kalerkantho

শুক্রবার । ২২ নভেম্বর ২০১৯। ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ডিজিটাল জগতে সমৃদ্ধির পথে বাংলা ভাষা

নির্ধারণ হতে যাচ্ছে অনলাইনে বাংলায় লেখার প্রমিত মান

কাজী হাফিজ   

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাংলায় হাতের বা মুদ্রিত কোনো লেখা কম্পিউটার টেক্সটে পাল্টে নিতে আর দীর্ঘ সময় নিয়ে কি-বোর্ডে টাইপ করতে হবে না। এসব লেখা স্ক্যান করে বিশেষ টুলসের মাধ্যমে নিমিষেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে। এ জন্য তৈরি হচ্ছে স্ক্রিন রিডার। এর মাধ্যমে কম্পিউটার বা অন্য কোনো ডিভাইস বাংলা লেখা পড়ে শোনাবে। বাণিজ্যিকভাবে প্রয়োজন এমন ১০টি ভাষা বাংলায়, আবার বাংলা থেকে ওই সব ভাষায় অনুবাদও করা যাবে মুহূর্তেই।

বাংলা বানান ও ব্যাকরণ শুদ্ধ করার জন্যও তৈরি হচ্ছে বিশেষ সফটওয়্যার। তৈরি হচ্ছে প্রমিত মান। অনলাইনে বাংলায় বিশাল কোনো লেখা জঙ্গিবাদকে উসকে দিচ্ছে কি না, তা জানার জন্য পুরোটা পড়ার দরকার হবে না। কম্পিউটারই এটি বলে দেবে। তৈরি হচ্ছে অনলাইনে ব্যবহারের জন্য ১০ লাখেরও বেশি শব্দের ভাণ্ডার। এগুলো শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের ২৬ কোটিরও বেশি বাংলাভাষীকে ইন্টারনেট বা অন্তর্জাল প্রযুক্তির জগতে তাদের ভাষার ব্যবহার সহজ ও উন্নত করে তুলবে। বাংলা ভাষার ব্যবহার সমৃদ্ধ করতে এ ধরনের আরো বিশেষ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটালজগতে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর ভাষা বাংলার প্রবেশাধিকার এরই মধ্যে অর্জন হয়েছে। কারিগরি তেমন কোনো সমস্যা আর নেই। এখন একে এই জগতে আরো সমৃদ্ধ করা প্রয়োজন। বাংলাতে ইংরেজির মিশেল, শর্টকাটে বিকৃত করে লেখার প্রবণতা—এগুলো প্রমিত বাংলাকে অনেকটাই হুমকির মুখে ফেলেছে।

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রী এবং ‘বিজয়’ কি-বোর্ডের স্বত্বাধিকারী মোস্তাফা জব্বার এ বিষয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমানে কম্পিউটারে বাংলা ভাষায় লেখা এবং তা ইন্টারনেটে প্রকাশের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নেই। কারিগরি সমস্যাটা দূর হয়েছে। যেকোনো ডিভাইস থেকে এটি করা যাচ্ছে। ১৯৮৭ সালে বিজয় কি-বোর্ড চালু হওয়ার পর এর মাধ্যমে কম্পিউটারে বাংলা লেখা অনেক সহজ হয়ে গেছে। অমর একুশে গ্রন্থমেলায় এখন যত বই প্রকাশিত হচ্ছে তার প্রায় সবই বিজয় কি-বোর্ডের মাধ্যমে লেখা। কেউ কেউ ‘অভ্র’ বা এজাতীয় সফটওয়্যারের অবদানের কথা বলেন। কিন্তু বাংলা হরফ ছাড়া এসব সফটওয়্যার ব্যবহারকারীদের যুক্তাক্ষর না চেনার জগতে নিয়ে যাচ্ছে। এখনো শুদ্ধভাবে লেখার জন্য বিজয় কি-বোর্ডের বিকল্প নেই। রোমান হরফের সাহায্যে বাংলা লেখার বদলে আমাদের বাংলা হরফেই লিখতে হবে। সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এ বিষয়ে কাজ করছে। কোন কি-বোর্ড দিয়ে আমাদের লিখতে হবে সে বিষয়ে প্রমিত মান তৈরি হচ্ছে। ১৫৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। ১৬টি টুলস তৈরি হচ্ছে। বাংলা ভাষার সঙ্গে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষাও তথ্য-প্রযুক্তিতে সংযুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।’

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের ‘গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে তথ্য-প্রযুক্তিতে বাংলা ভাষার ব্যবহার সমৃদ্ধকরণ প্রকল্প’-এর পরিচালক ড. মো. জিয়াউদ্দিন বলেন, ‘আমরা এ প্রকল্পের মাধ্যমে তথ্য-প্রযুক্তিতে বাংলা ব্যবহার আরো সমৃদ্ধ করার জন্য ১০ লাখেরও বেশি শব্দের ভাণ্ডার গড়ে তুলতে যাচ্ছি। এ উদ্যোগ শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় ২৬ কোটি বাংলাভাষীর জন্য নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পে ওসিআর বা অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিডার নামের একটি সফটওয়্যারও প্রস্তুত হতে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে বাংলায় হাতের লেখা বা মুদ্রিত কোনো লেখা স্ক্যান করে সফটওয়্যারে পরিণত করা যাবে। অনেক পুরনো দলিল-দস্তাবেজও এ সফটওয়্যারের মাধ্যমে স্বল্প সময়ে ডাটাবেইসে সংরক্ষণযোগ্য করা সম্ভব হবে। তৈরি হচ্ছে স্ক্রিন রিডার। এর মাধ্যমে কম্পিউটার বা অন্য কোনো ডিভাইস বাংলায় কোনো লেখা পড়ে শোনাবে। বাংলা বানান ও ব্যাকরণ ঠিক করার জন্যও সফটওয়্যার তৈরি হচ্ছে। আগামী ১৮ মাসের মধ্যেই এটা প্রস্তুত হয়ে যাবে। তৈরি হচ্ছে সেন্টিমেন্ট অ্যানালিসিস ব্যবস্থা। এটি ব্যবহার করে অনলাইনে বিভিন্ন বাংলা পোস্টের ভালো, মন্দ, নিরপেক্ষতা—এসব দ্রুত অ্যানালিসিস করা যাবে। পাঁচটি স্কেলে এই অ্যানালিসিস হবে। কোনো পোস্ট জঙ্গিবাদকে উসকে দিতে চাইলেও তা পুরো না পড়েই শনাক্ত করা যাবে। কোনো বিষয়ে জনমতের জরিপের ফলাফলও পাওয়া যাবে এতে। এটি নিয়ে খুব দ্রুত কাজ শুরু হতে যাচ্ছে।

প্রকল্পে সব প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারের জন্য বাংলা কি-বোর্ডের উন্নয়নের বিষয়টিও রয়েছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষাগুলোর জন্যও কি-বোর্ড উন্নয়ন করা হবে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর যাদের নিজস্ব কোনো বর্ণমালা নেই তাদের ভাষার শব্দগুলো নিয়েও অনলাইনভিত্তিক আর্কাইভ গড়ে তোলা হবে। এরপর রয়েছে মেশিন ‘ট্রান্সলেশন’। এর মাধ্যমে গুগলের মতোই ১০টি ভাষা বাংলায় অনুবাদ এবং বাংলা থেকে সেসব ভাষায় অনুবাদ করা যাবে। এ ক্ষেত্রে বাণিজ্যিকভাবে  প্রয়োজনীয় ভাষাগুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। প্রস্তুত করা হচ্ছে ‘ইন্টারন্যাশনাল ফোনেটিক অ্যালফাবেট কনভার্টার’ বা আইপিও। এর মধ্যে বাংলা ভাষা ইউনিকোডে রূপান্তর করলে কোনো শব্দ ভেঙে যাবে না।

শ্রবণ, বাক্ এবং দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্যও বিশেষ টুলস তৈরি হচ্ছে। ধরা যাক, কোনো একটি ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী বাক্প্রতিবন্ধী। কিন্তু সে কথা বলতে পারে না। এ ক্ষেত্রে ওই বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করলে তার অঙ্গভঙ্গি টেক্সট হয়ে যাবে।

মো. জিয়াউদ্দিন আরো বলেন, ‘ইন্টারনেটজগতে বাংলা ভাষার এসব টুলসের স্বীকৃতি পেতে হলে এগুলোর স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন বা প্রমিতকরণ দরকার। বাংলাদেশে যেসব মানুষকে সবাই এক নামে চেনে, যেমন—ড. জাফর ইকবাল। তাঁদের মতো মানুষ এবং বিএসটিআইয়ের মাধ্যমে এটি করা হবে।

তথ্য-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, ‘তথ্য-প্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা ব্যবহার অনেক বেড়েছে।  তবে অনলাইনভিত্তিক অনেক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে ধরনের বাংলা লেখা হচ্ছে, তা আমাদের বিচলিত করে। ইংরেজি-বাংলা মিলিয়ে শর্টকাট এসব লেখা প্রমিত বাংলাকে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। এটি মানা যায় না। অনলাইনে বাংলা অভিধান রয়েছে। এটি আরো উন্নত হওয়া দরকার।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা