই মধ্যে ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) অনুমোদিত হয়েছে, কারিগরি পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়াও প্রায় শেষ পর্যায়ে। ২০২৩ সালের জুন নাগাদ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দূষণের কবল থেকে রক্ষা পাবে কর্ণফুলী ও দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র হালদা নদী। এই নদী দুটি থেকেই নগরবাসীকে সুপেয় পানি সরবরাহ করে আসছে চট্টগ্রাম ওয়াসা।

চট্টগ্রাম মহানগরীর পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা নিয়ে ধারণা পেতে ২০১৫ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত তিন বছর সময় নিয়ে চট্টগ্রাম ওয়াসা আন্তর্জাতিক সংস্থা দিয়ে একটি সার্ভে পরিচালনা করে। চট্টগ্রাম মহানগরীকে ছয়টি কেচমেন্টে ভাগ করে ডেনমার্কের প্রতিষ্ঠান ‘গ্রনমিজ ডিএইচআই’ পরিচালিত সার্ভেতে দেখা যায়, নগরের অন্তত ৬০ শতাংশ বাড়ির সেপটিক ট্যাংক ১০ বছরেও পরিষ্কার করা হয়নি। মানবসৃষ্ট ও গৃহস্থালি বর্জ্য সেপটিক ট্যাংক থেকে নিঃসৃত হয়ে বিক্ষিপ্তভাবে পাশের নালা-নর্দমায় গিয়ে পরিবেশের দূষণ ঘটাচ্ছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে পুরো নগরীকে কেন্দ্র করে একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করে সংস্থাটি। সেই প্ল্যানে প্রকল্পটি হাতে নিয়েছে ওয়াসা।

ডিপিপি থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্প ব্যয়ের তিন হাজার ৮০৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকার মধ্যে শুধু ৫০ কোটি টাকা চট্টগ্রাম ওয়াসা তাদের নিজস্ব ফান্ড থেকে দেবে। বাকি পুরো টাকাই আসবে সরকারি তহবিল থেকে। প্রকল্পের প্রথম পর্যায়টি মূলত হালিশহর কেচমেন্ট ঘিরে হবে। এর আওতায় উত্তর হালিশহর, রামপুর, আন্দরকিল্লা, পাথরঘাটা, আগ্রাবাদ, বারিক বিল্ডিং হয়ে সল্টগোলা পর্যন্ত প্রায় ৩৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা। এর সরাসরি সুবিধাভোগী হবে ১০ লাখ মানুষ। পরোক্ষভাবে আরো ১০ লাখ মানুষ পয়োনিষ্কাশনের আওতায় আসবে।

এই লক্ষ্যে প্রতিদিন ১০ কোটি লিটার পানি ও ৩০০ টন পয়ঃপরিশোধনের জন্য প্লান্ট নির্মাণ, ২০০ কিলোমিটার পয়োপাইপলাইন স্থাপন এবং ফিকেল স্লাজ (মানববর্জ্য) ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করা হবে।

পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থার আওতায় বৃষ্টির পানি ছাড়া বাকি সব পানি স্যুয়ারেজ লাইনে নিয়ে যাওয়া হবে। নগরীর ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডে সমুদ্রতীরবর্তী এলাকায় চট্টগ্রাম ওয়াসার ১৬৩ একর জায়গা আছে। সেখানে পানি শোধনাগার নির্মাণ করা হবে। পয়োপাইপলাইনের মাধ্যমে টেনে আনা পানি পরিশোধন করে প্রতিদিন ১০ কোটি লিটার বঙ্গোপসাগরে ফেলা হবে, যাতে সমুদ্রের পানি দূষিত না হয়। একইভাবে মানবসৃষ্ট ও গৃহস্থালি বর্জ্য একই এলাকায় স্থাপিত পয়ঃপরিশোধন প্লান্টে ডিকম্পোজ করা হবে; যা দিয়ে ভবিষ্যতে বায়ো সার তৈরির পরিকল্পনা আছে ওয়াসার।

২০১৮ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত। ডিপিপি অনুমোদন পেয়েছে ২০১৮ সালের ৭ নভেম্বর। প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগ দেওয়া হয়েছে চলতি বছরের এপ্রিলে। এই দেরি প্রসঙ্গে পিডির দায়িত্ব পাওয়া চট্টগ্রাম ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডিপিপি অনুমোদন পেতে দেরি হলেও আমরা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ সময় ছয় মাস থেকে কমিয়ে চার মাসে নিয়ে এসেছি। এখন পর্যন্ত সব কিছু নিয়মমাফিকই চলছে। আশা করছি নির্ধারিত সময়ে কাজটি শেষ করা যাবে।’ তিনি বলেন, ‘প্রকল্প (প্রথম পর্যায়) বাস্তবায়ন হলে মূলত চট্টগ্রামের প্রধান দুটি নদী কর্ণফুলী ও হালদা রক্ষা পাবে। চট্টগ্রাম ওয়াসা মূলত এই দুটি নদী থেকে নগরবাসীকে সুপেয় পানি সরবরাহ করে থাকে। কিন্তু নগরবাসীর দূষণের কারণেই নদী দুটি এখন হুমকির মুখে। এ ছাড়া নগরবাসীর তখন আলাদা করে সেপটিক ট্যাংক ব্যবহার করার প্রয়োজন হবে না। কারণ যাবতীয় বর্জ্য তখন পাইপের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় পরিশোধনাগারে চলে যাবে।’

এদিকে পয়োনিষ্কাশন প্রকল্পে পরামর্শক হিসেবে ইরিনকো এসডিএন বিএইচডি নামে একটি মালয়েশীয় প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগের প্রস্তাব গতকাল শুক্রবার চট্টগ্রাম ওয়াসার বোর্ডসভায় অনুমোদন করা হয়েছে। ৬০ কোটি ৮০ লাখ টাকা দর দিয়ে ইরিনকো এসডিএন বিএইচডিকে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে চূড়ান্ত করে প্রকল্পের প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি)।

ওয়াসার চেয়ারম্যান এস এম নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বোর্ডে অনুমোদনের পর প্রস্তাবটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। সেখানে সরকারের ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এ প্রস্তাবের চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে।’

সড়কজুড়ে হবে আবার খোঁড়াখুঁড়ি : কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্প-১ ও প্রকল্প-২-এর পানি সরবরাহ পাইপলাইন স্থাপনের কারণে গত চার-পাঁচ বছর ধরেই চট্টগ্রামের মূল সড়ক থেকে অলিগলি সবই ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। নগরবাসী সীমাহীন দুর্ভোগে আছে। এ অবস্থায় আগামী বছর পয়োনিষ্কাশন প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু হলে আরেক দফা ভোগান্তিতে পড়তে হবে চট্টলাবাসীকে। এই দফায় রাস্তা কাটাকাটি হবে আরো ব্যাপক পর্যায়ে। কারণ পানি সরবরাহ লাইনের পাইপগুলোর ব্যাসার্ধ ছিল চার ইঞ্চি থেকে সর্বোচ্চ ৪৮ ইঞ্চি। আর পয়োনিষ্কাশন পাইপলাইনের ব্যাসার্ধ হবে ১২ ইঞ্চি থেকে সর্বোচ্চ ৬৪ ইঞ্চি পর্যন্ত। ২০০ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ৫ দশমিক ৮ কিলোমিটারে বসবে বড় পাইপ, ১৮৯ দশমিক ৫ কিলোমিটারে বসবে গ্র্যাভিটি পাইপ। তবে পাইপ বসানোর কাজ শুধু হালিশহর কেচমেন্টের ৩৪ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা