kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

অবহেলিত মেয়েশিশু

জলঢাকায় আলোকিত করছে ‘চাঁদমনি’

আসাদুজ্জামান স্টালিন, জলঢাকা (নীলফামারী)   

১৫ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জলঢাকায় আলোকিত করছে ‘চাঁদমনি’

পিজিরুল আলম দুলাল ও মোতাহারা বেগম (মৃত) চাঁদমনি দম্পতির প্রতিষ্ঠিত মেয়েশিশুদের আশ্রম ‘চাঁদমনি’। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘মানুষ মানুষের জন্য’—এই স্লোগানে একটি সাইনবোর্ড চলার পথে দেখা মেলে নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার চাওড়াডাঙ্গী গ্রামের এক বাড়িতে। সেই বাড়িটি হলো ‘চাঁদমনি’ নামে দরিদ্র অসহায় মেয়েশিশুদের আশ্রম। তাদের আলোর পথ দেখাচ্ছে ‘চাঁদমনি’।

১৯৯৯ সালে সমাজের বিভিন্ন অসংগতি ও অবহেলিত মেয়েশিশুদের কথা চিন্তা করে নিঃসন্তান দম্পতি পিজিরুল আলম দুলাল ও মোতাহারা বেগম (মৃত) চাঁদমনি নামে প্রতিষ্ঠানটি শুরু করেন। কল্যাণমুখী নীতি-আদর্শের কারণে স্থানীয়ভাবে ব্যাপকভাবে পরিচিতি ‘চাঁদমনি’। সমাজে পিছিয়ে পড়া মেয়েশিশুদের নিয়ে কাজ করে চাঁদমনি। এ পর্যন্ত প্রায় ৫০০ আবাসিক ও শতাধিক হিন্দু-হরিজন পল্লীর অনাথ-দুস্থ মেয়েশিশুর লেখাপড়ার ব্যবস্থা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। মেয়েশিশুদের জন্য পিজিরুলের নিজ বাড়ি, অর্থাৎ চাঁদমনিতে আছে বিনা মূল্যে আবাসিক থাকা, খাওয়া ও লেখাপড়ার ব্যবস্থা। বর্তমানে এখানে আছে ৫০ জন শিশু-কিশোরী। তারা এই আশ্রমের সার্বিক সহযোগিতায়  স্কুল-কলেজে পড়ছে। এখানে দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে কলেজপড়ুয়া মেয়েদের নেওয়া হয়। বিধবা মায়েরা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে রেখে যান তাঁদের আদরের মেয়েদের। এখানে থাকার শর্ত আছে, বাল্যবিবাহ দেওয়া চলবে না, কমপক্ষে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াতে হবে, নিজ ধর্ম ঠিকমতো পালন করবে আর ধর্মান্ধতা-কুসংস্কার প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। লেখাপড়ার জন্য চাঁদমনিতে নিরিবিলি পরিবেশ, হলরুম, লাইব্রেরি রুম ও টিভি রুম আছে। নিজ নিজ ঘরে আছে টেবিল, চেয়ার। ক্লাসের ছাড়াও বাইরের বই পড়ার সুযোগ আছে। ২০ বছর ধরে একই নিয়মে চলছে ‘চাঁদমনি’।

ওরা পাঁচজন : জেসমিন বানু নিপা, অন্জুয়ারা নিশা, প্রীতি, স্মৃতি ও নীলাকে দিয়েই যাত্রা করে চাঁদমনি। তাঁরা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে অনেকেই এখন স্বাবলম্বী। তবে তাঁরা ভোলেননি তাঁদের ধর্মপিতা ও জীবনসিঁড়ি চাঁদমনিকে। তাঁদের পরে আসে রুবি, দীপা, হেলালিসহ অনেকে। বর্তমানে এখানে ৫০ জন মেয়ে আবাসিকভাবে আছে। তারা পড়ালেখা করছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। চাঁদমনি থেকে শিক্ষা নিয়ে জীবনকে সাজাতে সক্ষম হয়েছেন জেসমিন নিপা। তিনি বিএসসি পাস করেছেন। বর্তমানে চাকরি করছেন সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগে। মনতেজা বানু ও মফেজা বানু সরকারি নার্স। রিতিনা বানু রিতা, লিপছি আক্তার রুবি ও আফরিন নাহার শোভা চাঁদমনির সহায়তায় অর্থনীতিতে এমএ করছেন কারমাইকেল কলেজে। চাঁদমনিতে থেকে এসএসসি পাস করেছে প্রায় ৮০ জন। বিবাহিতরা কেউ এখানে থাকে না।

মেলা ও অন্যান্য কাজ : চাঁদমনিতে দ্বিবার্ষিক একটি হস্তশিল্প প্রদর্শনী মেলা হয়। স্থানীয়সহ দূর-দূরান্ত থেকে প্রচুর দর্শনার্থীর সমাগম হয় সেখানে। মেলায় নারী দর্শনার্থীদের প্রচুর উপস্থিতি মেলে। শুরু থেকেই বাল্যবিবাহ রোধে, সমাজের কুপ্রথা, যৌতুকের বিরুদ্ধে কাজ করে ‘চাঁদমনি’। সামাজিক ও ব্যক্তিসচেতনতা সৃষ্টি করাই প্রতিষ্ঠানটির মূল কাজ। এ কারণে উপজেলায় বাল্যবিয়ে ও যৌতুক প্রথা অনেকটাই কমে গেছে। আবাসিক ছাড়াও অনেক অনাবাসিক হিন্দু ও হরিজন পল্লীর দরিদ্র মেয়েদের পড়াশোনায় সহযোগিতা দিয়ে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।

ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার : দেশে ভ্রাম্যমাণ পাঠাগারের পথিকৃৎ অধ্যাপক আবদুলাহ আবু সায়ীদের অনুপ্রেরণায় চাঁদমনির আছে ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার। রিকশাভ্যানগাড়ির ওপর সাজানো হয়েছে এ পাঠাগার। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে ভ্যানগাড়ি দাঁড় করিয়ে শিক্ষার্থী ও পথচারীদের বই পড়তে উৎসাহ দেওয়া হয়।

বাড়তি শিক্ষা : কোরআন শিক্ষার জন্য চাঁদমনিতে আছে মাদরাসা। সপ্তাহে চার দিন অভিজ্ঞ আলেম দিয়ে কোরআন শিক্ষা দেওয়া হয়। ছবি আঁকার ক্লাস হয় সপ্তাহে এক দিন। এ ছাড়া অনাবাসিক কিছু ছাত্রীকে ছবি আঁকা শেখার সুযোগ দেওয়া হয়। মাসে দু-এক দিন গানের আসর বসে। গান শেখারও ব্যবস্থা আছে। এ ছাড়া কিছু মেয়ে উপজেলার গানের প্রতিষ্ঠানগুলোতে গিয়ে গান শেখার সুযোগ পায়। চাঁদমনিতে আবাসিক মেয়েদের হস্তশিল্প ও সেলাই প্রশিক্ষণ নিতে হয়।

সমাজকে আলোকিত করতে অবিরত ছুটছেন পিজিরুল আলম দুলাল। তিনি হজ পালন করেন ১৯৯৫ সালে। উত্তরা ব্যাংকের সাবেক এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা স্বেচ্ছায় অবসর নেন ১৯৯৬ সালে। তাঁর বাবা মোসলেম উদ্দিন আহমেদ ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক। মা পিয়ারা আহমেদ ছিলেন সমাজসেবাকর্মী ও ঢাকার গোপীবাগের একটি স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক। তাঁরা ছিলেন দুলালের সমাজসেবা কর্মের উৎসাহদাতা।

আর্থিক কর্মকাণ্ড : পিজিরুল আলম দুলাল তাঁর পেনশনের সব টাকা চাঁদমনির কাজেই ব্যয় করেছেন। এ ছাড়া তাঁর পৈতৃক ও নিজের প্রায় সবটুকু জমি চাঁদমনি প্রতিষ্ঠানের কাজে দিয়ে দিয়েছেন। চাঁদমনির বর্তমান বার্ষিক ব্যয় প্রায় আট লাখ টাকা। বন্ধু-বান্ধব, ব্যাংকের সাবেক সহকর্মী, বিদেশে অবস্থানরত আত্মীয়দের কেউ কেউ, বোন মাসুদ বেগম, ভগ্নিপতি আব্দুল কাদের তাঁকে প্রতিবছর কিছু সহযোগিতা করেন।

চাঁদমনির প্রতিষ্ঠাতা পিজিরুল আলম দুলাল বলেন, ‘সমাজের অবহেলিত কন্যাশিশু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম শোনার আগেই যাদের ভবিষ্যৎ মরে যায়, তাদের মণিকোঠায় চাঁদের মতো শিক্ষার আলো বিলিয়ে দেওয়াই চাঁদমনি প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য। অভাব-অনটন থেকে বের হয়ে কোনো মেয়ে সুশিক্ষায় শিক্ষিত হলে তার মাধ্যমে সমাজের অমঙ্গল হবে না। সেই আশা এবং লক্ষ্য নিয়ে চাঁদমনি তৈরি করা।’

স্থানীয় বালাগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আব্দুল ওহাব বলেন, ‘বৃদ্ধ বয়সেও বাবার মতো যত্ন নিয়ে পিজিরুল আলম দুলাল মেয়েশিশুদের শিক্ষিত করে তুলছেন। এটি হয়তো আগামী দিনে আমাদের সবার কাছে আদর্শ ও ইতিহাস হয়ে থাকবে।’

স্থানীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘চাঁদমনির প্রতিষ্ঠাতা পিজিরুল আলম দুলাল সাহেব একজন প্রগতিশীল আদর্শের মানুষ। স্থানীয় পর্যায়ে নারী শিক্ষা বিস্তারে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর চিন্তা-চেতনা ও সহযোগিতায় অনেক মেয়েই আজ স্বাবলম্বী। এমন মহৎ কাজে সবারই উচিত তাঁর পাশে থেকে উৎসাহ দেওয়া।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা