kalerkantho

মায়ের ইচ্ছায় কলেজে গেল অদম্য রাহাত

মা চাননি তাঁর পঙ্গু ছেলেটা দুয়ারে দুয়ারে ঘুরুক

দিলীপ কুমার মণ্ডল, নারায়ণগঞ্জ   

৭ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মায়ের ইচ্ছায় কলেজে গেল অদম্য রাহাত

‘পায়ে নয়, তাঁর স্যান্ডেল দুটি হাতে। জন্ম থেকেই অপূর্ণাঙ্গ ছোট ছোট পা দুটি বেঁকে পেছন দিকে চলে গেছে বলে হাতে ভর দিয়েই কলেজ অধ্যক্ষের কার্যালয়ে প্রবেশ করল সে। ডান হাতের বগলে তার একটি প্লাস্টিকের ফাইল। দরজায় এমন এক কিশোরকে নজরে পড়তেই অধ্যক্ষ জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কি ভর্তি হতে এসেছ? ছেলেটি বলল, ‘জি, স্যার, আমি ভর্তি হব।’ জবাব শুনেই উপস্থিত সবাই থ বনে যান। অধ্যক্ষ রুমন রেজা খবর দিলেন কলেজ স্কাউটকে। নির্দেশ দিলেন, ‘এই ছেলেটিকে ভর্তির জন্য যেন পাঁচতলায় কষ্ট করে যেতে না হয়, সব নিচতলা থেকে ব্যবস্থা করো।’

ঘটনাস্থল নারায়ণগঞ্জ জেলা শহরের অন্যতম বিদ্যাপীঠ নারায়ণগঞ্জ কলেজ। জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধী সদ্য এসএসসি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী রাহাত (১৯) গত বৃহস্পতিবার কলেজে ভর্তি হতে গেলে এই দৃশ্যের অবতারণা হয়।

দুটি হাতে ভর করে চলা এই রাহাতকে তার পঙ্গুত্ব বেঁধে রাখতে পারেনি। হাতে ভর দিয়ে চলতে চলতে পিএসসি, জেএসসি ও এসএসসি পাস করে আজ কলেজ প্রাঙ্গণে চলে এসেছে এই অদম্য কিশোর। 

কথা হয় রাহাতের সঙ্গে। আলাপকালে সে জানায়, জন্ম থেকেই পঙ্গুত্ব নিয়ে পৃথিবীতে আসে সে। পৈতৃক নিবাস নারায়ণগঞ্জ ফতুল্লার বৌবাজার সর্দার বাড়ি। দুই ভাই এক বোনের মধ্যে রাহাত সবার ছোট। ১ শতাংশেরও কম জায়গা নিয়ে দুটি রুমে বসবাস তাদের। বাবা এমদাদ উল্লাহ ১০ বছর ধরে অন্ধ। মা খালেদা বেগম মারা গেছেন দেড় বছর আগে। জন্মের পরই রাহাতের পঙ্গুত্ব নিয়ে মহা দুশ্চিন্তায় পড়ে পুরো পরিবার। কিন্তু রাহাতের মা খালেদা বেগমের সংকল্প ছিল, এই পঙ্গু জীবনে কোথাও রাহাতকে কারো মুখাপেক্ষী হতে দেবেন না। রাহাতও সেভাবেই গড়ে উঠেছে।

ছয় বছর বয়সেই নানা বাধা-বিপত্তি প্রতিরোধ করে পঙ্গু রাহাতকে ফতুল্লার শেহারচর প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি করে দেন তাঁর মা খালেদা। সেখানে রাহাতের পাশে দাঁড়ান উপজেলা প্রতিবন্ধী সংস্থায় চাকরিরত রাহাতের এলাকার মামা লিটন। নানাজনের সহায়তায় পিএসসিতে ৪.২২ পেয়ে পাস করে সে। উত্তীর্ণ হয়ে হাই স্কুলে ভর্তি হতে গিয়ে শুরু হয় বিপত্তি। ফতুল্লা পাইলট স্কুলে ভর্তি হতে গেলে সেখানকার কর্তৃপক্ষ পঙ্গু বলে তাকে ভর্তি নিতে অস্বীকৃতি জানায়। উপায়ান্তর না পেয়ে নানা লোকের হাত ধরে রাহাত দেখা পায় নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি শামীম ওসমানের। তাকে সে জানায়, পঙ্গু বলে তাকে ভর্তি নিচ্ছে না স্কুল কর্তৃপক্ষ। এরপর এমপি শামীম ওসমানের হস্তক্ষেপে রাহাত ভর্তি ওই স্কুলে। মাধ্যমে রাহাতের পাশে দাঁড়ান তার আপন ফুফাতো বোন নিপা। তিনি ফতুল্লাহ পাইলট স্কুলের শিক্ষিকা। তিনি রাহাতকে বিনা বেতনে প্রাইভেট পড়াতেন। এর মধ্যে রাহাতের পেটের মধ্যে টিউমার দেখা দেয়। অসুস্থতার কারণে জেএসসিতে সে ২.৬ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়। পরে এসএসসিতে ৩.১১ পেয়ে উত্তীর্ণ হয় সে।

নিজের পরিবারের কথা জানিয়ে রাহাত জানায়, বড় ভাই  মো. রিফাত মালদ্বীপ প্রবাসী। সে পড়াশোনায় যথেষ্ট সহায়তা করেছে। বড় বোন সায়মা বিয়ে হয়ে গেছে। সেও শিক্ষা জীবনে পাশে দাঁড়িয়েছেন। বাবা এমদাদ উল্লাহ থান কাপড়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ছিলেন। কিন্তু ১০ বছর আগে চক্ষুরোগে অন্ধ হয়ে যান তিনি।

রাহাতের জীবনের সবচেয়ে বড় কষ্টের কথা উল্লেখ করে জানায়, গত বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি মা খালেদা বেগম মারা যান কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে। একদিকে বাবা অন্ধ অন্যদিকে মা নেই। বড় ভাই রিফাতকে অনেক কষ্ট করতে হচ্ছে। মায়ের সেই কথা রাহাত কখনো ভুলতে পারে না। মা বলত, ‘আমি মরে গেলে তোকে কে দেখব। তুই দুয়ারে দুয়ারে ঘুরবি তা হতে দেব না। আমার যত কষ্ট হোক তোকে পড়াশোনা করাব। আজ মা থাকলে কতই না খুশি হতো যে আমি কলেজে ভর্তি হচ্ছি।’

রাহাত সমাজের প্রতিবন্ধী লোকদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা যারা জন্ম প্রতিবন্ধী বা কোনো কারণে অঙ্গহানি ঘটেছে, তারা যেন কারো মুখাপেক্ষী না হই। চেষ্টা করতে হবে নিজের পায়ে দাঁড়াতে। এটাই হচ্ছে আমার চাওয়া। আমাকে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করলে কাউকে কোনো জায়গায় ছোট হতে হবে না।’

নারায়ণগঞ্জ কলেজের অধ্যক্ষ রুমন রেজা বলেন, আজকাল অনেক সুস্থ মানুষ নানা অজুহাতে হাত পেতে চলে। কিন্তু রাহাতের মতো ছেলেরা সমাজ ও রাষ্ট্রের উদাহরণ। ওদের মূল্যায়ন করতে হবে। রাহাত যদি চায় এই কলেজ থেকে পড়াশোনা করেই এই কলেজে প্রতিবন্ধী কোটায় তার চাকরির ব্যবস্থা করব।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা