kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৩ আষাঢ় ১৪২৮। ১৭ জুন ২০২১। ৫ জিলকদ ১৪৪২

নারীর কৃতিত্বে গর্বিত সশস্ত্র বাহিনী

বিশেষ প্রতিনিধি   

১৯ ডিসেম্বর, ২০১৪ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নারীর কৃতিত্বে গর্বিত সশস্ত্র বাহিনী

ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট নাইমা হককে স্কোয়াড্রন ব্যাজ পরিয়ে দেওয়া হচ্ছে

সশস্ত্র বাহিনীতে নারীরাও যে যোগ্য তার সর্বশেষ প্রমাণ রাখলেন বিমানবাহিনীর দুজন নারী কর্মকর্তা-ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট নাইমা হক ও ফ্লাইং অফিসার তামান্না-ই-লুৎফি। বাংলাদেশে বিমানবাহিনীতে প্রথমবারের মতো নারী বৈমানিক নিয়োগের পর এই দুই নারী গত ৩ আগস্ট থেকে তাঁদের গ্রাউন্ড প্রশিক্ষণ শুরু করেন। এরপর গত ২৩ সেপ্টেম্বর বিমানবাহিনীর ঘাঁটি বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের ১৮ নম্বর স্কোয়াড্রনে প্রথমবারের মতো হেলিকপ্টার উড্ডয়ন প্রশিক্ষণ শুরু করেন তাঁরা। বেল-২০৬ হেলিকপ্টারে বেসিক কনভার্সন কোর্সের জন্য নির্বাচিত হওয়া এই দুই নারী কর্মকর্তার মধ্যে গত ২০ নভেম্বর তামান্না-ই-লুৎফি এই হেলিকপ্টারে প্রথম সফলভাবে একক উড্ডয়নে সক্ষমতা অর্জন করেন।

ওই দিনই আইএসপিআরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দেশে বেসামরিক ক্ষেত্রে নারী বৈমানিক থাকলেও সামরিক জীবনের ঝুঁকিপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং বৈমানিক পেশায় বাংলাদেশে এবারই প্রথম নারী বৈমানিক নিয়োগের মাইলফলক স্থাপন করে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী। বিজ্ঞপ্তিতে তামান্না-ই-লুৎফির বেল-২০৬ হেলিকপ্টারে প্রথম সফলভাবে একক উড্ডয়নে সক্ষমতা অর্জন সম্পর্কে বলা হয়, 'নারীর অগ্রযাত্রার এই সাফল্য বাংলাদেশ বিমানবাহিনী তথা সমগ্র দেশ ও জাতির জন্য এক নতুন উৎসাহ ও উদ্দীপনার দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।'

এরপর ২৫ ঘণ্টা সফল প্রশিক্ষণ উড্ডয়ন শেষে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট নাইমা হকও একক উড্ডয়ন সক্ষমতা অর্জন করেন।

গত বুধবার বিমানবাহিনীর এই দুই নারী কর্মকর্তা তাঁদের প্রশিক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ এবং বৈমানিক হয়ে ওঠার প্রাথমিক ধাপের একটি অংশ সম্পন্ন করে একক উড্ডয়ন করেন। এই সাফল্যে বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার মার্শাল মোহাম্মদ ইনামুল বারী তাঁদের অভিনন্দন জানান এবং প্রশিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান। একক উড্ডয়ন শেষে ঘাঁটি এয়ার অধিনায়ক এয়ার কমোডর মো. সাঈদ হোসেন দুই নারী বৈমানিককে তাঁদের ফ্লাইং কাভার অল-এ স্কোয়াড্রন ব্যাজ পরিয়ে দেন।

জানা যায়, এই দুই নারী বৈমানিক বেল-২০৬ হেলিকপ্টারে মোট ৬৫ ঘণ্টা উড্ডয়নের প্রাথমিক ধাপ সম্পন্ন করার পর বিমানবাহিনীর বিভিন্ন হেলিকপ্টার স্কোয়াড্রনে দায়িত্ব পালন করবেন। এদিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতেও নারী কর্মকর্তারা তাঁদের যোগ্যতার প্রমাণ রেখে চলেছেন।

গত বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি এক হাজার মিটার উচ্চতা থেকে মোট ছয়বার লাফ দিয়ে বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্যারাট্রুপার হিসেবে সনদ অর্জন করেন সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জান্নাতুল ফেরদৌস। প্রতি সেকেন্ডে পাঁচ মিটার গতিতে প্রতিবারই সফলভাবে মাটিতে নেমে আসেন তিনি। এই দুঃসাহসিক কাজ শুধু দিনের আলোতেই নয়, রাতের বেলায়ও সম্পন্ন করতে হয় তাঁকে। এর এক মাস আগে ওই বছরের ১৩ জানুয়ারি শুরু হওয়া সিলেটের জালালাবাদ সেনানিবাসস্থ এসআইঅ্যান্ডটি-এ বেসিক প্যারা কোর্সে ক্যাপ্টেন জান্নাতুল ফেরদৌসসহ ১৫ জন নেভাল কমান্ডো ও পাঁচজন সেনা কর্মকর্তা অংশ নেন। জান্নাতুল ফেরদৌস কোর্স চলাকালে ফিল্ড টেস্ট ও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর ২০১৩ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি প্রথমবার বিমানবাহিনীর বিমানযোগে এক হাজার মিটার উচ্চতা থেকে সফলভাবে ভূমিতে অবতরণ করে দেশের প্রথম প্যারাট্রুপার হিসেবে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখান।

এরপর ওই বছরের ৮ এপ্রিল মেজর নুসরত নূর আল চৌধুরী (আর্টিলারি) বাংলাদেশের দ্বিতীয় নারী প্যারাট্রুপার হিসেবে সফলভাবে তাঁর পঞ্চম প্যারাস্যুট জাম্প সম্পন্ন করেন। তাঁর স্বামী মেজর মঞ্জুরুল হক বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন কমান্ডো ও ছত্রী সেনা। তাঁরা দুজনই গত ৮ এপ্রিল একই সঙ্গে প্যারাস্যুট জাম্প সম্পন্ন করেন।

২০১১ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশি এক নারী সেনা কর্মকর্তার সাহসী কাজ সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় সুদানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের (আসমিস) নিজস্ব ম্যাগাজিনে। 'ওমেন ইন আনট্রাডিশনাল জবস ডিমাইনিং' বা 'মাইন অপসারণের অপ্রথাগত কাজে নারী' শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের ক্যাপ্টেন ফেরদৌসী কাশেম মাইন অপসারণের মতো বিপজ্জনক কাজে নিয়োজিত একটি সামরিক প্লাটুনের একমাত্র নারী সদস্য। তবে নারী হিসেবে নয়, একজন দক্ষ বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ হিসেবেই নিজেকে মূল্যায়ন করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, 'এটা নারী বা পুরুষের বিষয় নয়। এটি হচ্ছে আস্থা, ধৈর্য ও দৃঢ় সংকল্পের বিষয়।' কিন্তু সাধারণভাবে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে মাইন ও অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ অপসারণের মতো উচ্চ ঝুঁকির কাজ মেয়েরা সাধারণভাবেই এড়িয়ে চলে। প্রতিবেদনটিতে আরো বলা হয়, ক্যাপ্টেন ফেরদৌসী কাশেম ও তাঁর সহকর্মীরা আসমিসের বাংলাদেশ মিলিটারি ডিমাইনিং প্লাটুনের সদস্য হিসেবে ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে দক্ষিণ সুদানের রাজধানী জুবাতে পৌঁছেন। প্রশিক্ষণ সূত্রে একজন প্রকৌশলী হিসেবে ক্যাপ্টেন ফেরদৌসী কাশেম জানান, তিনি মাইন অপসারণের কাজে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ ও অভিজ্ঞতা পেতে উৎসাহী। তিনি বলেন, 'এর আগে নির্মাণকাজের অনেক অভিজ্ঞতা পেয়েছি। এখন এখানে মাইন অপসারণকাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করতেই আসা।'

প্রসঙ্গত, ২০০০ সালে বংলাদেশ সেনাবাহিনীর নিয়মিত কমিশনে মহিলাদের নিয়োগের যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। বিমানবাহিনীও একই উদ্যোগ গ্রহণ করে; কিন্তু এত দিন নাইমা হক ও তামান্না-ই-লুৎফির আগে কোনো নারী বৈমানিক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। সশস্ত্র তিন বাহিনীর মধ্যে নৌবাহিনীতে সর্বপ্রথম ২০০০ সালের ১২ জানুয়ারি নারী ক্যাডেট/কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়।

 



সাতদিনের সেরা