kalerkantho

শুক্রবার  । ১৮ অক্টোবর ২০১৯। ২ কাতির্ক ১৪২৬। ১৮ সফর ১৪৪১              

লালবাগ এলাকার মাদক পরিস্থিতি

বিক্রেতা ভাসমান, ক্রেতা স্থানীয়

জহিরুল ইসলাম   

১০ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রাত ১১টা। লালবাগের শহীদনগর এলাকার ৯ নম্বর গলির মাথায় কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছে। সামনে যেতেই কিছুটা নড়েচড়ে দাঁড়াল তারা। ‘ভাই, হবে নাকি?’ এমন প্রশ্নের জবাবে আধো আলো আধো ছায়াতেও তাদের মুখে যেন চাঁদের হাসি দেখা গেল! অনিক নামে একজন বললেন, ‘আছে, কয়টা লাগব?’ এ কথা বলেই পাশে থাকা জনি নামের একজনকে বললেন, ‘ওই, জাহাঙ্গীর ভাইরে ফোন লাগা।’ এরপর ৮ নম্বর গলির মাথায় চা দোকানে কিছুক্ষণ বসে আলাপ হলো অনিক ও জনির সঙ্গে। আলাপে জানা গেল, বিক্রেতা জাহাঙ্গীর এলাকার বাসিন্দা নয়। আসবে কেরানীগঞ্জ থেকে। এলাকায় মাদকদ্রব্য (ইয়াবা, গাঁজা) রেখে নাকি ব্যবসা করা যায় না! তাই এখন ক্রেতা এলাকার বাসিন্দা হলেও বিক্রেতারা আসে বাইরে থেকে। গত রবিবার রাতে সরেজমিনে গিয়ে শহীদনগর এলাকার মাদক কারবারের এমন তথ্যই পাওয়া গেল।

জানা যায়, কেরানীগঞ্জ, কামরাঙ্গীর চর, মোহাম্মদপুর, বেড়িবাঁধসহ কয়েকটি এলাকা থেকে ইয়াবা, গাঁজাসহ মাদকদ্রব্য এনে লালবাগ এলাকার কয়েকটি স্থানে বিক্রি করা হচ্ছে। কারবারিরা ক্রেতা হিসেবে বেছে নেয় কম বয়সী শিক্ষার্থী, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, ট্রাকচালকসহ বিভিন্ন পেশাজীবীকে। বিক্রেতাদের মধ্যে আছে নারী ও শিশুও। সন্ধ্যার পর লালবাগের কয়েকটি স্থানে মাদকের কারবারের সঙ্গে চলে জুয়ার আসরও।

পুলিশ ও র‌্যাব সূত্র জানায়, চলতি বছর জুলাই মাসে লালবাগ থানায় ৪২টি মাদকের মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৫৩ জন ক্রেতা ও বিক্রেতাকে। উদ্ধার করা হয় ৭৭৭টি ইয়াবা ট্যাবলেট, ৮০০ গ্রাম গাঁজা, ১৪ বোতল ফেনসিডিল, ২০ বোতল বিয়ার ক্যান ও ১৭৮ গ্রাম হেরোইন। গত বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৪টায় র‌্যাব-১০-এর একটি দল লালবাগ এলাকা থেকে ৯৫টি ইয়াবাসহ আলম (২৪) ও বাদল (৫৬) নামের দুজনকে আটক করে। এ সময় তাদের কাছ থেকে তিনটি মোবাইল ফোনসেটও জব্দ করা হয়।

লালবাগ এলাকার মাদক পরিস্থিতি নিয়ে লালবাগ জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ সালাউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভ্রাম্যমাণ বা স্থানীয় যাদেরই পাওয়া যাচ্ছে তাদের ধরা হচ্ছে। এখানে কাউকে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।’

গত রবি ও সোমবার রাতে লালবাগ জেএন শাহ রোড হয়ে আমলীগোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পেছনে হেঁটে যাওয়ার সময় নাকে আসে গাঁজার গন্ধ। দেখা যায়, মমতাজ (৩০) নামের একজনের নেতৃত্বে বসেছে জুয়ার আসর। লুডু আর তাস নিয়ে জমে উঠেছে আড্ডা। কেউ কেউ এসে তার কাছ থেকে কাগজের পুঁটলি বাঁধা গাঁজা নিয়ে যাচ্ছে ৪০ থেকে ৮০ টাকা দিয়ে। কথা বলার চেষ্টা করলে কিছু না বলে চলে যায় মমতাজ। রহমত আলী নামের স্থানীয় একজন বললেন, ‘এখানে প্রায় প্রতি রাইতেই এই রহম মাতলামির আড্ডা বহে। মমতাজ নামের এই মহিলাটা আগে শহীদনগর থাকত। এহন কামরাঙ্গীর চর থাহে। সেইখান থেইক্কা এইহানে আইসা ইয়াবা আর গাঁজা বিক্রি করে।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মমতাজ নামের ওই ইয়াবা কারবারি তার স্বামী খোরশেদকে নিয়ে গত বছরের জানুয়ারি মাসে শহীদনগরে বাসা ভাড়া নেয়। ওই বছর ৫ জুন কামরাঙ্গীর চরে মাদকবিরোধী অভিযানে হুজুরপাড়া মধুমতী কারখানার সামনে রশিদের গোডাউন থেকে ৮৩ কেজি গাঁজাসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে স্থানীয় পুলিশ, যার মধ্যে একজন ছিল এই মমতাজ। এই মমতাজ সেই মমতাজ কি না, জানতে চাইলে লালবাগ থানার ওসি কে এম আশরাফ উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি এই থানায় যোগদান করেছি বেশিদিন হয়নি। এ ছাড়া গ্রেপ্তারকৃত আসামির জামিন হয়েছে কি না সে বিষয়ে সব সময় আমরা জানতে পারি না। গত এক মাসে আমরা ৫৩ জন মাদক ক্রেতা ও বিক্রেতাকে আটক করেছি। তাদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হচ্ছে।’

গত সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে কামরাঙ্গীর চর লোহার ব্রিজে গিয়ে দেখা যায়, ডান পাশের পরিত্যক্ত লোহার ব্রিজে হলুদ টি-শার্ট আর লুঙ্গি পরে একজন বসে আছে। সামনে যেতেই ব্রিজের পিলারের নিচ থেকে কাগজে মোড়ানো গাঁজার পুঁটলি নিয়ে দ্রুত হেঁটে চলে যায় সে। এ সময় ব্রিজের বিভিন্ন জায়গায় চারজন বিক্রেতা আর বেশ কয়েকজন ক্রেতা দেখা গেল। এ ছাড়া শহীদনগর ৬ নম্বর গলির রানা, ৮ নম্বর গলির দুই পাশের চায়ের দোকানের পাশে লম্বু রাসেল, ৯ নম্বর গলির চিশতি ও ফয়সাল, ১০ নম্বর গলিতে ঢুকতেই বাঁ পাশে রনজুদের বাসার নিচে ভ্রাম্যমাণ মাদক বিক্রেতাদের দেখা যায়।

স্থানীয় লোকজন জানিয়েছে, আগে আমলীগোলা খেলার মাঠ, বালু মাঠ, বেড়িবাঁধের কিছু স্থানে মাদক বিক্রেতাদের ব্যাপক আনাগোনা ছিল। তবে এখন অভিযানের কারণে কমে গেছে। সরেজমিনে গিয়েও সেখানে মাদকের আখড়া দেখা যায়নি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা