kalerkantho

শুক্রবার । ২৩ আগস্ট ২০১৯। ৮ ভাদ্র ১৪২৬। ২১ জিলহজ ১৪৪০

গ্রামীণফোন-রবির ব্যান্ডউইডথ ক্যাপিং প্রত্যাহার, এনওসি দেওয়া বন্ধ

সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ না করার জের

বিশেষ প্রতিনিধি   

১৮ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



গ্রামীণফোন-রবির ব্যান্ডউইডথ ক্যাপিং প্রত্যাহার, এনওসি দেওয়া বন্ধ

মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোন ও রবির কাছে পাওনা প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা আদায়ের জন্য এ দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রথম অপারেশনাল ব্যবস্থা থেকে সরে এসে দ্বিতীয় ব্যবস্থা নিয়েছে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। দ্বিতীয় ব্যবস্থায় এই দুই অপারেটরকে তাদের গ্রাহক সেবার নতুন কোনো প্যাকেজ এবং নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও বিদ্যমান নেটওয়ার্ক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিদেশ থেকে কোনো যন্ত্রপাতি আমদানির এনওসি (অনাপত্তিপত্র) দেওয়া হবে না। এতে অপারেটর দুটির নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ বন্ধ হয়ে যাবে।

এর আগে গত ৪ জুলাই প্রথম ব্যবস্থায় গ্রামীণফোনের ৩০ আর রবির ১৫ শতাংশ ব্যান্ডউইডথ কমিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু গ্রাহকদের ভোগান্তির কথা বিবেচনায় নিয়ে গতকাল বুধবার এ ব্যবস্থা প্রত্যাহার করা হয়। ফলে অপারেটর দুটির গ্রাহকরা ১৩ দিন আগের মতোই ইন্টারনেট সেবা পাবে।

গতকাল বিকেলে বিটিআরসিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান নিয়ন্ত্রক এ সংস্থাটির চেয়ায়ম্যান মো. জহুরুল হক। তিনি বলেন, ‘এক দশক আগে অডিটে গ্রামীণফোনের কাছে সরকারের পাওনার পরিমাণ নির্ধারণ হয় তিন হাজার ৩৪ কোটি টাকা। গ্রামীণফোন তখন উচ্চ আদালতে গেলে আদালত আন্তর্জাতিকমানের অডিট ফার্ম দিয়ে আবার অডিট করতে বলেন। আদালতের নির্দেশ মেনে আবার অডিটে গ্রামীণফোনের কাছে পাওনার  পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৫৭৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে বিটিআরসির পাওনা আট হাজার ৪৯৪ কোটি এক লাখ টাকা এবং এনবিআরের পাওনা চার হাজার ৮৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। আর অডিটে রবির কাছে পাওনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৬৭ কোটি ২৩ লাখ ৯১ হাজার ৪৭৬ টাকা। এর মধ্যে এনবিআরের পাওনা ১৮৯ কোটি টাকা। বিটিআরসি থেকে বারবার তাগিদ দেওয়ার পরও এই দুই মোবাইল অপারেটর এ টাকা দিচ্ছে না। এ কারণে প্রশাসনিক ব্যবস্থা হিসেবে আমরা তাদের ব্যান্ডউইডথ ক্যাপিং করার সিদ্ধান্ত নিই।’

বিটিআরসি চেয়ারম্যান জানান, গত মঙ্গলবার ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের উপস্থিতিতে এক বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয় এবং ব্যান্ডউইডথ ক্যাপিংয়ের ওই ব্যবস্থা গ্রাহকদের স্বার্থের পরিপন্থী বিবেচিত হয়। এ কারণেই ব্যান্ডউইডথ ক্যাপিং তুলে নিয়ে গ্রামীণফোন ও রবির এনওসি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

চেয়ারম্যান আরো বলেন, ‘গ্রামীণফোন ও রবির কাছে সরকারের পাওনা টাকা মাপ করে দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই। ওরা সালিস আইন, ২০০১-এর অধীনে নিষ্পত্তির দাবি জানালেও আইনে সে সুযোগ নেই। আবার বিষয়টি নিয়ে উচ্চ আদালতে গেলেও অনেক দেরি হয়ে যাবে। আমরা আশা করছি, টাকা পেয়ে যাব। রাষ্ট্রীয় টাকা রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা হবে।’

প্রসঙ্গত, গ্রামীণফোন ও রবির কাছে পাওনা আদায়ের জন্য বিটিআরসি গত ২২ মে তাদের ২২৭তম সভায় এ দুই অপারেটরের বিরুদ্ধে আট ধরনের অপারেশনাল ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। গত ৪ জুন কালের কণ্ঠে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যসহ একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ব্যান্ডউইডথ ক্যাপিং ও এনওসি বন্ধ ছাড়াও সম্ভাব্য অন্য ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে—এমএনপি পোর্ট ইন বন্ধ বা সীমিত করা, নতুন গ্রাহক নেওয়া বন্ধ বা সীমিত করে দেওয়া, ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়ে বা আইজিডাব্লিউ পাওয়া থেকে অন্তর্গামী বা বহির্গামী কল বন্ধ বা সীমিত করা, আইসিএক্স বা ইন্টার কানেকশন এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে স্থানীয় কল বন্ধ বা সীমিত করে দেওয়া এবং নেটওয়ার্ক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা এসএমএসের মাধ্যমে সারা দেশ বা নির্দিষ্ট এলাকায় ৩জি ও  ৪জি সেবা বন্ধ করে দেওয়া।

এ ছাড়া গতকালের সংবাদ সম্মেলনে বিটিআরসির পক্ষ থেকে জানানো হয়, পাওনা টাকা আদায় না হলে একসময় এই দুই প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগও করা হতে পারে।

গত ১৩ দিন গ্রামীণফোন ও রবির ব্যান্ডউইডথ সীমিত করে দেওয়ার ফলে সরকারের কত টাকার রাজস্ব ক্ষতি হলো—এ প্রশ্নে বিটিআরসির চেয়ারম্যান বলেন, ‘ক্ষতির পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। এনওসি বন্ধ করে দেওয়ায় গ্রাহকদের ওপর কী ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে—এ প্রশ্নে চেয়ারম্যানের জবাব, ‘বড় কোনো পদক্ষেপের ভালো-মন্দ উভয় দিকই রয়েছে। বৃহৎ কল্যাণের জন্য ক্ষতি মেনে নিতে হবে।’

গ্রামীণফোন ও রবির প্রতিক্রিয়া : বিটিআরসির সব শেষ এই পদক্ষেপ সম্পর্কে গ্রামীণফোনের পক্ষ থেকে গতকাল বলা হয়,  ‘ইন্টারনেট ব্যান্ডউইডথ কমানোর সিদ্ধান্তটি উঠিয়ে নেওয়ায় বিটিআরসির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমরা মনে করি বিরোধ নিষ্পত্তিতে আলোচনা এবং সালিস প্রক্রিয়াই সবচেয়ে ভালো পন্থা।’

আর রবির পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘অনাপত্তিপত্র (এনওসি) বন্ধের সিদ্ধান্তে গ্রাহকের ওপর বহুমাত্রিক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। টেলিযোগাযোগ খাতে জড়িত অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যেমন নেটওয়ার্ক পার্টনার, এনটিটিএনসহ আইটিসামগ্রী ও সফটওয়্যার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নতুন লাইসেন্স পাওয়া তিনটি টাওয়ার কম্পানির ব্যবসাও এর ফলে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

মন্তব্য